রাহুল পুরকায়স্থ : কবির 'সামাজিক ভূমিকা'
সুদীপ চট্টোপাধ্যায়
আজ থেকে প্রায় ২০ - ২২ বছর আগের কথা। একদিন সকালে আমার মেসবাড়িতে এলেন সুবীরদা। কবি সুবীর মণ্ডল। তখন আমি বেলঘরিয়াতে একটি মেসবাড়িতে রুম ভাড়া নিয়ে থাকি। বললেন, চল রাহুলদার বাড়ি যাব, লেখা নিতে হবে। সেইসময় সুবীরদা 'কবীর' নামে একটি পত্রিকা করতেন। ত্রৈমাসিক পত্রিকা। সেই পত্রিকার জন্য কবিতা নেবেন। রাহুলদার সঙ্গে তখনও আমার সরাসরি পরিচয় হয়নি। যদিও তাঁর কবিতা পড়ছি তারও কয়েকবছর আগে থেকে। সুবীরদার সঙ্গে গেলাম রাহুল পুরকায়স্থর বেলঘরিয়ার ভাড়াবাড়িতে। তখন সকাল সাতটা বা তার কিছু পরে। দেখি রাহুলদা মেঝেতে বাবু হয়ে বসে, হাতে কাচের গ্লাস, তাতে সাদারঙের পানীয়। মাঝে মাঝে চুমুক দিচ্ছেন। আমি ভাবলাম হয়তো গলায় কোনও সমস্যা হয়েছে, তাই ঈষদুষ্ণ জল পান করছেন। সুবীরদার দিকে তাকিয়ে বললেন, "মদ শেষ, আনাতে হবে।" তারপর সামনে রাখা ল্যান্ডফোন থেকে কাউকে ফোন করে ভোদকা আনতে বললেন। এই সকালে দোকান বন্ধ, স্বাভাবিকভাবেই অন্য কোনও উপায়ে সংগ্রহ করতে হবে, এ-সব নিয়ে কিছুক্ষণ ফোনালাপ করে তিনি সুবীরদাকে বললেন, "খাবি তো?" সুবীরদা সুরাসক্ত নন, আর তাছাড়া অত সকালে মদ্যপানে কে-ই-বা রাজি হবেন। আমার সঙ্গে রাহুলদার পরিচয় করিয়ে দিলেন সুবীরদা। সেই শুরু হল রাহুলদার সঙ্গে আমার সরাসরি যোগাযোগ। পরে রাহুলদা বেলঘরিয়া নীলগঞ্জ রোডে ফ্ল্যাট কিনে উঠে যান।
২০০৯ সালে কলকাতা বইমেলায় প্রকাশিত হল আমার প্রথম কবিতার বই। রাহুলদা হাতে পেয়ে যারপরনাই খুশি। একদিন বললেন, "লেখাগুলোর মধ্যে কবিতা আছে, এটাই সব থেকে বড় কথা!"
বাংলা কবিতাজগতের একজন উল্লেখযোগ্য কবি হয়েও তাঁর ভেতরে তরুণ কবিদের জন্য ছিল প্রসারিত স্থান। তরুণ কবিদের সঙ্গে সময় কাটাতে খুবই ভালো বাসতেন। প্রায়ই ফোন করে ডেকে নিতেন তাঁর ফ্ল্যাটে। ২০১১ সাল থেকে কয়েকবছরের জন্য চাকুরিসুত্রে ফিরে যাই বাঁকুড়ায়, অনেকের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়। কিন্তু রাহুলদা আগের মতোই যোগাযোগ অবিচ্ছিন্ন রাখেন। সব থেকে বড় কথা বাংলাভাষার একজন গুরুত্বপূর্ণ ও পরিচিত কবি হয়েও তিনি তরুণদের প্রতি নিজে থেকে এগিয়ে গিয়ে সখ্য স্থাপন করতেন। আমার স্বভাবদোষেই আমি খুব-একটা মিশুকে নই, তাছাড়া সিনিয়র কবিদের সঙ্গে যোগাযোগে বরাবরই আড়ষ্ট বোধ করি। তাই আমি যতবার রাহুলদাকে ফোন করেছি, তার থেকে অনেক বেশিবার তিনি আমায় ফোন করেছেন। তার থেকেও বড় কথা কোনও নতুন লেখা হলেই ফোন করে বলতেন, "কয়েকটা লেখা লিখেছি রে, শুনবি?" লেখা শোনাবার পর তার অবশ্যম্ভাবী প্রশ্ন, "কিছু হয়েছে রে?" আমি অবাক হয়ে ভাবতাম যাঁর লেখা আমাদের কাছে মন্ত্রের মতো। যাঁর লেখা পড়ে একদা শক্তি চট্টোপাধ্যায় তাঁর বাড়ি চলে এসেছিলেন, সেই রাহুল পুরকায়স্থ তাঁর থেকে বয়সে অনেক ছোটো এক সামান্য কবিতালেখকের কাছে জানতে চাইছেন, তাঁর লেখা ওতরাল কিনা! পরে জেনেছি এরকম অনেক বয়:কনিষ্ঠ কবিতালেখকের কাছেই তাঁর কবিতা সম্পর্কে তিনি জানতে চাইতেন, আদৌ তাঁর লেখাগুলি কবিতা হয়ে উঠছে কিনা! এ-এক মহৎ গুণ। তাঁর আরেক গুণ হল কারও কবিতা পড়ে ভালো লাগলে ফোন করে তাকে জানানো। বিশেষ করে তরুণদের। মুখের ওপর স্পষ্ট কথা বলার সাহস ও সততা তাঁর ছিল। এইসময়ের বেশিরভাগ মানুষের মতো সবার কাছে ভালো সাজবার ভান তিনি কখনও করেননি। আদ্যোপান্ত কবিতার জন্য বেঁচে-থাকা মানুষ ছিলেন রাহুলদা। কবিতার বিপুল জনপ্রিয়তাকে তিনি সন্দেহের চোখে দেখতেন। কথায় কথায় একবার বলেছিলেন, "আমার কবিতার বই মানুষ লাইন দিয়ে কিনছে, এ-দৃশ্য অশ্লীল!" আদিবর্ণ পত্রিকায় একটি সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, "...কবিতার সঙ্গে জনপ্রিয়তার কোনো সম্পর্ক নেই। কবিতা তো জনপ্রিয় বস্ত্রালয় নয় সেই অর্থে। কবিতা মানুষের বেঁচে থাকা। তার বেঁচে থাকাকে তুমি স্পর্শ করছ। সে-স্পর্শ যদি ভীষণ জনগ্রাহ্য হয়, তাহলে আমার নিজের মনে হয় স্পর্শের চরিত্র নষ্ট হয়। এটা আমার নিজস্ব বোধ। কিছু বই হাজার হাজার কপি বিক্রি হয় বাজারে। কিছু বই ২০ বা ৩০ কপিও বিক্রি হয় না। কিন্তু তা অনেকেই জেরক্স করে পড়েন। পার্থক্য আছে দুইয়ের মধ্যে। যখন কোনো কবিতার বইয়ের হাজার-হাজার কপি বিক্রি হয়, তখন সন্দেহ জাগে মনে। বাংলা কবিতার হাজার হাজার পাঠক আছে? থাকলে তো ছবিটা অন্যরকম হত। সেই কারণে বিষয়টা বিসদৃশ লাগে।"
একজন কবির সামাজিক ভূমিকা কী হতে পারে? কবিতা যেহেতু শূন্য থেকে সৃষ্ট কোন বস্তু নয়। আর পাঁচটা শিল্পের মতো কবিতাও মানবসভ্যতার ফসল, স্বভাবতই কবিরও একটা সামাজিক ভূমিকা থাকে। রাহুল পুরকায়স্থর একটি কাব্যগ্রন্থই আছে, যার নাম, 'আমার সামাজিক ভূমিকা'। কবির সামাজিক ভূমিকা প্রসঙ্গে তাঁর শেষ সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, " আমার সামাজিক ভূমিকা হচ্ছে একটাই, কনফেশন। শুধু স্বীকারোক্তি।"
আমার সামাজিক ভূমিকা
(শেষ প্রচ্ছদের লেখা)
তুমিও বিব্রত, আর অরণ্যমর্মরে
আত্মকাহিনির পাতা একা একা ওড়ে
ঘুম নেই, বাতাস ঘুরছে পিছে পিছে
একটি পাখির শিস কাহিনির নীচে
প্রস্তুত করেছে শয্যা, কল্পশতানক
এবার বলো তো বাবা তুমি ধর্মবক
এই যে খোয়াব, এর অর্থ কীবা হয়
এখন দখিনবায়, বিহিত সময়
দুই বাংলার কবিমহলে তিনি বেশ পরিচিত ছিলেন। এবং দুই বাংলার প্রতি তাঁর অকৃত্রিম ভালোবাসার অন্যতম কারণ, জন্ম কলকাতায় হলেও তাঁর পূর্বপুরুষদের বাসস্থান ছিল সিলেটে। এছাড়া প্রথমজীবনের অনেকটা সময় কাটিয়েছেন বেলঘরিয়ার কলোনিতে। 'কলোনির কবিতা' নামে একটি কাব্যগ্রন্থও রচনা করেছেন। আপাদমস্তক বামপন্থী মানসিকতার এই মানুষটি কর্মসূত্রে নামী সংবাদচ্যানেলে গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত হয়েও অবলীলায় মিশে গিয়েছেন প্রান্তিক মানুষদের সঙ্গে। তাঁর বন্ধুবাৎসল্য এবং সুরাসক্তি নিয়ে ছড়িয়ে আছে নানান গল্প, অথচ তার মধ্য দিয়েই তিনি অবলীলাক্রমে তুলে নিয়েছেন তাঁর লেখার রসদ। তাঁর কবিতা ইঙ্গিতধর্মী বা সংকেতধর্মী হলেও তাতে ছড়িয়ে থাকে মৃত্যুচেতনা, যৌনচেতনা, জীবনবোধ। কবিতা যে রাজনীতিরই অবিচ্ছেদ্য অংশ, তা তিনি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতেন। তিনি বিশ্বাস করতেন কবিতা আয়ুক্ষয়কারী, ধীরে ধীরে গ্রাস করে কবির জীবন।
বিষক্রিয়া
দুলছে লণ্ঠন মৃদু, কেঁপে ওঠে রাতের পানীয়
সহস্র অর্গল খোলা, নতুন গ্রহের বালি
উড়ে আসে সাদা বিছানায় --
ছায়াপথ বনপথ চকিতে হারায়
এ-গাঢ় সন্দেহে, আরকে চোবানো ঘিলু
তোমাদের কথা আজ মনে পড়ে শ্রেণিসচেতন
আমার দেহের রোম, সাড়ে তিন কোটি
মরিয়া শহরে খোঁজে উত্তেজনা, আর
তোমার শীতল হাত গেল রাত্রে
বলেছিল, চুপ কর
শরীরে টোটেম-দাগ
আমার চোখের চরম লোহিত দেখো
রাত্রির গলি ঘেঁষে মিশে গেল আখ্যায়িকায়
এর পরে, বলো বিষ, এর পরেও খচিত হবে
আমার ভুবনজোড়া পুনরুত্থান!
নতুন দলিল হাতে আমি যাব সংবিধানে!
কবি রাহুল পুরকায়স্থকে আমরা যতটা চিনেছি, সেই তুলনায়, গদ্যকার রাহুল পুরকায়স্থ আমাদের কাছে আড়ালে রয়ে গেলেন, অথচ তাঁর গদ্য যারা পড়েছেন, জানেন কী ক্ষুরধার অথচ মায়াবী ভাষায় তিনি গদ্য লিখেছেন! তাঁর 'ময়দান ও পানশালা' নামক গদ্যের বইটি তারই সাক্ষ্য বহন করে।
গতবছর সস্ত্রীক গিয়েছি রাহুলদার ফ্ল্যাটে। কথা হচ্ছে কবিতা নিয়ে, জীবন নিয়ে। আছেন বর্ণালীদি। রাহুলদা বললেন, এই ফ্ল্যাট বিক্রি করে উঠে যাবেন কাছেই একটি সদ্যনির্মিত হাউসিং কমপ্লেক্সে। রাতের আহার শেষে বাড়ি ফিরলাম। সেই শেষ দেখা। তারপরও ফোন করেছেন, কবিতা শুনিয়েছেন। ততদিনে আমিও বেলঘরিয়ার ছেড়ে উঠে এসেছি সল্টলেকে। ফোনে কথা হলে বলতেন, বেলঘরিয়া থেকে দূরে চলে গেছিস, কিন্তু আমার অফিসের কাছে আছিস, তাই স্কুল থেকে ফেরার পথে একদিন চলে আয় আমার অফিসে। বলেছি যাব, কিন্তু সে-যাওয়া আর হয়ে ওঠেনি। তিনিই চলে গেলেন তাঁর সামাজিক ভূমিকাটুকু পালন করে।
প্রত্ন
সতর্কে রেখেছি অগ্নি
পতঙ্গে রেখেছি প্রাণ, দূরে
প্রতিটি সম্পর্ক আজ
সংকেতসহায়
সম্বলহারানো এই
অবরোহনের বাঁকা পথে
কাহিনিরা মৃত, আর
মৃতেরা কাহিনি লিখে যায়
কবিতা
তিতাস বন্দ্যোপাধ্যায়
চক্র
তোমার মৃত্যু থেকে বেশ কিছু দূরে-
দেখেছি পাখিদের ডানা পড়ে আছে।
পালকের মানচিত্রে রক্তের নকশা।
ডিমে তা দিতে দিতে
উঠে যাওয়া পাখিদের মা -
পরিযায়ী ;
বরফের ভিতর সুদৃশ্য ওম ফেলে এসে একদিন
বিভুঁইয়ের রাত্রিকালীন হাওয়ায় মৃত্যুর সঙ্গে ছায়া হয়ে খেলে -
মৃত্যু ;
তোমার বেঁচে থাকার বেশ কিছু দূরে...
নবান্ন
অন্ধ ভিখারির হাতের পাঁচ টাকার মত এই আনন্দ।
পবিত্র উঠোন বরাবর লক্ষ্মী-পায়ের আলপনা!
ছোটবেলায় ভাবতাম কেউ বুঝি মাঝরাতে
চাঁদের আলোয় স্নান করে
আলপনা চিনে চিনে উঠে আসবে ঘরে।
কাঠকয়লার আঁচে পুড়ে যাওয়া হাঁড়ি খুলে দেবে আজন্মের অন্ন -
আনন্দ হবে কৃষকের ধান!
চাল- ক্ষীর-কলা দিয়ে মাখা-
নবান্নের সাবলীল সৌরভ।
ব্যয়
ইতিহাস খুঁটে খাচ্ছে
আদিম ইচ্ছার পায়রা।
তাদের উল্লাসে কাঁপে শ্রান্ত কড়িকাঠ।
প্রাচীন কানাইয়ের হাতে প্রাচীনতম বাঁশি- বাজে।
সাপের ফনায় মুমূর্ষু চাঁদ দেখে
সাপুড়ের ঝুড়ি
ধীর লয়ে হেঁটে হেঁটে আসে।
সঞ্চয়ে ডুবে যায় -
ব্যয়ের সুরক্ষিত কলস।
নিত্যবৃত্ত
মায়ের প্রতীক্ষার ভিতর
আবিষ্কার করি সূক্ষ্ম বীজ।
ছাই রঙ। ফেটে ফেটে যাওয়া।
টবে গাছ বাড়ে। ফুল ফোটে।
ফুল পায়
পুরনো ক্যালেন্ডারের ঈশ্বর।
মায়ের আশ্চর্য অভ্যাস সঙ্গে নিয়ে
ঈশ্বর;
ঝুলে থাকেন দিনগুজরানে।
অপরিকল্পিত
সিগারেটের দোকানে
সুখটান দেওয়া যুবকের ঠোঁটে
রাষ্ট্রের প্রতি ক্ষোভ।
সাইকেল চালিয়ে চলে যাওয়া মেয়ের পা ঘুরছে, যেন নেশা।
দুর্ঘটনার পর ছড়িয়ে থাকা কাচ -
পা কেটে ফেললেন এক বৃদ্ধ।
মন্দিরের পুরোহিত
দানবাক্স থেকে খুচরো - নোট মিলিয়ে বের করে আনলেন শ'খানেক টাকা!
বলিষ্ঠ উন্মাদ,
ময়লা জামার উপর কারো ফেলে দেওয়া পাউডার ঢেলে দিল। শুভ্র!
নর্দমার পাশ থেকে সন্তানকে সরিয়ে নিলেন এক বাবা।
সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষার্থে ডাকা মিছিল ভাঙল কোথাও।
ফিরছে লোক -
ফিরছে মানুষ।
রাস্তা গিলে নিচ্ছে ম্যারাথন দৃশ্যাবলী।
জয়া বসাক
পৃথিবীর অন্তিম শিশু
পৃথিবীর অন্তিম শিশুর জঠর কালো : ভাত খাবো, ভাত বেড়ে দাও
--অচৈতন্য দেহলিজ
সকল অভিঘাত রুগ্ন করে ডেকে ওঠো
দুধ খাবো, দুধ বেড়ে দাও --
অবিকল ম্রিয়মাণ বাস্তুর উলঙ্গ ধারাপাত
বেজে যায় শঙ্খনাদি পার করে
শিশুটির পেটে 'ক' -বিদ্যের সংগ্রাম
মজুর খাটায়, মজুর বানায় ;
পৃথিবীর শোবার ঘর নেই --
ভাগ ভাগ ক'রে মা-দর্জির কাঁথা সেলাই
দূর হতে দেখি,
অপূর্ব নিদান ফেলে শিশুটির মুখে রক্তের দলা, মুচড়ে
--ঠেলে দিল প্রাচীন প্রতিম-- এ জগৎ সংসারে
এত উদগ্রীব, এত উপাসনা
ধীরে ধীরে চীনামাটির ভাস্কর্যে : স্তনের বাসা
স্তনের ওপর সারস ঘুমায়
খুঁটে খায় । স্তনরস খুঁটে খায়
অতঃপর ক্রুঞ্চ যুগল আদি খোয়াবে নিভে গেলে
অন্তিমবার শিশুটি কেঁদে ওঠে--
চিৎকার আঁকো, চিৎকার খাবো
-- কালি তানপুরায় অন্তিম সারস রেখে ;
অচৈতন্য দেহলিজে প্রেমাসক্ত শিরীন ঢালো...
বাড়ি
পুরনো বাড়ি ভেঙে যাচ্ছে--
নিশ্চিহ্ন করা হয়েছে সৌধ-স্বল্পমূল্যের ঘরগুলি
খেলনা বাটি, পুতুল ইস্তেহার, মশলাদানি, কিছু কিছু পাখিদের বাসা
আর মানুষের ছায়া, সবই এক এক করে ভেঙে ফেলা হয়েছে
কেন পুরনো ঘর ভেঙে যায় , বিভু দাদা ?
চৌকাঠ,বাঁশের খুঁটি, টিনের চাল , ঘুনে ধরা কতকগুলো স্মৃতির পসরা
সবই তো রয়ে যায়, এটুকুই তো সাথে যাওয়ার
তবুও তারা বাড়ি বানায়, নতুন কিছু--
হূয়মান নতুন ঘরের নৌকাবিলাস শুরু
সোনামুখির আঁচলে
কেন তারা হারিয়ে যায়, নকশা আঁকা চাঁদের মতো
--ওখানে একখানা বাবারও ঘর ছিল
আর একখানা মায়েরও
সেখানে শুলে আকাশ দেখা যেতো
বসলে পাখিরা ডাকতো
হাসনুহেনা, জুঁই, করবী, গন্ধরাজ
শেফালী, কলাবতী
এ সকল মনোবিদরা মনের কথা শুনতো
মলিন সব-- ব্যস্ততা, ইতি, বৃদ্ধার শ্বদন্তে
এখন বাড়ির ভেতর ঘর নাই
শোনো, পুরনো বাড়ি ভেঙে যাচ্ছে --
ভ্রমনাথ, ভ্রমমতী
আমার সকাল
স্খলন
আকাল
বধূ
নৃত্য
নুন...
বিষয় বদলে বদলে আমরা কেমন ভোর হয়ে উঠি
মরুভূমি , খ্রিস্টান, বুদ্ধিস্ট, ইসলাম হয়ে উঠি
উঠি সামগ্রিক কোলাহলের হলাহলে --- গাঢ় চিকন রং
গলে পড়বে অগাধ বিশ্বাসে...
আমাদের নতুন সন্তানের মুখভার
উত্তর পশ্চিম : উত্তর দক্ষিণ : উত্তর পূর্ব : উত্তর উত্তর
এখন হরিনমাস
গাঁজার চরস হয়ে ওঠার পর পরই
পিত্তি জ্বলে সরস্বতীফুল ফুটে ওঠে
এভাবে ভাঙতে ভাঙতে প্রেম নির্ঝর নৈঃশব্দ রথ হয়, পথ পায়
প্রেম পায় ভালোবাসা --- এই গভীর ভালবাসার পর
প্রেম তোমাকে সত্য পায় !...
প্রেম আমাকে মিথ্যে দেয়
অতএব, আমার বিকেল
নির্ভরতা
বিদ্রুপশূন্য
বৌঠান
মিষ্টি মৃত্যু
পানি দিঘি
রয় স্বয়ং স্বয়ম্ভু...
আবার এইভাবেই তো বিষয় বদলে বদলে আমরা কেমন আগাছা হয়ে উঠি, নোংরা কালো জানোয়ার হয়ে উঠি --
অতএব
না গড়ার অহেতুক নির্বাচন
হৃদি ঠাসা ভাষার ক্রমিক ফুল
--ক্রমশ দুলছিল--
গাইতে পাড়ার তুমুল এ ভ্রম-সংসার আর গোপন কিছু ভুলমাখা নির্যাস
জনপ্রিয়তার কর শুনে, তুমিও আস্থা খোয়াও-- হে বিভেদ শব্দোচ্ছাস !...
এখনই তো প্রবল
দূরে অথবা দূরের আরও... ভ্রমনাথ, ভ্রমমতী
এখনই তো প্রবল
কাছের অথবা কাছের আরও...ভ্রমনাথ, ভ্রমমতী
লাল জবার শালু
প্রচ্ছন্ন হতে হতে প্রকট মিছিল
উড়ছে পাঁজরের হলুদ কুঠি
পার্থেনিয়াম ঘনিয়ে আসবে : দেখে রেখো আত্মগর্বী
আলী দর্জির সাদা হাতি হারিয়ে যাচ্ছে না তো...?
কুম্ভ কশেরুকা পেরিয়ে নাভির মঞ্জিল
এই মুহুর্তেই কালো সুতো ভীষণ দরকার, যার যত হুইলচেয়ার তার তত বাদুড় পাখি
এভাবে ক্ষুধার্ত সাপের ল্যাজ থেকে ছিটকে উঠেছি কখন !
অনিবার্য বাস্তুসাপ । এই নিষিদ্ধ বিষয়ক রক্তে-- পা হেঁটে চলে গ্যাছে যখন...
পীযুষ সরকার
খোলস
বিশ্বাসকে সন্দেহ করি। মাঝে মাঝে
ছুঁড়ে ফেলি জন্মদিন, শুকনো গোলাপ...
আমার পায়ের তলায় মাটি নেই, মোজাইক
বুকের তলায় সুশীল হাহাকার
কী করবো না করবো বুঝে ওঠার আগেই
আলো চলে যায়। খসে পড়ে ওষুধের শিশি
আমি ঝুঁকি, হামা দিই, বুক দিয়ে হাঁটি
এ-ঘরে ও-ঘরে খুঁজি শিশুকাল, রূপোলি খোলস
চেটে খাই অন্ধকার, রাত্রি ক্ষরিত লালারস...
একটি ফুলের কাছে
গতবছর কি জেতাটাই না জিতেছিলাম!
এবছর হেরে গেছি, গো-হারা...
সময় সমান থাকে না চিরকাল
শরীরও প্রতিশোধ নেয়
হাসতে হাসতে চোখে জল আসে কখনো
ঠাকুর-দেবতা মানতে মন চায়
মানুষের কথা বিশ্বাস করতে ইচ্ছে করে
একটি ফুলের কাছে মাথা নত সারাদিন
ইচ্ছে করে, ক্ষমা ভিক্ষা চাই;
পল্লবীকে বলি– সব দোষ আমার।
সহজ ধূসর
যা আছি তার চেয়ে সমান্য বেশি বা কম
হালকা বাদামি বা সহজ ধূসর
এভাবেই চলে যাবে দিন
আমার আর চমৎকারের ইচ্ছে নেই
সংস্কারের সাধ্য নেই
ছোবল লুকিয়ে ফেলেছি
নিজের বিষ নিজে গিলে গোল হয়ে শুয়ে আছি বোকালির মঠে
এর বেশি জানতে চেয়ো না কিছু
অশ্লীল লাগে
অপচয়
সুসময় এসেছিল, বুঝিনি
সামান্য কথা নিয়ে কাটাকাটি চলছিল খুব–
কে ভাল, কে মন্দ
কার হাতে প্রতুল ক্ষমতা...
কৃষি একা জেগে ছিল মাঠে
অখন্ড সম্ভাবনা, আর
একটি হলুদ পাখি বাতাসের শিং-এ
চিনতে পারিনি বলে অপচয় শিল্প হল আজ
টেম্পল অফ লার্নিং সিরিজ
আরণ্যক দাস
১.
মাননীয়, উনি বলে গিয়েছেন দেশীয় যুবদের শিক্ষিত করবার দায় আপনার। আমরা ঝাণ্ডার ডান্ডা হাতে দাঁড়িয়ে আছি পেছনে। কেউবা হাত পা ছুঁড়ে হচ্ছি শ্রীচৈতন্য। শৃঙ্খলা তাই কখনও কখনও শৃঙ্খল হয়ে উঠছে।
২.
রাত বাড়লেই সাজানো ফাঁদে আমরা পা দেই। পিছিয়ে যাওয়াকে আমাদের বুড়ো আঙ্গুল দেখানোটা এখন স্বভাবে ঠেকেছে। ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে আমরা তেমন ভাবিত নই। কত নতুন বই পড়ি! জানি, পরীক্ষা দিলে পাশ করবোই - আমাদের উনি আছেন। রাত হলেই প্রবল অন্ধকারে একটু আলোর নিচে ঢুলুঢুলু চোখে মনমালিন্যে মেতে যাই। একে অন্যের পিঠ চাপড়াই।
৩.
এইতো একটা ছোট ঘর। আধিক্লিষ্ট হয়ে বসে আছি একাই। প্রচণ্ড ঘুমের বারোটা বাজিয়ে দু-একটা বুলেট রাতের স্তব্ধতা চিরে বেরিয়ে যায়। একগাদা বিরক্তির সাথে আমার চ্যাংড়া রুমমেট ওদের শিক্ষা নিয়ে প্রশ্ন তুলে নিজেকে ক্লাসিস্ট রূপ দেয়। ভবনে এর ঘর তার ঘর করে সময় কেটে যেত ভালোই। দরজা খুলে বেড়িয়ে আসি আরেকবার। পুরনো সবকিছু নতুন করে ফিরে পেতে ভালো লাগে।
৪.
আমাদের এক বন্ধু এসেছে এই শহরে অযোধ্যা পাহাড় থেকে। চাষের হাল ছেড়ে বইয়ের অরণ্যে তারুণ্য উপভোগ করবে বলে। আমার সাথে থাকেনি বেশিদিন। বুঝিয়ে দিত গ্রাম বাংলার কালো রঙ নিজের শরীরে রাখবেনা আর। জমির কাদার ভেতর মায়ের মুখ দেখতো ও, অস্বচ্ছ। আমাদের কারও আর আত্মস্থ করা হলনা ওর স্বপ্নের মানবাজারকে। মহুয়া আনবার কথা বললেই বন্ধু আমাদের জেলের হাওয়া খাওয়ার ভয় দেখাতো। লজ্জার হাসি হাসতো আর প্রচণ্ড কাশতো। পলাশ ফুলের জঙ্গল আর প্রেমে পড়বার গল্প থেকে বিরতি নিয়ে বন্ধু আমাকে দুয়ারশিঙি নদীর কথা শোনাতো। বলতো ভূমিজ ইতিবৃত্ত।
৫.
সাদা কাগজে লাইন টানা
শ্রীমন্দিরকে পেছনে রেখে সামনে হেঁটে যাই, একা।
সবার সব গোপন খবর একে অন্যের ছায়ার মত ঘিরে থাকে আমাকে। যৌথযাপনবিমুখতা আমাদের রক্তে। অন্যায় দেখলেও ইচ্ছা করেনা আর ফেটে পড়তে।
দেওয়ালে লেগে থাকে আমাদের ভবিষ্যৎ। সবকটা তো কবিই হবে, কেউই ফিরে আসবেনা আর। বেসিনে জমে থাকা জল নিয়ে হবে না প্রবল ক্যাচাল।
রুমনম্বরের দিকে শেষ একবার তাকাই। মাথা নত। স্মিত হেসে বেরিয়ে যাই।
সাদা কাগজে লাইন টানা।
শ্রীমন্দিরকে সামনে রেখে হেঁটে যাচ্ছি, একা।
তোমাদের অদৃশ্য বন্ধু এক রোজ রাতে কাঁদে।
