কবিতা
চৈত্র শেষের বৃষ্টি
জয়ীতা ব্যানার্জী
১
এমন জোরালো আলো আর নিচে
যাত্রাসফল এত মানুষের মুখ দেখে আশ্বস্ত হই
ভাবি আমারও ফেরার কথা ছিল শেষ বিকেলের ট্রেনে
অথচ হঠাৎ এক জংলি ফুলের ঘ্রাণে আটকা পড়েছি
অনন্যোপায় হয়ে শেষমেশ হা ক্লান্ত কুকুরের
গোঙানিতে, জং পড়া গেটের শব্দে যাকে
রাত করে বাড়ি ফিরতে অনুরোধ করি
তার ব্যাগপত্র সাথে নেই। আছে দুচোখে অজস্র ঘুম
ভুলোমন, মাথা ভর্তি মৃতকোষ, জ্বরভাব শুধু
শোনো হে অপেক্ষমান স্নেহময়ী বাগানবিলাস
তাকে চেনা মাত্র স্পর্শ দিও, অন্ধকারের পথ্য সর্বশরীরে
আর পারলে কয়েকটা টাকা, উপযুক্ত রাতের খাবার
২
এ বিকেল ফুরোবে না
একটা অচেনা মোড়ের কাছে এসে বোঝা যাবে
বট গাছ কী বিশাল। সূর্যের রং লাল
আর চৈত্র শেষের বৃষ্টি যেন সেই
সন্ত্রস্ত পত্রবাহক বন্ধু
আমাদের অনুরোধে ভুল বানানের প্রেম
ব্যাগে বয়ে বেড়াচ্ছে বেচারি
৩
কেন কোনো চাঁদ আর বিচলিত করে না তেমন
বর্ষা ঋতুর মতো বেহিসেবি পথ ঘাটও দুপুরের
আগে আগে পৌঁছে দেয় বাগানবাড়িতে
ভয় হয় ঝকঝকে আলো দেখে। ভাবি
পরিমিত আহারের ভারে ঝিঁ ঝিঁ পোকাদের
ডাক শোনবার লোভ হারিয়ে ফেলছি
কাঠের বারান্দা জোড়া প্রশস্ত ছায়া
আমাদের ঘড়ি নেই অন্তত এই কথাটুকু
দয়া করে বিশ্বাস করো
৪
তোমায় শেখাবো বলে বসে আছি নির্বিকার দিন
তোমায় দেখাব এই কলোনি আকাশ, টানা টানা
মেঘের গালিচা। সান্ধ্য ধারাবাহিকের থেকে ছুটি নিয়ে
উঠে এসো। মশাদের ব্যস্ত কনসার্টে তুমি আমি
শ্রোতা হয়ে কিনে ফেলি ও পাড়ার বহুতল। ঝুল
বারান্দা এবং চারা। কৃত্রিম লন, হরিয়ালি
গুমোট হাওয়ার মাঝে ধোঁয়া তুলি। পরীক্ষা শেষের
বৃষ্টি, চৈত্রের তুমুল মাতামাতি থেকে কিছু দূরে
তোমার রঙের তুলি খুঁজে দিই কাগজের স্তুপে
আর দৃশ্য ছুঁয়ে দৃশ্যে ভেসে যাক আমাদের হাসি
অমর্ত্য দত্ত
অনর্থক
যে ছোঁয়া স্পর্শাতীত ক্রম আছে তারও
ফলতঃ সর্ববিধ প্রমাণক ধরো।
ধরো ঊর্দ্ধপ্রবাহ। ধরো তরঙ্গময়।
তবেই নয়ন জাগে, অভিভূতি হয়।
ধরো পুষ্প, ধরো গন্ধ, অঙ্গযামলে...
সব কারণই মূল্যহীন স্ফুরিত না হলে।
এই যে প্রকাশ। এই কামনাদ্যোতক্।
এখানে আমার শুধু ত্রাটক ত্রাটক
ও তন্মধ্যে ঘটে যায় উথালপাথাল।
নিগূঢ়ত্ব গলে গ্যাছে তবুও আড়াল-
ক'রে আছো, কেন বলো অনন্যশরণা?
বস্তুতঃ যা প্রণয় তাই তো করুণা।
যে যাওয়া গমনাতীত তারও পরিণাম থাকে।
এভাবে নির্নিমিত্ত রেখো না আমাকে।
আশ্রয়
স্বভাবচ্যুতি হলে ইচ্ছাপূরণ হয়না।
কুন্ঠাহীনা তাই তো এত উজ্জ্বল।
সর্বাঙ্গীণ মোহক ক'রে দিচ্ছে।
এখানে আমি আগের মতোই তুচ্ছ।
মন রাখবার আলম্বন খুঁজছি।
সেই কবেকার একটুকরোর যাচ্ঞা।
রাখবে তুমি? রাখবে তাকে? থাকবে।
তোমার সঙ্গোপনে, প্রত্যক্ষে।
তোমার অভিপ্রকাশে, অনির্বাচ্যে।
তোমার যত অ-সুখে, অ-দুঃখে।
তোমার সুকোমলে, প্রাগলভ্যে।
রাখবে তুমি? রাখবে তাকে? থাকবে।
এখানে আমি কর্তৃত্বাভিমান শূন্য।
এখানে আমি করণভাবাপন্ন।
তদ্বৎ
দুরূহসঞ্চারী। অন্তর্বৈখরী।
তীব্র প্ররোচনা। নিরুচ্চার গাঢ়।
প্রকর্ষণগামী। অমোঘপরিণাম-ই।
তবু বিলম্বনা লাবণী কেন করো?
সুরতমগ্নতা। বিভাবশবলতা।
দেখেছি আমি আর দেখেছে শর্বরী।
দেখেছি যাবতীয়। দেখেছি মোহনীয়।
আমরা দু'জনেই প্রকৃত কামাচারী।
সার্বত্রিক ঘটে যাবৎ নর্মস্ফোটে
এবং হেম লাগে দৃশ্যে, দিশিদিশি।
তুমি তো পূর্ণাৎ, তুমি তো তদ্বৎ
দেখেছি মদ্যময় তোমার ছন্দসী।
পরিন্যাস হলো। লেখনী এলোমেলো।
ও কবিতা এইবার কটিবসন খোলো।
চৈতন্য চুটকি
সুতরাং কোনো কিছুই নয় অসম্ভাব্য।
অথচ কোনো কিছুই নয় নির্ণায়কও।
উপমাহীন তাই বলে কি অকামহত।
জীবন তুমি ঢালা-উপুর করতে থাকো...
করতে থাকো সূচনা থেকে শেষাবধি।
করতে থাকো এমন যেন ছলকে পড়ে।
গূঢ়প্রসঙ্গকে মথন করো, ঘননকেও।
তন্মধ্যে যাও, আরও ভিতরে আরও ভিতরে...
সেখান থেকেই উঠে আসবে ব্যক্তকলা।
সেখান থেকেই দৃষ্ট হবে পূর্ণোপমা,
সমভিব্যাহার। রাত্রির বিভাব লেখো।
লেখো আসক্তি, লেখো গমন, পরিক্রমা।
সুতরাং এই গমনই যথার্থ ও বিনিশ্চয়।
অথচ কোনো চলে যাওয়াই চুড়ান্ত নয়।
প্রপান
যে দর্শনে শুধু তুমি, তার ভিতরে হ্লাদনীচিত্রে
বারংবার পাল্টে যাচ্ছে সমুৎপাদের প্রত্যয়।
যার উলম্ব প্রলোভবর্ণা, অনুভূম রম্যরঞ্জিত।
আমার এই অগাধ তৃষ্ণা। তোমার ওই জলসত্র।
যে সঞ্চারী শুধু তোমার, চরাচর কীর্ণ শব্দে
কবিতারও বিসার হচ্ছে ইচ্ছামতী মতো।
কি ভাবে আড়াল করবে? কি ভাবে নিরাশ করবে?
আমার এই ছন্দবূহ্যে তুমি তো সন্নিবদ্ধ।
আর তোমারই প্রহর্ষণে রতি ও রণক ঘটছে।
ঘটছে তীব্র স্ফারণা। ঘটছে উর্দ্ধপ্রবাহন।
সেখানে কাব্য রাখলে সারাগায় মেশক লাগবে।
সে মেশক ব্যাঞ্জনাময়। সে মেশক অবিচ্ছেদ্য।
তবুও এই যে আমি, এই যে জীবন অননুমতে...
তাই কবিতাকে পাঠাচ্ছি তোমার ওই গোপন ছুঁতে।
ঋদ্ধি পান
সেতারে ঝঞ্ঝারকাল
১
মুক্ত ঘরে এলে মুক্ত হাওয়া পাবে
উড়ে উড়ে আসে পাখির পাখিরালয়
যে জীবনে নেই নিঃশ্বাসহীন ছাই
সে কি তবে আজ এমনই দুঃসময়?!
২
ফুল- বেলপাতা বসন পরো মাগো
আলোয় গন্ধে টেকে না যে অধিবাস
মালায় মালায় ঢাকা শব ঘাস বাহ
বিষপান মুখে লাল লাল ঠোঁটে হাস!
৩
কাল দেখা হবে এই ভেবে
খুলি ব্রহ্মাণ্ড নিয়ে চলি
গরমকালের ফিরৎ চিঠি
হিমশীতল হাওয়ার কালি
সকালে কাগজে বিষাদগ্রস্ত মালভূমি
বিছোতে দেয় না রোদে
কিছু প্রেমও বারুদ।
৪
কুলকুল বেগে বয়ে যায় শতদল
স্নায়ুতে জাগছে রক্তের কল্লোল
পিছনে ছুটছে হাহাকার, পায়ে হাত
পাহাড়ি নদীর উপচানো ফ্যান ভাত
ধেয়ে আসে মাতামাতি করে
চপট চটং ঠুংঠাং মারে বাক্যি
স্তব্ধ করে চেতনায় আজ সরে
উল্টে পুরানে গাদাগাদি আর ধাক্কি।
৫
অহর্নিশি উল্কাপিণ্ড
যতই কাঁদো
উজাড় ভাণ্ড
দধি দুগ্ধ সর্বশী
হৃদয়ে ভয়
মুখে হাসি
পিছনে ফিরলে
সর্বনাশী।
রাধাবল্লভ চক্রবর্তী
আসে
মারের বদলে মার, প্রতিক্রিয়া ও পাল্টা-প্রতিক্রিয়া,
এভাবেই ধীরে ধীরে বিকল্প খুঁজে পাই —
আমাদের দল নেই কোনও; আমাদের আছে
এক সমকালীন আহ্বান। অথচ, আমি জানি,
গোপনে কেমন বিশুষ্ক হয়েছি! তোমার সজলতা
ধারণ করতে পারিনি কোনওদিনই — সে-ও এক
বাঁচা তবে? কীভাবে গ্রন্থি ছিঁড়ে গেল,
কীভাবে মুখগুলি আশাহত হ'ল, আমি জানি
না। আমাকে জানাও — কতিপয় শব্দের
আনাগোনা, ছি-ছিক্কার করে, নিকটেও ডাকে —
তুমি তো তেমন ঈশ্বর; তুমি তো তেমন দয়াময়...
হাসি
অসুখ আসলে পাঠ। আমি তাকে নিয়মিত
পাঠ করি। উঠে চলে যেতে গেলে, নানান
অছিলায় সে আমাকে আরও কাছে চায় —
বন্ধু কাকে বলে? আমি তার একাকী সরণী
বেয়ে যাই। হয়তো কিছুই নেই, পড়ে থাকা
নির্দয় নুড়ি ও খোলস; আমাকে চমকিত
ক'রে চলেছে নিরন্তর। অভিমুখ বদলে যেতে
পেরেছে কতখানি? নিজের ভাঙনের দিকে
নিজেরই চোখ চলে যায় বারবার —
অলীক হ'য়ে ওঠে এভাবেই, আমাদের যাপিত
দিনগুলি। অনিয়ম থাকে না তাতে, থাকে
নিয়মিত পাঠ — যেভাবে অসুখ থাকে,
যেভাবে থেকে যায় আমাদের বহুবিধ মুখ...
যোগাযোগ
প্রণাম তো সারাই আছে। তুমি আজ
গিয়ে, করো সুমধুরভাবে সমাপন। সম্মতি
পাবে জেনেও কেন এই দ্বিধা? খণ্ডিত
হ'তে কি কোনও ব্যথা অনুভূত হয়
আজও? কী যেন দুর্বিপাকে ব্যর্থ এখনও
শৈলী! প্রতিটি আয়াস আমাকে দংশন
করে! কিংবা ধরো যদি, এই স্বল্প
পরিসরে, তার এক নিজস্ব উদ্বিগ্নতা নিয়ে,
ইন্দ্রিয়াতীত কোনও চক্র চলে — অতিপ্রজ হওয়া,
যেন তোমার শেষ হ'ল সেই; অবিচলিত
থেকে জানালে আমাকে, তোমার অধুনা ব্যর্থতা।
তোমাদের এত ডাক পাওয়া; তোমাদের সেইসব
সন্দেহ, ডাকের মাশুল, আজ আর দরকার
নেই কথামতো। শিখে চলো তখনও, দণ্ডিত
ছাত্রের ন্যায়; অধোগতি নিশ্চয়তার, অবিকল!
ঘৃণা
দফায় দফায় তাকে হত্যা করা হয়!
দফায় দফায় তার মৃতদেহ শোকে ভরে
যায় — জাগ্রত আমরা থেকেছি: মুমূর্ষু নয়,
অপরের বন্দী হ'য়ে — যৌবরাজ্যে এসে
আরও একা হওয়া, কিংবা অক্ষম প্রমাণিত
করা! সশব্দে ছুঁড়ে দাও, বাতিল করো
আত্মরতির যেকোনও উপাদান; ক্ষুদ্র বা মহৎ
উভয়ই আজ পাপ! ঘটনা চেয়েছি, তবে,
এমনও রক্তধোয়া মুখ চাইনি; তবে কেন?
তবে কেন আমাকে সেসবই দেখালে? মুহূর্ত
যদি মনে পড়ে, ঘৃণার তীক্ষ্ম শরে ক্ষতবিক্ষত
নিজেকে করি! চিরাচরিত; ধর্ম বলতে যা
বোঝায় এখনও, তা আমি মিথ্যে মনে করি —
প্রতিবাদ শেষতম ধর্ম মনে হ'লে, প্রতিটি
বিদারণ ঈশ্বর হ'য়ে সম্মুখে দাঁড়াতেও পারে!
কৃত্য
সংসর্গে এনে শিখিয়ে দেওয়া অনুচ্চারণ — পুনরায়
চাতুরী ভেসে আসে। এমন বন্ধুযোগ, ভুলে
যাওয়া ঘরের কপাট আর টান! তীব্র
ঘৃণায়, শ্লেষে মানবিক করা তবু যায়নি
এখনও! রোগশয্যায় শুয়ে অপেক্ষা কীসের
এত? মৃত্যু নাকি আরোগ্যলাভের? অন্তর্মুখী
কোনও হিংসা প্রবল; পদে পদে প্রতিহিংসা —
কথা ছিল: কারওর মুখের দিকে তাকাব না
কোনওদিনও আর; কেবল নিজের মুখ, মুখের
ছায়া অংশত বদলে নেব — ফলত, সংসর্গ
থেকে মুক্তি পাওয়া যাবে! (না, সেসবও পারিনি!)
বয়স
নির্লিপ্তি তোমার গৌরীবরণ কেড়ে নিল। হয়তো
একদিন অবশিষ্ট থেকে যাবে সিঁদুরের লাল
আর উচ্ছ্রিত কালিমা — তখন কি মনে
হ'বে শাশ্বত শ্মশ্রুময় মুখ? কথার ফুলঝুরি,
হাসির ফোয়ারা — বিধাতা, তুমিও বুঝি
হেরে গেছ? পারোনি হ'তে, স্বপ্নে সদাগর?
‘অযুত প্রহর গেল, ক্লান্তি আসেনি; আমি
যদি চলে যাই তার কাছে অনুযোগ নিয়ে?’
তোমার ধারণায় সে বুঝি তোমায় ফেরাবে না?
শোকের খবর নিয়ে কতবার চলে গেছি
ছুঁতে, তবু তো পারিনি — বুঝি: বড় বৃদ্ধ
ও কাতর হয়েছ! একা থাকো, বৃক্ষবৎ,
সন্তানও নেই; দহনের মাঝে কিছু ডালপালা আছে।
সিন্টু প্রধানের কবিতা
১
মন্ত্র গুলো চৌম্বকীয় তড়িৎ
আরতি পেলে হু হু ঢুকে যায় তুবড়ীর ভিতর
আলোর ফোয়ারা যেনো আর্টেজীয় কূপ
কবেকার পাথর দিয়ে ঘিরে রাখা আদিম পিপাসা
ধূপের মুখে চুমু খেয়ে সুগন্ধ চলে গেছে দূরবর্তী নামতায় তেঁতুল পাতা ছেড়ে অশ্বত্থের ছায়ায়
উইপোকা মুখে মাটি নিয়ে কাছে গেল তার
দুর্ভিক্ষের মত সবুজ উপোস
ধুতুরা ফলের কাঁটায় আহত মাছিটি কাঁকড়া গর্তের কাছে পড়ে আছে সারারাত একটুও নড়েনি
চলমান জানালার বাহিরে শোলমাছটি ক্রমশ
নেমে যাচ্ছে জলের গভীরে
২
চোখ উপড়ে গেলে আর একটা চোখ পুতে দেবো এই বালুচরে। এ জমিন নদীর অংশগত। কত মাটি ইট হয়ে দেওয়ালে, কত মাটি দুয়ার ভরাট করে আছে।
মেঘলা আকাশ নীল আকাসের সাথে কথা বলে,
না দখল করে নেয়! পাখিরা দূরত্ব ছাড়া উড়তে পারে না। ছায়ার ভিতর জ্যামিতিক রূপ, সেই মতো ডালে ডালে পাতা সাজায় গাছ। যতদূর যাই, এ পৃথিবীর সমস্ত ভাষা অংকের কাছে ঋণী।
প্রতিবেশী খালের মতো শুকিয়ে যাবো। আবার ভরে উঠবো বর্ষার জলে। নীচে শুয়ে থাকবে একঝাঁক বিয়ের এঁটো প্লেট। মনসা পুজোর ঘট। ফুরিয়ে যাওয়া লাইটের ব্যাটারি। উপরে কচুরিপানায় ফুল হবে। ঈষৎ বেগুনী। পাতাগুলো সাপের ফনার মতো তার।
৩
পিছন থেকে একঝাঁকে শ্যামাপোকা সামনে চলে এলো
যেনো কাল্পনিক মিছিল। বাতাসে ভেঙে যাবে
কিছুপর চোখ থেকে হারিয়ে যাবে অন্ধকারে। তবু
এই বাহিত সময় নিরুদ্দেশ করতে পারি না। বরং
সংক্রমিত হবো বলে হাতে হাতে সাজিয়েছি নখ।
আমাকে নির্মিতকরে স্নায়ু সারারাত বেলপাতা খায়
দেখি, হোমের আগুনে চাঁদমালাটি নড়ছে
লাল জবা ফুলের মৃত পরাগ দেখার
এখানে কোনো প্রজাপতি নেই
হামাদিস্তার ভিতর বসে আছে একচালা নুন
মহাকাশে জাল টেনে ধরে আনা নক্ষত্ররা সব
তাহাদের উপর বর্ষাকাল নামে
ডুবতে দেখি উদ্বৃত্তদ্বীপ পলিমাটির কথা
৪
তফাৎ নয়, মিল থাকে হাসির
যেনো যমজ দু'ই বোন
একটু থেমে খিলখিলিয়ে ওঠা
শুধু মনে হয় 'ব' থেকে এসেছিল 'র'
এ জলাধামে নিত্য পদ্ম ফুল ওঠে
প্রেজেন্টের খাতার মতো, পরবর্তী সংখ্যায় মাথা তুলে দাঁড়ায় অন্য একজন।
ছাপ রেখে রেখে এই উঠে যাওয়া
পেনসিলের দেহ, কোমর অব্দি হয়ে গেছে ক্ষয়
ইরেজার তাকে মুছে দিতে পারে, ফেরায় কি দেহ।
৫
ভিজে যাওয়া ঝিল পাড় সঙ্গে করে এনেছে
ঠোঁটে নারকেল ফুলের গন্ধ
চোখে বাসন্তী পাতার আলো
হাতের তালুতে বৌদ্ধযুগের কাটাকুটি
কোলে মরু অঞ্চল কপালে মায়া সভ্যতার ঘুম
তাকে ছুঁলে দেখতে পাই, মুসলিমদের নালন্দা আক্রমণ কালো রাতের ভিতর ঘোড়া চড়ে এগিয়ে আসছে মশাল বাঘের জ্বিভের মতো জানালা দিয়ে বেরিয়ে আসছে লাইব্রেরির আগুন
তাকে ছুঁলে দেখতে পাই, রাত্রিকালীন সমুদ্রের ভয়ংকর আওয়াজের ভিতর কোটি কোটি জলজ প্রানীর পৃথক কথোপকথন... উপকূল পর্যন্ত আসতে জেলি ফিসের কথাগুলো নীল রঙ হয়ে যায় তারামাছ এক সেকেন্ড দু'লক্ষের বেশী শব্দ বলতে পারে --- তার কথাগুলি আকাশগঙ্গা অব্দি নির্ভুল ভাবে পৌঁচ্ছায় --- ভাঙে না একটিও শব্দ।
৬
কেবল একটি বিন্দু আঁকবে বলে কলমের ভিতর ঢুকে পড়ে রিফিল
অবশিষ্ট কালি তরল মাদকের মতো
বিশ্রী স্বাদ নিয়ে গড়িয়ে পড়ে নেশার আগে
ঠিক যেনো জ্বলন্ত ধূপ
ধোঁয়া দিয়ে বাতাসের গায়ে ব্যর্থ লেখা তার
একটি বিন্দু আঁকার পর খেজুর পাতায় নৌকা হওয়া ছাড়া রিফিলের দ্বিতীয় কোন কাজ থাকে না
কথা হয় ক্লোরিনের আয়রনের সাথে।
ফুটপাত খুঁড়ে যে পাইপ চলে গেছে জলের উপসর্গ নিয়ে, তার ভিতর শ্যাওলা হয়ে জেগে থাকি। এতো পথ জুড়ে আমারই ছেঁড়া শরীর ভেসে যায় স্রোতে। যেনো সিলিং থেকে খসে পড়ে ঝাড়বাতি মহলের ভিতর।
গদ্য
ঐতিহ্যের আলোয় বালুরঘাটের বনেদি দুর্গোৎসব
সোহম ভট্টাচার্য
পুজোর সময়টা বাঙালি মানেই উৎসবের আমেজ, ছুটির অনন্দ ও শিকড়ের টান। আর বনেদি বাড়ির দুর্গাপূজা মানেই তাঁর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে আরও দুটি বিষয়। প্রথমটি ঐতিহ্য ও দ্বিতীয়টি অলিখিত ইতিহাসের ছোঁয়া।
কোলকাতার বুকে হেরিটেজ তকমাপ্রাপ্ত বনেদি বাড়িগুলো ছাড়াও, গোটা বাংলার বুকে ছড়িয়ে রয়েছে একাধিক বনেদি বাড়ির ঐতিহ্যবাহী পুজো ও অনুষ্ঠানিকতার ইতিহাস, মনে প্রবল ভক্তি ও ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখার টানে যারা প্রতিটি বছর মেতে ওঠে, পার্বনী অনুষ্ঠানিকতার “উমা বরনে”।
আজ তবে চলুন, ঘুড়ে আসা যাক, আত্রেয়ীপারের এক বর্ধিষ্ণু জনপদ, বালুরঘাট থেকে। ধুলায় ঢাকা বালুরঘাট কীভাবে সেজে ওঠে, উমা বরণ করতে –
পালবাড়ি:-
বালুরঘাটের অন্যতম বনেদি বাড়ি, হল পাল বাড়ি। কংগ্রেস পাড়ার পাল বাড়ির এই দুর্গাপুজোর শুরুটা ঠিক কবে, তা যদিও জানা যায় না। তবে স্থানীয়দের বিশ্বাস, ৪০০ বছর আগে আত্রেয়ী নদীর পাশে নিজের বাড়িতেই পুজোর সূচনা করেছিলেন, বালুরঘাটের একসময়ের প্রভাবশালী ব্যবসায়ী গৌরী কিশোর পাল, তাঁর পরবর্তীতে তাঁর ছেলে দেবকিশোর পাল এবং নাতি সুদর্শন পালের আমলেও এই পুজো সাড়ম্বরে পালিত হয়েছে।
লোকবিশ্বাস এই যে, এই বাড়ির পূজিতা দেবী অত্যন্ত ভক্তবৎসলা, নিষ্ঠার সঙ্গে মায়ের কাছে কেউ কিছু প্রার্থনা করলে, তা পূরন করেন দেবী।
যদিও, গৌরীপাল ও তাঁর উত্তরসূরিদের অবর্তমানে আজ থেকে প্রায় ষাট বছর আগে পালবাড়ির দুর্গোৎসবের যাবতীয় দায়িত্ব নেন, প্রতিবেশী ও স্থানীয় মানুষেরা।
বর্তমানে বারোয়ারি কমিটির উদ্যোগে, পুজা আয়োজিত হলেও, বদল হয়নি ‘পালবাড়ির’ পুজোর নাম। আজও রীতি মেনে, দেবীকে বোয়াল ও ও রাইখর মাছের ভোগ নিবোদিত হয় বলে জানান স্থানীয় বাসিন্দা আশুতোষ পাল।
তিনি আরও জানান, "এ মন্দিরের পাশেই আত্রেয়ী নদী ছিল, পরবর্তীতে নদীটি দিক পরিবর্তন করে পশ্চিমে বেঁকে যায়। ইতিহাস সঠিক না জানলেও শুনেছি, এ পুজোর প্রচলন এক দৈবী স্বপ্নাদেশের সূত্র ধরেই।”
ত্রিমোহীনির বন্দোপাধ্যায় বাড়ির দুর্গাপুজোঃ
বালুরঘাট মূল শহর থেকে কিছুটা দুরেই, এক জনবহুল শহরতলি অঞ্চল হল ত্রিমোহীনি। এখানে বন্দোপাধ্যায় বাড়ির দুর্গাপুজোর সূচনা করেন, যোগেশচন্দ্র বন্দোপাধ্যায় মহাশয়।
কথিত আছে, পুকুরঘাটে স্নান করতে গিয়ে নাকি তিনি খুঁজে পান একটি তামার দেবীঘট, দরিদ্র যোগেশচন্দ্রবাবু তাঁর বাজারমুল্য বিবেচনা করে, বাড়িতে নিয়ে আসলে, সে রাতেই স্বপ্নাদিষ্ট হন যে, এই দেবীঘট দেবী মঙ্গলচণ্ডীর। আসন্ন শারদীয়া দুর্গাপুজোয়, যোগেশচন্দ্র এ ঘটের পূজা না করলে তাঁর প্রানহানি ঘটবে। দরিদ্র্য যোগেশচন্দ্রকে, নাকি পুজো করার
খরচ হিসেবে, দেবী জানান, তাঁর উঠানের গাছের বাতাবিলেবু ও পুকুরের মাছ ভাজা ভোগে দিলেই তিনি সন্তুষ্ঠা হবেন, এর বেশী তাঁর পুজোয় কোন উপকরণ নিষ্প্রোয়জন।
সেই থেকে এই বাড়ির পুজোয় আজও বাতাবিলেবু ও পুকুরের শিঙ্গি মাছের ঝোল দিয়ে ভোগ নিবেদনের রীতি প্রচলিত আছে। যদিও এ পরিবারের বর্তমান কোন পুরুষ সদস্য না থাকায়, বন্দোপাধ্যায় পরিবারের, ‘মা মঙ্গলচণ্ডী ঠাকুরানী’ নিত্য সেবিতা হন, ত্রিমোহীনির মুখোপাধ্যায় পরিবারের বিষ্ণু মন্দিরে। পুজোর সময়, চারজন বেহারা মিলে দেবী বিগ্রহকে পুরনো বন্দোপাধ্যায় বাড়ির ভগ্নপ্রায় দুর্গাদালানে নিয়ে গিলে সেখানে রীতি মেনে চারদিন দুর্গারূপে পূজিত হন তিনি। পুজো শেষে দেবীর পুনরায় ঠাই হয়, সেই বিষ্ণু মন্দিরে।
পাগলীগঞ্জের ভট্টাচার্য্য পরিবারের দুর্গাপুজোঃ
এ বাড়ির দুর্গাপুজোর ইতিহাস প্রায় ৩৫৮ বছরের। জনশ্রুতি অনুযায়ী, দিনাজপুরের রাজার দেওয়ান স্বর্গীয় অম্বিকাচরণ ভট্টাচার্য্য এ বাড়ির পুজোর প্রতিষ্ঠাতা। পরবর্তীতে জগদীশনাথ ভট্টাচার্য্য, জানকীনাথ ভট্টাচার্য্য, প্রমুখ এ পুজো করেন, মূলত ঘটে ও পটে এই বাড়ির পূজো অনুষ্ঠিত হয়। দেবীর বিগ্রহ এখানে অনুপস্থিত, পুজোয় বাড়িতে বানানো সন্দেশ ও নারকোল ছাপা, নাড়ু ও পান্তুয়াই দেবীর উদ্দেশ্যে নিবোদিত হয়। সপ্তমী, অষ্টমী এ পুজোয় লুচি ভোগ হলেও, নবমীতে হয় অন্নভোগ আজও রীতি মেনে, ঢাকের পরিবর্তে কাঁসর ও শঙ্খধ্বনিতে পূজিতা হন দেবী।
বালুরঘাটের সাহারায় বাড়ির দুর্গাপুজোঃ-
একসময়, বাংলাদেশের সঙ্গে ছিল বালুরঘাটের নিয়মিত ট্রেন ও বানিজ্য যোগাযোগ। সে বহুযুগ আগের কথা, কাঁটাতার তখনও ভাগ বসায়নি বাঙালির পুজো উন্মাদনায়। তৎকালীন সময়ে বনমালী সাহা নামের এক চাল ব্যাবসায়ী, পূর্ব বাংলায় কলেরার হাত থেকে বাঁচতে সপরিবারে চলে আসেন, বালুরঘাটে। বনমালী সাহার ইচ্ছেতেই ১৮০ বছর আগে, এই পরিবারে দুর্গাপূজার সুচনা, বৈষ্ণব মতে এই সাহা বাড়ির পুজো হওয়ায়, পশুবলির প্রচলন নেই, পুজোর চারদিন তাঁর পরিবর্তে, রামায়ণগান ও গীতাপাঠ করা হয়ে থাকে, সাহারায় বাড়ির পুজোয় দেবীকে কোনরকম অন্নভোগ দেওয়া হয় না, লুচি-সুজির হালুয়াই থাকে ভোগের মূল তালিকায়। আজও সাহারায় পরিবারের বংশধর কালীকৃষ্ণ সাহারায় টিকিয়ে রেখেছেন পুজোর ঐতিহ্যকে, পুরনো প্রথা মেনে আজও মন্থন ষষ্টীর দিন কাঠামো পুজো করে, দুর্গাপুজোর সূচনা হয় বলে জানালেন তিনি।
পতিরাম ঘোষ বাড়ির পুজো:-
সে এককালের কথা, দেশে তখন ব্রিটিশদের শাসন দেশে। ব্যাবসার সুবাদে ও কিছু জনহিতকর কাজের সুবাদেই ব্রিটিশদের সুনজরে পরেছিলেন, এই পরিবারের অন্যতম প্রান পুরুষ রামসুন্দর ঘোষ। পতিরাম এলাকার বিস্তীর্ণ কয়েকটি জমির মালিকানাও পান সে সুবাদেই তারপর সে অঞ্চলেই পাকাপাকি ভাবে বসতবারি নির্মান করে দুর্গাপুজো শুরু করেন তিনি। শোনা যায়, এ বাড়ির পুজোয় জৌলুষ ছিল ব্যাপক। স্বয়ং লর্ড মিন্টো নাকি এসেছিলেন, ঘোষবাড়ির পুজোয়। যদিও সেই জৌলুস, বিলাস-ব্যাসন আজ আর কিছুই নেই। তবে রয়ে গিয়েছে বাড়ির পুজোর ঐতিহ্য ও জনমানসে সেই পুরনো দিনের রঙিন ইতিহাস।
বালুরঘাট শহরের এতোগুলি ঐতিহ্যবাহী বনেদি বাড়ির পুজোর পরেও, এমন একটি বারোয়ারী পুজোর নাম করতেই হয়, যা বনেদি বাড়ির পুজোর বিপরীতে স্বকীয় মাহাত্ম্যে ও ঐতিহ্যে উজ্জ্বল।
বালুরঘাট শহরের সঙ্গে স্বাধীনতাসংগ্রামের সুদীর্ঘ ইতিহাস ওতোপ্রতোভাবে জড়িত, সে আইনঅমান্য আন্দোলনই হোক কিংবা ১৯৪২ এর ভারতছাড়ো আন্দোলন, প্রত্যেক ক্ষেত্রেই এই জনপদের মানুষেরা সক্রিয় ছিলেন, ব্রিটিশ উপনিবেশিক অত্যাচারিতার বিরোধিতায়।
তাঁরই ফলশ্রুতি আজও পাওয়া যায়, বালুরঘাটের বিশ্বাসপাড়া মোড় এলাকায় ভারত মাতৃকা পুজোয়।
হ্যাঁ দুর্গা না, জগদ্ধাত্রী না, সপরিবারে মহিষমর্দিনীও না, বরং সিংহবাহনা, জাতীয় পতাকাধারীনি দেবীমূর্তিই এখানে পুজিতা হন। বৈদিক বা তন্ত্রমার্গীয় কোন রীতিতেই এই পুজো হয়না। হয় প্রাণের আবেগ ও ভক্তিতে, তাই ঐ পুজোয় হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে সকল সম্প্রদায়ের উপস্থিতি থাকে দেখার মতো, পুজোর চারদিন চলে, রক্তদান শিবির, সন্ধ্যা আরতির পর প্রতিদিন থাকে দরিদ্র্য পথচলতি মানুষদের জন্য ফ্রি ম্যাডিক্যাল চেকআপ, যা এই ধর্মীয় সংকীর্ণতার দিনে, এক শিক্ষণীয় বিষয়।

No comments:
Post a Comment