Tuesday, July 14, 2026

প্রবন্ধ : ফজলুল করীম




মার্কিন সাম্রাজ্যের সাহিত্যিক ময়নাতদন্ত



সাম্য রাইয়ান-এর উপন্যাস ‘সকল প্রশংসা মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের’ সমকালীন বাংলা সাহিত্যের এক অত্যন্ত সাহসী, ক্ষুরধার এবং ভিন্নধর্মী সংযোজন। ২০২৫ সালের অমর একুশে বইমেলায় ঘাসফুল প্রকাশনী থেকে আলোয় আসা এই বইটি প্রথম দেখায় বা নামের দিক থেকে কেবল একটি রাজনৈতিক ইশতেহার বা স্লোগানধর্মী লেখা মনে হতে পারে, কিন্তু পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা উল্টালে আমরা এক অদ্ভুত ঘোর, তীব্র আত্মদহন এবং আমাদের চেনা সমাজের এক নির্মম ব্যবচ্ছেদের মুখোমুখি হই। লেখক বইটির শুরুতেই প্রাপ্তমনস্ক পাঠকদের জন্য এক অভিনব ও কৌতুকপূর্ণ সতর্কতা জুড়ে দিয়েছেন— “কুকুরকে বিশ্বাস করুন, এ উপন্যাসকে না”। এই একটি লাইনের মাধ্যমেই মূলত উপন্যাসের মূল সুরটি বেঁধে দেওয়া হয়েছে। লেখক পাঠককে শুরুতেই এক ধরনের অবিশ্বাসের চাদরে জড়িয়ে নেন, যাতে পাঠক এই আখ্যানের প্রতিটি বাঁকে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলোকে চেনা বাস্তবতার ছাঁচে ফেলে নতুন করে ভাবতে বাধ্য হন। তবে রূপকের আড়ালে এই উপন্যাসে যে বাস্তবতার ব্যবচ্ছেদ করা হয়েছে, তা সমকালীন বিশ্বরাজনীতি, দেশীয় ক্ষমতার দলাদলি, বুদ্ধিজীবীদের সুবিধাবাদ এবং কর্পোরেট শোষণের এক নগ্ন ও অকাট্য দলিল।


উপন্যাসের ক্যানভাসটি মূলত গড়ে উঠেছে আমাদের চেনা পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থা, বহুজাতিক কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানের স্বার্থরক্ষা এবং তথাকথিত আদর্শিক রাজনীতির চরম ও করুণ পতনের ওপর। সাম্য রাইয়ান অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে দেখিয়েছেন কীভাবে বিশ্বায়নের এই যুগে মানুষের নৈতিকতা, আদর্শ এবং আবেগগুলো শেষ পর্যন্ত পুঁজি বা ডলারের কাছে বন্দি হয়ে পড়ে। গল্পের মূল চরিত্রদের যদি আমরা এক এক করে বিশ্লেষণ করি, তবে দেখা যাবে এরা কেউই আকাশ থেকে পড়া কোনো চরিত্র নয়, বরং প্রতিদিন আমাদের যাপিত জীবনে, টেলিভিশনের টকশোতে, খবরের কাগজের পাতায় কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ের চত্বরে আমরা যে মানুষদের দেখি, এরা তাদেরই এক একটি রক্ত-মাংসের প্রতিচ্ছবি।


গল্পের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হলো রতন। রতনের চরিত্রটি আমাদের সমাজের এক বিশাল তরুণ বা একসময়ের লড়াকু যুবসমাজের প্রতিনিধিত্ব করে। ছাত্রজীবনে রতন ছিল বামপন্থী রাজনীতির একনিষ্ঠ কর্মী। লেনিন, মাও সে তুং কিংবা মার্ক্সের তত্ত্ব ছিল তার মুখে মুখে। ‘দুনিয়ার মজদুর এক হও’ স্লোগানে সে একসময় রাজপথ কাঁপিয়েছে, মেহনতি মানুষের অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে নিজেকে সঁপে দিতে চেয়েছে। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায়, বাস্তবতার রূঢ় আঘাতে এবং ক্ষমতার লোভনীয় হাতছানিতে সেই রতনেরই খোলস বদলে যায়। সে ধীরে ধীরে রূপান্তরিত হয় এক চরম সুবিধাবাদী যুবনেতায়। যে রতন একসময় শ্রমিকের অধিকার নিয়ে ভাবত, সেই রতনই এখন শ্রমিকের লাশ কিংবা কোনো বস্তিতে লাগা রহস্যময় আগুনকে নিজের রাজনৈতিক ফায়দা এবং অর্থনৈতিক আখের গোছানোর মোক্ষম হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে দ্বিধা করে না। রতনের এই পতন আমাদের সামগ্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতির এক চরম দেউলিয়াত্বকে নির্দেশ করে, যেখানে আদর্শের চেয়ে ব্যক্তিগত ও দলীয় সুবিধাবাদ অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

রতনের ঠিক বিপরীত মেরুতে অথচ একই সমীকরণের অংশ হিসেবে আমরা পাই বিশ্বজিৎ চরিত্রটিকে। ছোটবেলায় যার অবয়ব আর দুর্বলতার কারণে তাকে সহপাঠী বা পরিচিতরা ব্যঙ্গ করে ‘তৃতীয় বিশ্ব’ বলে ডাকত, সেই বিশ্বজিৎ আজ এক মহীরুহ পুঁজিপতি। সময়ের সাথে সাথে সে নিজের নাম ও ভাগ্যের এমন এক পরিবর্তন ঘটিয়েছে যে, আজ সে পুরো ব্যবস্থার অন্যতম নিয়ন্ত্রক। বিশ্বজিতের কাছে কোনো মানুষের আবেগ, দেশের সার্বভৌমত্ব বা মানবাধিকারের কোনো মূল্য নেই। তার কাছে একমাত্র ধ্রুব সত্য হলো ‘ডলার’ এবং মুনাফা। সে পুঁজিবাদী ব্যবস্থার সেই নিষ্ঠুর চেহারা, যা মুনাফা অর্জনের জন্য যেকোনো স্তরে নামতে প্রস্তুত।


এই ক্ষমতার বৃত্তে বিশ্বজিতের সহযোগী হিসেবে আবির্ভূত হয় সুলেখা দেবী। সুলেখা চরিত্রটি আমাদের সমাজের এনজিও সংস্কৃতি এবং তথাকথিত সুশীল সমাজের এক চমৎকার রূপক। সে মুখে নারী অধিকার, মানবাধিকার এবং পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর উন্নয়নের কথা বলে, নিজের এক ধরনের পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তি তৈরি করে এবং এই তকমা ব্যবহার করে সমাজের ক্ষমতার একদম কেন্দ্রবিন্দুতে নিজের আসনটি পাকাপোক্ত করে। কিন্তু পর্দার আড়ালে সুলেখা আসলে পুঁজিপতি বিশ্বজিতের স্বার্থেরই পাহারাদার। যখন কারখানায় বা শ্রমজীবী মানুষের মাঝে কোনো অসন্তোষ দানা বেঁধে ওঠে, যা বিশ্বজিতের ব্যবসার ক্ষতি করতে পারে, তখন সুলেখা দেবী তার তথাকথিত অধিকারকর্মী বা মধ্যস্থতাকারীর খোলসটি চমৎকারভাবে ব্যবহার করে। সে তার সুনিপুণ অভিনয়-প্রতিভা এবং বাগ্মিতা দিয়ে সেই শ্রমিক অসন্তোষকে ঠান্ডা করে দেয়, আন্দোলনকে ভিন্ন খাতে মোড় ঘুরিয়ে দেয়। সুলেখা ও বিশ্বজিতের এই কর্পোরেট সিন্ডিকেট মূলত এটিই প্রমাণ করে যে, শোষণের হাতিয়ার কেবল পুলিশ বা লাঠি নয়; এমনকি উন্নয়ন আর অধিকারের মিষ্টি বুলিও শোষণের অন্যতম বড় অস্ত্র হতে পারে।


এই সুবিধাবাদী আর শোষকদের ভিড়ে উপন্যাসে যে দুটি চরিত্র পাঠকের মনে গভীর এক বিষাদ আর সহানুভূতির জন্ম দেয়, তারা হলো শবনম (যার ডাকনাম শিখা) এবং কমরেড শাহজালাল। শবনম চরিত্রটিকে লেখক ডায়েরির পাতার মাধ্যমে উন্মোচন করেছেন। এই ডায়েরির প্রতিটি পাতা আসলে এই আধুনিক, যান্ত্রিক ও কৃত্রিম নাগরিক জীবনের একাকিত্ব, হতাশা এবং টিকে থাকার জন্য একজন মধ্যবিত্ত মানুষের নিরন্তর ও ক্লান্তিকর লড়াইয়ের এক অত্যন্ত সংবেদনশীল চিত্র। শবনমের ভেতরের হাহাকার আমাদের চারপাশের সেইসব মানুষের গল্প বলে, যারা এই বিশাল পুঁজিবাদী গোলকধাঁধায় হারিয়ে গেছে, কিন্তু মুখে এক টুকরো কৃত্রিম হাসি ধরে রেখে বেঁচে থাকার অভিনয় করে যাচ্ছে।


অন্যদিকে কমরেড শাহজালাল হলেন এই উপন্যাসের সেই ট্র্যাজিক হিরো বা বিলুপ্তপ্রায় প্রজাতির এক মানুষ, যিনি সমস্ত প্রতিকূলতার মাঝেও নিজের ভেতরের আদর্শের আগুনটাকে নেভাতে দেননি। যখন চারপাশে সবাই বিক্রি হয়ে যাচ্ছে, রতনের মতো সাবেক কমরেডরা ক্ষমতার হালুয়া-রুটির ভাগ বসাতে ব্যস্ত, তখনো শাহজালাল সাম্রাজ্যবাদ ও লুটেরা অর্থনীতির বিরুদ্ধে নিজের ক্ষীণ কণ্ঠস্বর তুলে ধরেছেন। কিন্তু এই আপসহীনতার মূল্য তাকে দিতে হয়েছে অত্যন্ত নির্মমভাবে। যে দলের জন্য তিনি জীবন যৌবন বিলিয়ে দিয়েছিলেন, সেই দল থেকেই তাকে শেষ পর্যন্ত বহিষ্কৃত হতে হয়, কারণ তার সত্য কথাগুলো দলের বড় বড় নেতাদের সুবিধাবাদী অবস্থানের জন্য হুমকি ছিল। শুধু বহিষ্কারই নয়, তাকে শারীরিকভাবেও চরম নির্যাতনের শিকার হতে হয়। শাহজালালের এই পরিণতি পাঠককে এক গভীর অন্ধকারের মুখোমুখি দাঁড় করায় এবং এই প্রশ্ন তুলতে বাধ্য করে যে, এই আধুনিক ও নিষ্ঠুর ব্যবস্থায় কি তবে সততা ও আদর্শের কোনো স্থান নেই?


সাম্য রাইয়ান তার এই উপন্যাসে সমকালীন মিডিয়া ও রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রোপাগান্ডা বা অপপ্রচার কৌশলকে খুব নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। বিশেষ করে উপন্যাসে উল্লিখিত ‘ফায়ারহোজিং’ (Firehosing) নামক মনস্তাত্ত্বিক ও প্রোপাগান্ডা টেকনিকের ব্যবহার অত্যন্ত সময়োপযোগী এবং বাস্তবসম্মত। আমরা প্রতিদিন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম কিংবা মূলধারার গণমাধ্যমে যা দেখি, লেখক যেন তারই এক তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক রূপ দেখিয়েছেন। ফায়ারহোজিং হলো এমন এক কৌশল, যেখানে কোনো একটি বড় বা মূল জাতীয় সমস্যাকে জনগণের নজর থেকে আড়াল করার জন্য রাষ্ট্র বা ক্ষমতার সুবিধাভোগী গোষ্ঠী একযোগে অসংখ্য ভুয়া তথ্য, গুজব, কুৎসা কিংবা অত্যন্ত চটুল ও অপ্রাসঙ্গিক ট্রল বা বিনোদন বাতাসে ছেড়ে দেয়। তথ্যের এই বিশাল বন্যায় সাধারণ মানুষের মস্তিস্ক অবশ হয়ে পড়ে। তারা আসল বা গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা—যেমন অর্থনৈতিক সংকট, মানবাধিকার লঙ্ঘন কিংবা শ্রমিক হত্যা—এসব ভুলে গিয়ে সেইসব চটুল ও অর্থহীন বিষয় নিয়ে মেতে থাকে। রতন এবং তার দলবল কীভাবে এই টেকনিক ব্যবহার করে সাধারণ মানুষের ক্ষোভকে ডাইভার্ট করে দেয়, তা লেখকের লেখনীতে অত্যন্ত চমৎকারভাবে উঠে এসেছে।

উপন্যাসটির প্রথমার্ধে যেখানে আমরা এই বাস্তব ও চেনা রাজনৈতিক ও সামাজিক টানাপোড়েনগুলো দেখতে পাই, দ্বিতীয়ার্ধে এসে বিশেষ করে বইয়ের ১০১ নম্বর পৃষ্ঠার পর থেকে আখ্যানটি এক সম্পূর্ণ নতুন ও অভাবনীয় মোড় নেয়। লেখক এখানে এসে বাস্তবতাবাদের দেয়াল ভেঙে এক পরাবাস্তব বা রূপক (Surrealism) জগতের অবতারণা করেন। গল্পটি তখন এক বৈশ্বিক রূপ ধারণ করে, যার কেন্দ্রে চলে আসে ‘অন্ধ জাদুকর’ এবং মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের চিরচেনা প্রতীক ‘আঙ্কেল স্যাম’ (Uncle Sam)।


এই অন্ধ জাদুকর চরিত্রটি অত্যন্ত রহস্যময় এবং প্রতীকী। সে আসলে সেইসব আন্তর্জাতিক সংস্থা, মধ্যস্থতাকারী কিংবা দালাল বুদ্ধিজীবীদের রূপক, যারা তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে মার্কিন বা পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদের এজেন্ডা ও পলিসিগুলো বাস্তবায়ন করার সুপারি নেয়। এই জাদুকরের কোনো নিজস্ব চোখ নেই, সে অন্ধ, কারণ সে কেবল আঙ্কেল স্যামের চোখ দিয়েই দুনিয়াকে দেখে এবং আঙ্কেলের নির্দেশেই তার সমস্ত জাদু বা পলিসি প্রদর্শন করে। অন্ধ জাদুকরের মুখ দিয়ে লেখক এক অদ্ভুত ও ভয়ঙ্কর সিস্টেমের কথা বলিয়েছেন, যার নাম দেওয়া হয়েছে ‘ইনক্লুসিভ অপারেটিং সিস্টেম’। জাদুকরের ভাষায়, এটি এমন এক জাদুকরী বা আধুনিক রাজনৈতিক ব্যবস্থা, যা কোনো দেশের শাসনব্যবস্থায় একবার ইনস্টল বা চালু করে দিতে পারলে সেখানে সমাজতন্ত্র, পুঁজিবাদ, খেলাফত, গণতন্ত্র কিংবা নৈরাজ্যবাদ একই সাথে সহাবস্থান করবে এবং কোনো কিছুতেই সিস্টেম ক্রাশ করবে না। এই রূপকটি আসলে বর্তমান বিশ্বরাজনীতির এক চরম সত্যকে উন্মোচন করে। সাম্রাজ্যবাদের কাছে আজ কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক আদর্শের কোনো দাম নেই। তাদের কাছে ইসলামপন্থী, সমাজতন্ত্রী বা চরম স্বৈরাচারী শাসক সবাই সমান, যদি তারা সাম্রাজ্যবাদের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত দাসত্ব মেনে নেয় এবং তাদের ব্যবসার বাজার উন্মুক্ত রাখে। আদর্শ কেবল জনগণকে ধোঁকা দেওয়ার এক একটি খোলস মাত্র।


ঐতিহাসিকভাবে আমরা বিশ্বরাজনীতি বা ইতিহাসে ‘আঙ্কেল স্যাম’ বলতে যে চিত্রটি কল্পনায় আনি—১৮১২ সালের যুদ্ধ থেকে প্রচলিত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সেই জাতীয় প্রতীক, একজন সাদা চুল ও ছাগলাদাড়ি ওয়ালা প্রবীণ মানুষ, যার মাথায় আমেরিকার পতাকার রঙের লম্বা হ্যাট থাকে। লেখক সাম্য রাইয়ান সেই চেনা প্রতীকটিকে এই উপন্যাসে এক অসামান্য ও ভয়ঙ্কর সাহিত্যিক রূপ দিয়েছেন। অন্ধ জাদুকরের বর্ণনায় আঙ্কেল স্যামের যে প্রাসাদ এবং তার কার্যাবলীর বিবরণ দেওয়া হয়েছে, তা পড়তে পড়তে পাঠকের গায়ের লোম খাড়া হয়ে যায়।


আঙ্কেলের প্রাসাদের অন্যতম বড় বৈশিষ্ট্য হলো এর কাচঘেরা বিশালাকার এক কক্ষ, যেখানে কোটি কোটি মাছি অনবরত উড়ে বেড়াচ্ছে। এই মাছিগুলো আসলে কোনো সাধারণ মাছি নয়, এগুলো হলো আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তি, ইন্টারনেট, স্যোসাল মিডিয়া এবং সর্বগ্রাসী নজরদারি ব্যবস্থার (Surveillance State) এক চমৎকার রূপক। আঙ্কেল স্যাম এই কোটি কোটি মাছিরূপী সিসি ক্যামেরা বা অ্যালগরিদম দিয়ে পৃথিবীর প্রতিটি প্রান্তের মানুষের ব্যক্তিগত জীবন, তাদের চিন্তা, তাদের ক্ষোভ এবং তাদের পরিকল্পনাকে ২৪ ঘণ্টা নজরে রাখছেন, যাতে তার সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে কোথাও কোনো সত্যিকারের প্রতিরোধ গড়ে উঠতে না পারে।


একই সাথে উপন্যাসে আঙ্কেল স্যামের দেওয়া ‘ডলার’ ও ‘গণতন্ত্রের’ যে ব্যবচ্ছেদ করা হয়েছে, তা অত্যন্ত তীক্ষ্ণ। আঙ্কেল স্যামের দরবার থেকে সরাসরি কোনো স্বাধীনতা বা প্রকৃত জনকল্যাণ আসে না। সেখান থেকে আসে ‘গণতান্ত্রিক ডলার’ কিংবা প্রয়োজনে ‘খেলাফতি ডলার’। এই ডলারগুলোর মূল কাজ হলো তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর মগজ ও অর্থনীতিকে কিনে নেওয়া। এই ডলারের বিনিময়ে ওইসব অনগ্রসর বা উন্নয়নশীল দেশগুলো আঙ্কেলের কাছ থেকে ‘ফরেন গণতন্ত্র’ বা বিদেশি গণতন্ত্রের ফর্মুলা আমদানি করে। এই গণতন্ত্র আবার কোনো মুক্ত বা স্বাভাবিক জিনিস নয়, এটি আঙ্কেলের নিজস্ব ল্যাবরেটরিতে কঠোর মান নিয়ন্ত্রণ বা কোয়ালিটি কন্ট্রোল করে তৈরি করা হয়, যাতে এই গণতন্ত্র কেবল আঙ্কেলের স্বার্থই রক্ষা করে, কিন্তু সাধারণ মানুষের কোনো প্রকৃত মুক্তি না আনে।


এই রূপক আখ্যানের সবচেয়ে নিষ্ঠুর অথচ বাস্তব অংশটি হলো আঙ্কেলের প্রাসাদের পেছনের সেই ‘আস্তাকুঁড়’ বা ভাগাড়ের বর্ণনা। এই ভাগাড়ে ফেলে রাখা হয় সেইসব মানুষদের, যারা একসময় আঙ্কেলের খুব বিশ্বস্ত দালাল, স্বৈরাচারী শাসক কিংবা তাবেদার ছিল, কিন্তু সময়ের পরিবর্তনের সাথে সাথে যারা আঙ্কেলের এজেন্ডা বা পলিসি বাস্তবায়নে ব্যর্থ হয়েছে কিংবা যাদের মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে। সাম্রাজ্যবাদ যখন কাউকে আর প্রয়োজন মনে করে না, তখন তাকে কতটা নির্মমভাবে টিস্যু পেপারের মতো ডাস্টবিনে ছুঁড়ে ফেলে দেয়, এই আস্তাকুঁড়টি তারই এক প্রতীকী চিত্র।


পাশাপাশি, আঙ্কেলের প্রাসাদ থেকে যে জলধারা বা নদীর উৎপত্তি ও প্রবাহ দেখানো হয়েছে, তা বর্তমান বিশ্ব-অর্থনীতির এক চমৎকার ময়নাতদন্ত। এই জলধারাটি যখন অন্য কোনো দেশে প্রবেশ করে, তখন তা আসার সময় সেই দেশের যুদ্ধ, মহামারি, অস্থিতিশীলতা আর অশান্তির ধ্বংসাবশেষ কুড়িয়ে নিয়ে আঙ্কেলের প্রাসাদে জমা করে। আর যখন আঙ্কেলের প্রাসাদ থেকে সেই জলধারাটি আবার ফেরত যায়, তখন তা ‘নতুন শান্তির ধারা’ বা শান্তির বুলি নিয়ে প্রবাহিত হয়। এটি আসলে বিশ্বজুড়ে মার্কিন বা পশ্চিমা দেশগুলোর সেই সুপরিচিত ফরেন পলিসির দিকে আঙুল তোলে, যেখানে তারা প্রথমে কোনো দেশে অশান্তি বা যুদ্ধ বাধায়, তারপর সেই দেশের খনিজ, তেল বা অর্থনৈতিক সম্পদ লুটে নেয় এবং পরিশেষে সেখানে ‘শান্তি রক্ষা’ বা ‘গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের’ নাম করে নিজেদের স্থায়ী আসন গেড়ে বসে।


সাহিত্যিক শৈলী ও লেখনীর দিক থেকে সাম্য রাইয়ান এই উপন্যাসে এক অসামান্য মুন্সিয়ানা দেখিয়েছেন। উপন্যাসটির সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এর তীক্ষ্ণ ও বুদ্ধিদীপ্ত হিউমার এবং স্যাটায়ার বা ব্যঙ্গবিদ্রূপ। আমাদের সমাজ ও রাজনীতির যে অন্ধকার ও কুৎসিত দিকগুলো নিয়ে আমরা সাধারণত গম্ভীর বা হতাশ হয়ে পড়ি, লেখক সেগুলোকে এত চটুল, রসাত্মক অথচ অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন সংলাপে রূপ দিয়েছেন যে, পাঠক পড়তে পড়তে হাসবেন, কিন্তু পরক্ষণেই এক গভীর শূন্যতা, অসহায়ত্ব আর রূঢ় বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে থমকে যাবেন। হাসির আড়ালে লুকিয়ে থাকা এই কান্না বা হাহাকারই এই উপন্যাসের আসল সার্থকতা।


একই সাথে উপন্যাসের গঠনশৈলীতে রিয়ালিজম বা বাস্তবতাবাদের সাথে সুররিয়ালিজম বা পরাবাস্তববাদের যে মিশ্রণ লেখক ঘটিয়েছেন, তা বাংলা সাহিত্যে খুব বেশি দেখা যায় না। প্রথমার্ধের রতনের কর্পোরেট ও রাজনৈতিক জীবনের করপোরেট বাস্তবতার সাথে দ্বিতীয়ার্ধের অন্ধ জাদুকরের প্রাসাদের সেই জাদু-বাস্তবতার রূপান্তরটি এত মসৃণভাবে ঘটেছে যে, পাঠকের কোথাও খটকা লাগে না, বরং পুরো আখ্যানটি একটি সুতোয় বাঁধা মনে হয়। উপন্যাসের ভাষাশৈলী অত্যন্ত আধুনিক, গতিশীল এবং সাবলীল। সমকালীন নাগরিক জীবনের ভাষা, ফেসবুক বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের শব্দ চয়ন এবং প্রাত্যহিক জীবনের কথোপকথন যেভাবে উপন্যাসে এসেছে, তা তরুণ পাঠকদের খুব সহজেই লেখার সাথে সম্পৃক্ত করতে পারে।


পরিশেষে বলা যায়, ‘সকল প্রশংসা মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের’ উপন্যাসটি কোনো নির্দিষ্ট সময়ের বা কোনো কাল্পনিক চরিত্রের গল্প নয়, এটি আসলে আমাদের বর্তমান সময়ের এক জীবন্ত দলিল। এটি আমাদের ভূ-রাজনীতির নোংরা খেলা, মিডিয়ার মগজ ধোলাইয়ের মেকানিজম, এনজিও বা অধিকার ব্যবসার আড়ালের সত্য এবং আঙ্কেল স্যামরূপী এক অদৃশ্য ও সর্বগ্রাসী পুতুলের বাক্সে বন্দি আমাদের মতো তৃতীয় বিশ্বের কোটি কোটি সাধারণ মানুষের অসহায়ত্বের নির্মম প্রতিচ্ছবি। সাম্য রাইয়ান কোনো কৃত্রিম আশার বাণী বা সস্তা সান্ত্বনা দিয়ে উপন্যাসটি শেষ করেননি, বরং তিনি আমাদের বাস্তবতার নগ্ন রূপটি চোখের সামনে মেলে ধরেছেন, যা প্রতিটি সচেতন ও চিন্তাশীল পাঠককে বইটির শেষ পৃষ্ঠা বন্ধ করার পরও দীর্ঘ সময় ধরে ভাবাবে এবং নিজেদের চারপাশের জগতটাকে নতুন করে দেখতে বাধ্য করবে। যারা সস্তা প্রেমের গল্প বা চেনা ছকের গোয়েন্দা কাহিনীর বাইরে গিয়ে একটু ভিন্ন ধারার, বুদ্ধিদীপ্ত এবং রাজনৈতিক স্যাটায়ারধর্মী সাহিত্য পড়তে পছন্দ করেন, তাদের জন্য এই উপন্যাসটি সমকালীন বাংলা সাহিত্যের অন্যতম একটি সেরা ও অবশ্য পাঠ্য বই।

গুচ্ছ কবিতা : সমীর সরকার

 



এখানে গন্ধ আওয়াজ তোলে ছোঁয়ার 


যদি তোমার মত ভালোবাসতে পারতাম, 

হয়ত-বা কোন আগন্তুক ছুঁয়ে যেত , 

ফিরে এসে বলত এ অর্থে বিরতি   


আলোর পরেরটুকু  তো আমার ছিল না বন্ধু !


এ যাবত যা কিছু এক তরফা হতে দাও 

কতটুকুই -বা আয়োজন করেছ!

আপ্লুত পরিহার করে একটু স্নান সেরে এস 

আজ মধ্যাহ্নের আগ্রহ ডেকেছি 

দু'দলা ভাত গলা থেকে নামুক আমারও 

কারণ এখানে গন্ধ তবু আওয়াজ তোলে,  ছোঁয়ার





আবছা এক কলিং বেল,

বেজে ওঠে ঘুমের মতো 


 আর বলার মতো কেউ থাকে না 


যে কখনো এই দৃর টেনে ধরত, 

আজ খুব সামান্যে এসে দেখি 

একটা কলিং বেল, আবছা

বেজে ওঠে ঘুমের মতো 


আমি হয়ত চিনি সেটা অথবা কোনো ঝিরঝিরে কুয়াশার রাতভর ফিসফিস !


ব্যস্ততা, কলমের টানাপোড়েন

তবু রাস্তা পার হয় পুরোন চশমার দোকান —


হয়তো'র মতো কিছু বাষ্প 


এসে ঘন হয় চোখের মুঠোয় 

টেবিল ল্যাম্পের শরীরে জড়িয়ে যায় 

উবু হয়ে বলে যাওয়া হালকা একটা বাদামী চুমুকের দাগ





এ এক মধ্য, চোখ লেগে আসে 


চোখ লেগে আসে যেমন 

এক মধ্য বয়সী পড়তে পড়তে :


গায়ে ডুবে আসা সীমান্ত 

চাদর উল্টে দেখি 

সন্ধ্যে হয়ে আসছে কর্পূর ও জখম 


আমি তখন কেজি দরে বাজার ডাকি —


হাওয়ায় দুলতে থাকা 

গমের ছোট ছোট আলপথ 

খোয়া বিছানা দুপুর 

বিকেলের রোদ পোড়া উঠোন 


কোথাও যেন বৃষ্টি 

ঢেলে দেয় দড়ির নরমে 


যাপন পেতে আসে আদ্যপান্ত

আর তার ঠিক এক পাশে

জড়োসড়ো হয়ে আসা 

মধ্য বয়সী একটু নুন —


ঢিলে হয়ে আসে


ঢিলে হয়ে আসে যেমন 

ওর ছাতা মেরামত দুটো চোখ



                          


কখনও আপত্তি করিনি 


এই ধর রাস্তা যখন একা ছিল 

হাঁটতে দ্বিধা ছিল না —


গল্পের মতো 


পাশ কেটে কেউ চলে গেলেও আপত্তি ছিল না 


আগে কিংবা পেছনে 

— এই  আমার মতো হয়ত-বা কেউ 

জিনিস ফেরত নিত দোকান! 


জোর করে যে জুতো জোড়া পায়ে দিয়েছি 

অভিজ্ঞ কোনো মতলব অভিযুক্ত মাপেনি 


অথচ দূর থেকে যখন জিজ্ঞেস করি 

চেনা চেনা পথ —

পুরোন বাড়িটা এগিয়ে দেয় আমায় সদর অবধি 


জল শুকিয়ে এলে 

যে পথ ভিজে ভিজে থাকে 

তার নামে রোদ পোষ 


কে জানে কখন ছেড়ে আসা কোন্ লেখা

তোমার মতো পাঠ্য হয়ে যায় —



                        


কিছু  জ্বলতে দাও 

কে জানে, ওসব আগুন 

কখন যে আলো হয়ে যায় 


আমাদের মাঝখানে অভাব তেমন নেই 

তবু যতটুকু শব্দ, রোজগার হয়ে গেছে 


এখানে প্রতিটি রাস্তার বাঁকে নেমে আসে মেঘ 

সামান্য অজুহাতে ছুঁয়ে ছুঁয়ে থাকে 

আপেল ফুলে জলের শ্বেত 

ঢাল বেয়ে যে স্নান এখনও গা মুছে ওঠেনি 

ও দূরের বারান্দায় কী নাম দেব তার 

রোদের মতো রুপালি আঁশ 

যদি আখরোট জড়িয়ে নেয় 

প্রতিটি বোঁটায় আমাদের ঠোঁট বোলো ওখানে 


এখানে নদী হেঁটে পার হওয়ার 

চোখের নিরন্তর শব্দ 

গভীরে সেঁকে নেয় মোটা রুটির আঁচ 


আমি যদি তোমার অতিথি হতাম 

অন্তত কিছু জল এনে দিতাম 

কারণ এখানে জমানো শীত বড্ড দামী 

পয়সা নেয় সোনালি আঁশের প্রতিবিম্ব

                          -সমীর সরকার                          সমীর সরকার

গুচ্ছ কবিতা : পিয়াল রায়


 


সন্ত্রাস 


উদ্বাস্তু বিকেলের কথা তারাই বোঝে

যারা সেই বিকেলের দিকে

হেঁটেছে কখনো 


তুমি দেশলাই জ্বেলে দেখে নিতে চাও

অথচ মানো না 

দেশলাই আসলে একটা অন্ধকার 

যা আলোকে আরো কিছুটা অন্ধপথে টানে


জড়িয়ে ধরতে গেলেই

জিভ থেকে জিভ

অসহ্য যাতায়াত 


প্রতিটা অবৈধ ইচ্ছে এরপর জেনে যায়

কীভাবে সঙ্গম হয়ে ওঠে

গোপন সন্ত্রাস 




একদিন নড়বড়ে সেতুটা ভেঙে পড়বে


কোনো সবুজই ভুলিয়ে দিতে পারবে না

নাগরিকতার লোভ

কথারা প্রশ্রয় পেয়ে চলে যাবে সেদিকেই


আর এভাবেই আমাদের ফাঁক-ফোকরগুলো

ভরিয়ে তুলবে শূন্যতা


আমরা হারিয়ে যেতে যেতে ভাববো 

না হারানোই ছিল ভালো 

তারপর হারিয়ে যাবো অমোঘ বিন্দুর দিকে


রক্তের প্রবল উস্কানিতে

তুমি নয় আমি নয়

জিতে যাবে অবিনাশী ভ্রম 





যুদ্ধ 


চাঁদের গায়ে হেঁটে যাচ্ছে স্পষ্ট পিঁপড়ের দল


বড় অসময়ে ইচ্ছেগুলো জাগে

ভেঙে যেতে যেতে ঘরের ভিতর

আমলকী ছায়া কেঁপে ওঠে


সব পরীক্ষা জিতে যাওয়া ভালো দেখায় না


কিছু কিছু মর্মান্তিক পীড়া

মরতে মরতেও মরে না


আসলে যুদ্ধ বিরোধী মন

একবার যুদ্ধে ঢুকে পড়লে বোঝে না কিছুই 





সৌন্দর্য 


সন্দেহ করে তোমরা পরস্পরের নাম রেখেছ অবিশ্বাস 

জীবনকে বয়ে বেড়ানোর নামে তৈরি করেছ

পাথরের ঢেউ

নিজেরই ঘরের ভিতর আত্মদীর্ণ কবরের মাটি

এক অতিজন্মের শির-উল-বয়ান


পথ ছাড়ো

সরে দাঁড়াও বৃদ্ধ মৃতের দল

আমরা অগ্রাহ্য করছি তোমাদের

নিভিয়ে দিচ্ছি লক্ষ বছরের পচা সূর্যটাকে

তোমাদের শোকাচ্ছন্ন স্রোত


পাতাল-পৃথিবীর সাথে কয়েক যুগ হেঁটে এসে

আমরা জোর দিয়েই বলতে শিখেছি

যন্ত্রণাই সৌন্দর্যের মাতৃস্বরূপা হোক





জলের সন্তান 


কাছাকাছি আসার জন্য 

যতটুকু প্রয়োজন

ততটুকু কাছে আসতেই হবে


এখানে দরজা খুললে মেঘ

এখানে জানলা খুললে মেঘ

দরজা আর জানলার মাঝে

নিষিদ্ধ মেঘলা আবেগ


ক্লান্তিতে ভেঙে পড়ছে শরীর

মুছিয়ে দিচ্ছে পানকৌড়ির নরম চিবুক

নতুন করে জন্ম নিচ্ছে জলের সন্তান

জন্ম নিচ্ছে সুতোর উষ্ণ মুখ

Saturday, July 11, 2026

গুচ্ছ কবিতা : মৃন্ময় মান্না

 



এলিয়েনেশন


আর লিখতে ইচ্ছে করে না। এই পুঁজিনিয়ন্ত্রিত অর্থনৈতিক সমাজে দাঁড়িয়ে, দৈনন্দিন জীবনের ঘূর্ণিতে হঠাৎ আবিষ্কার করি—লেখার ইচ্ছেটাই যেন বৃথা হয়ে উঠেছে। আনন্দ কিংবা বিষাদের বহিঃপ্রকাশ যদি বাক্সবন্দি করা যায়, তাহলে ঠিক আছে। নাহলে নিকট লোকেও তা নিয়ে বিন্দুমাত্র আগ্রহ দেখায় না।

অবশ্য যে কাজে তুমি সফল নও, তাতে তোমায় উৎসাহ দেওয়া মানুষজনের বড় অভাব। সেটা যে চূড়ান্ত আকাম তা বোঝাতে এগিয়ে আসে সমাজ। এই সমাজে কাজের সংজ্ঞাটা এরকম যা থেকে ভোক্তা সরাসরি বেনেফিশিয়ারি হতে পারে। যে সৃষ্টির তাৎক্ষণিক প্রয়োগ নেই, তায় আবার কাজ কয় নাকি! এই উৎসাহহীন বদ্ধ কালচক্রে লেখার ইচ্ছেমৃত্যু ঘটে।

আমি তো লিখে সামাজিক স্বীকৃতি চেয়েছিলাম, জীবনানন্দের মত বাক্সবন্দি লেখক হতে চাইনি। কিছু মানুষ যারা একদা লেখা পড়তে চাইতেন, তারা পথচলতি সাক্ষাতে লেখালেখির ভবিষ্যতের কথা জানতে চান। আমি সবিনয়ে আশ্বস্ত করি, “নতুন লিখছি, পড়াব শীঘ্রই”। বারবার এই মিথ্যা আশ্বাস বানী শুনতে শুনতে বিরক্ত হয়ে এক সময় তারাও বলা ছেড়ে দেন। 

কবিতা লেখা বন্ধ হয়ে যায়, কবিতা নিয়ে আলোচনা বিস্মৃতির অতলে যায়, বাক্য গঠনের শৃঙ্খলা ভেঙে পড়ে। মার্ক্স যে এলিয়েনেশন-এর কথা বলেছিলেন, তা যেন নিঃশব্দে আমার উপর আরোপিত হয়।

সৃষ্টির সঙ্গে সম্পর্কের শিকড়ে টান পড়ে—নীরবে, বছরের পর বছর।





কফিন


জীবনের প্রহর আঁকতে বসে

অক্ষমতার অতীত ডুবে যায় বিস্মৃতির আঁধারে।


শৈশবে অক্ষমতাকে ভেবেছি মৃতের কফিন

সেই কফিন আমায় উপহার দিয়েছে অ্যালঝাইমার্স!


কতবার ভেবেছি সাক্ষাৎকার নেব গুণীজনের

কিন্তু কফিন আমার মগজে দিয়েছে ইম্পোস্টার সিন্ড্রোম। 


দগ্ধ দেহমন, বিস্মৃতির অতল

কফিন সহমর্মিতা দেয়নি, পৃথিবী চিনিয়েছে


কতবার ভেবেছি পাহাড়ে বাস্তু বানাবো

পাহাড়ে বেশি ঠান্ডা, মাথায় পরবো ইয়ার মাফ বা বিনি 

তখন আর কেউ কফিন দেখতে পাবে না। 

সিমপ্যাথি পাহাড়ি ছড়া বেয়ে নীচে নেমে আসবে

সমতল থেকে সমুদ্রে...


তখনই আমার জয়। 





চতুর সেপিয়েন্স...


কবিতা লেখার জন্য চতুর হতে পারিনি।

হয়ত লিখেছি যা তা মধুমেহ

হয়ত ভেবেছি যা তা নিউট্রিনো

হয়ত যা দেখেছি তা পৌরাণিক...


অন্ধকার মহাবিশ্ব থেকে ইপস্টাইনের গুহ্যদ্বারে,

যে বৃহন্নলা রাষ্ট্রের গ্রহণ কামনা করে।

তার জন্যই কোনোদিন চতুর হতে পারিনি। 


একজন এসে বলল, আমি হোমো ইরেক্টাস

একথারও যে সারমর্ম আছে

তারজন্য আমি কখনো বন্ধু হতে পারিনি। 


যে কবি আমাকে সংবেদনশীল বানিয়েছিল

তার মৃত্যু হবে বিষবৃক্ষের মতো। 

পর্বতের চূড়ায় রেখে এসেছি বৈরাগ্য

আমি সংসারী, বেদনা আমার নিজস্ব

বৈরাগ্য সঙ্গে থাকলে বন্ধু অথবা চতুর হতে পারতাম। 

হোমো সেপিয়েন্স বন্ধু ও চতুর একইসঙ্গে হতে পারে না।

Wednesday, July 8, 2026

গুচ্ছ কবিতা : মঙ্গল হাজরা

 



রেখা : ১


জানি কিছুই লেখা হবে না, কারন এর কোনো প্রেক্ষিত নেই!


তোমার সকালবেলার স্বপ্নগুলো প্রান্তিক রেখার এইপাড়ে

নির্জন শব্দে হারিয়ে যায়

এসো বলেই তো আসতে পারে না। মাঝে বিষন্ন কাঁটা, তারে


জড়িয়ে পড়ে শিশিরবিন্দু; হাওয়ায় টলটল করে জল


জানি এই সবটুকু মুছে ফেলা হবে। বড়ো হবে মেঘাস্থি বিদ্বেষ 

মানুষ এইটুকু ছাড়া শিশুটিকে আর কী দিতে পারে…






রেখা : ২


কিছু, বুঝে ফেলার আগেই, হাওয়া সরে গেল যেন

সত্বর আড়াল হয়ে গেল পায়ের চিহ্ন নতুন 


সরে যায়, সরে তো যাবেই; তবে আরো কতদূর, কত কত মেঘের ভিতরে 


ঠিক ততদূর, যেইখানে তোমাকে নিজের সন্তান বলে চিনতেই পারি না

ওখানে বিবর্ণ সীমানা পোঁতা হয়, ওইখানে বিদ্বেষে শিউরে ওঠে, এখনও 


বিষের ফেনার মতো আমাদের মুখ

Tuesday, July 7, 2026

গুচ্ছ কবিতা : মিলি দাস




যেখানে কৃষ্ণ নীরব


অনুচ্চারিত কাব্যের ভেতর 

রাধা নামের অলংকারে বৃন্দাবন থেকে ফিরে এলেন মাধব,

ঠোঁটের মৌতাতে অমরত্বের স্বাক্ষর দেখে আঁচলের বাতাসে উড়ে বেড়ায় অনন্তের সমর্পণ,

প্রেম কোন ধর্মগ্রন্থের একচ্ছত্র অধিকার নয় ।


বুদ্ধের নীরবতা এসে জড়িয়ে ধরলো আমায়

কৃষ্ণের সুরে বুকের পাঁজরে এলো উজানের টান 

নজরুলের বিদ্রোহে ভুলতে থাকলাম নিকোটিনের গন্ধ 

রবি ঠাকুরের পুন্যি পুকুরের করুণা ধারায় স্নান সেরে

জীবনানন্দের একাকী পথে কিছুটা হেঁটে গিয়ে লালনের আখড়ায় আশ্রয় নিয়ে দেখি 

শান্ত জলেও কত গভীর ঢেউ ।





দেহের অন্তঃপুর


আমার দেহের নিভৃত রাজপ্রাসাদে সাতটি ঋতু পাহারা দেয়,

ভোরের রক্তে বৈরাগ্য প্রদীপ জ্বলে ওঠে

অস্থির সিঁড়ি বেয়ে নেমে আসে অছিলা  প্রার্থনা, কক্ষপথেই শুধু তর্জনী ছুঁয়ে ছুঁয়ে থাকে।


চোখে কুয়াশার আলো গড়িয়ে পড়ে না আর,জন্মেরও আগের স্মৃতি ,শরীরি ছায়া, লেলিহান শিখা 

শিশির মাখছে সোহাগের অবগাহনে,

এক অনন্তের দূত রাজমোহর নিয়ে বসে থাকে,

অদৃশ্য অন্তঃপুরে প্রবেশ করে সে রাজা হতে চায়নি কখনো, তবে চেয়েছিল সিংহাসনের ব্রহ্ম মুহূর্ত ।





প্রতীক্ষার সমাধিলিপি


নীরবতার বৃক্ষে গোধূলি রোদ

আলো দিয়ে যায় নিস্তব্ধ বিকেলে,

খালপারের দিকে চেয়ে দেখো 

প্রতিক্ষায় মরে যাওয়া পরাজয় আমায় ঋজু হয়ে বাঁচতে শিখিয়েছিল।

বারোটি বছর ধরে নিশীথের প্রদীপ জেগে আছে অভিমানী অন্তরে,

অবহেলা পুড়ে দৃঢ় করেছে আমার নতুন জন্ম।

রোদরং উপত্যকার দেওয়ালে ক্ষতবিক্ষত অপূর্ণ জীবন 

উষ্ণ প্রতিশ্রুতি মোহময়ী দীর্ঘশ্বাস হয়ে থাকে ,

এক নদীর সম্পূর্ণ স্রোত হতে গিয়ে 

নিকানো উঠোনের আকাশ জুড়ে 

কান্নার শব্দে শুধুই শোনা যায় হা কৃষ্ণ হা কৃষ্ণ, মাধব আমার।





অন্তর্জলের উপাখ্যান


পরিযায়ী পাখিরা হিরের দ্যুতি নিয়ে এলে বাউল বাতাসে একটি নদী জন্ম নেয় প্রতিদিন, 

ধুতুরার বীজ কুড়িয়ে আনে কীটপতঙ্গ 

জ্বরে পুড়ে যাওয়ার আগেই যুবতী নারীর আমিত্ব সমুদ্রের জলে মায়াবী রাত খোঁজে ।

গাঢ় মেঘ নিঃশব্দে মেলে দেয় কুয়াশা ,

উদাসী চোখে গোপন শ্বাসের জোয়ার,

জ্যোৎস্না সংগম থেকে মুক্ত হয়ে আত্মার অসীম গন্তব্য সাগরে ম্যাহেফিল বসে,

অবগাহনের অন্ধকারে গঙ্গাস্নানের পর তৃষ্ণা মুগ্ধতা পেলেই বলতে থাকে ছায়া নাও ছায়া নাও।





নিঃসঙ্গ একতারা


তিস্তার শিরদাঁড়া বেয়ে অসমাপ্ত বাক্য পাহাড়ের বুকে নীরবতাকে অনুবাদ করলেই , তুমি সূর্য হয়ে ওঠো। 

অরণ্যের পথে একটু এগিয়ে গিয়ে দেখো কত সংকুল পথ,

আমাকে ছুঁয়ে থাকো

ইছামতির জল রেখার প্রতিটি পাতা খুলে তোমাকে সবুজ ব্যাকরণের পথে হাঁটিয়ে নিয়ে যাব অনেক দূর, আঙুলের প্রতিটি ডগায় বিভূতিভূষণের অদৃশ্য অক্ষর বেঁচে থাকে, আমার চোখের ভেতর তাকিয়ে দেখো কত উপন্যাস রোপণ হয়েছে কতকাল ধরে,

দ্রৌপদীর আঁচল ঘিরে কত নিকষ অন্ধকার লেখা হয়েছে, 

এই ময়ূরপঙ্খী বুকে একবার হাত রেখে দেখো বর্ষামঙ্গলের অবশিষ্ট শ্বাস রচনা হয়নি এখনও, আয়ুষ্কাল পূর্ণ হওয়ার আগে ফিরে এসো একবার।

গুচ্ছ কবিতা : রাধাবল্লভ চক্রবর্ত্তী

 



দুঃখ 


এক দু’দিনের সংসার 

তারপরে সব ধ্বংস 

কংসধরের বংশ 

বাজাক তবে বংশী 


এসব খেলায় দংশন

পেতেও পারো আংশিক;

মুঠোয় ভরা সংশয়, 

তা যেন লভ্যাংশ –   


তোমার পাড়া পাংশু, 

তাও কীভাবে কিংশুক

ফুটেছে নিঃসংশয়? 

সখ্য থেকে দাস্য, পরক্ষণে হিংসা – 


মান রেখো রাজহংস, 

মনখারাপের বংশী,

কংসাবতীর দুঃখে,  

যেভাবে গায়, আংশিক…  





মায়া


কেন যে কাঁদিকাটি, কেন যে ভালবাসি, 

এখনও তার কোনও কারণ নেই 

ফলত একা-একা, শ্মশানে যেতে পারি

কারওর বাধা বা বারণ নেই 


আমি কি তারও বেশি? আমি কি আরও কিছু? 

যদিও মুখে উচ্চারণ নেই, 

যদিও অবসরে, রাখাল হয়ে গেছি, 

তবুও তো পশুচারণ নেই


যা-কিছু নির্জনে, ঘটার ঘটে গেছে, 

কোথাও কোনও বিস্ফারণ নেই

এভাবে কেটে গেল? তোমার যৌবনও… 

গর্ভে কোনও ভ্রূণ ধারণ নেই


যদিও এই মন, করেছ উচাটন,

যদিও তার কোনও মারণ নেই, 

ভুলিনি তাকে আমি, কখনও ভুলব না, 

আমি যে বেঁচে আছি তার অন্নেই… 





দিনলিপি


আমরা সবাই আসতাম 

দেখতে তোমার বস্তি 

করিনি আশ্বস্ত 

দেওয়ালে তাও স্বস্তিক 


সূর্য গেছে অস্ত 

ভালবাসার শাস্তি 

হয়েছি অভ্যস্ত 

এটাই এখন বাস্তব 


তার চেয়ে বিশ্বস্ত 

এই জগতে নাস্তি 

ফলত আজ পস্তাই, 

আমরা যারা নাস্তিক – 


তোমার-আমার বাস্তু, 

যৌথখামার, কাস্তে,

নৌকো, নদী, মাস্তুল 

আমরা ভালবাসতাম…  





খুনসুটি 


আমরা চলে যাব, তোমরা থেকে যাবে

আলোর দিন 

ঘেঁটেছ রূপকথা, ঘেঁটেছ ছাইপাঁশ 

ঘোড়ার ডিম 


পেয়েও পাচ্ছ না, না, না, আলস্য না, 

কপাল দোষ

আমিও হয়ে গেছি, তুমিটি যেভাবে 

অবাধ্য –


কীভাবে চাঁদ ডোবে, কীভাবে ঘুমপরী 

উঠল রাত -

আমি কি কালকেতু? তুমি কি ব্যাধবউ?

ফুল্লরা  


আরও তো কথা আছে, আরও তো কথা থাকে

শুনবে কি? 

আবার কাছে আসো! আবার ভালবাসো! 

ছিঃ! এ কী!      




 

আদর

 

তোমার দুয়ারে শস্য, এলিয়ে পড়ছে রাতদিন 

নিজেই নিজেকে মারলে, বাঁচাবে কার সাধ্যি! 


কিছুটা আয়না নগ্ন, কিছুটা পরেছে বল্কল 

তোমার বিবাহে জাগছে, কোন বেহারার পালকি? 


নীরবে পেরোও চৌকাঠ, নীরবে জীবনতৃষ্ণা 

এখন আকাশে খুব রোদ; মাথায় বাঁধনি উষ্ণীষ? 


আমার দু’হাতে শৃঙ্খল, আমার দু’পায়ে সর্ষে 

অবর জমিতে তাও রোজ, অভ্যাসে হলকর্ষণ –


আমিও মেটাতে পারিনি, এমন ভীষণ তার ক্ষোভ! 

হয়তো আমিও উন্মাদ, হয়তো সে খুব তার্কিক


কীভাবে তোমাকে বলব, এক-দু’কথায়, বাক্যে? 

রূপকথা খুব নিষ্প্রাণ! ভয় পেয়ে যায় রাক্ষস! 


কেউ না জানুক, আমি তো, থেকেছি তার সাক্ষী – 

শোনো, এই পথ দুর্গম, তাও ঠোঁটে ঠোঁট রাখছি…    


গুচ্ছ কবিতা : রূপম ভৌমিক




 বৃথাই 


বৃথাই তুল্যমূল্য।

ওসব আর আলগা লাগে।

সমান তো হতে হবে তা কই?

কুয়োতে বাস। 

বিশাল জগতের স্বাদ।

থাক তবে ওটাই আনন্দনিকেতন।

কেমন যেন ছোট ছোট খোপ দেখতে পাই।

হে প্রভু আলো দাও।

কৃপা দড়ি ফ্যালো।

বৃথাই এটাকে আসল ভাবছি কেন!





রোগ


রোগ মানুষগুলো রোগে ভুগছে। 

বড্ড অসুখ মানুষগুলোর।

হিংসার অসুখ, জাতের অসুখ।

ধর্মের অসুখ, অমানবিকতার অসুখ।

একে অপরকে মারছে ক্রমাগত মারছে।

মেরেই যাচ্ছে যতক্ষণ না পর্যন্ত সে অচেনা হয়ে যাচ্ছে।

লাশের শনাক্তকরণ  হয় না।

লাশ হয়ে ওঠে রাজনীতির তরজা;

সন্ধ্যের আলোচনা ঘিলুর খাওয়ার।

বড্ড ছোঁয়াচে হয়ে উঠছে সংকীর্ণতা।

মানুষগুলো একে একে আস্তাকুঁড়ের পোকা হয়ে উঠছে।

হাতে হাতে ঘুরছে অস্ত্র আর কিছু বইপত্র।

খুলির ভিতর ভয়ংকর অন্ধকার।


আমি চেয়েছিলাম ভালোবাসা সংক্রমিত হোক, কই হলো না তো?

জানের বদলে জান চারিদিক কবর শ্মশান।

রোগ হয়েছে মানুষগুলোর বড্ড কঠিন রোগ।

মানুষগুলো রক্তের পিপাসু হয়ে উঠেছে , মানুষগুলো ভালো নেই।





নপুংসক


সুঠাম হাড় মাংসের বাড়ি।

রক্তে সভ্যতার মৃত্যু কণিকা।

শ্বাস প্রশ্বাস এ হলাহল।

গোলা বারুদ ভর্তি পকেট।

নাক টা বার বার গলে যায়।

আরে যাওয়াটাই স্বাভাবিক!

এত পাপ কোন ব্যাংকে জমা হয়?

সারি সারি মৃতদেহের ভিড়।

পাখিরা হারিয়েছে নীড়।

এখনো ধর্ষণে মগ্ন সাদা শুয়োর।

একবার সে নিজেকে দেখুক...

আসলে সে জারজ নপুংসক!

তাও মগ্ন দেহরস বিলাতে।

একটা সুঠাম দেহ, মানুষ নয়।





অন্ধ স্রোত


সবার সাথে আমিও তুমিও মশগুল।

হুড়োহুড়ি একটু ভুল, পায়ের নিচে পিঁপড়ে জীবন।

জানি না কি যে মোহ মায়া,

পাপ ভর্তি ব্যাগ পিঠে।

অবগাহন তারপর, তারপর কি?

আবার পিঠে সেই ব্যাগ নিয়ে যাত্রা।

বিরাট স্রোত পায়ের নিচে আবার কে কোথায়!

বয়েই চলেছে বয়েই চলেছে.....

তুমিও আমিও ব্যাগগুলো পড়ে আছে।





আদিম শকুন


ধারালো নখ ঠোঁট দেখতেই পারছি আমি, 

তোমরা কি পারছো না দেখতে?

শক্ত করেই চেপে বসেছে মাটির মাংসে।

উপড়ে নিচ্ছে একটার পর একটা মাংসপিন্ড।

চোখের দিকে এগিয়ে ঠুকরে দিয়েছে।

তোমরাই তো দেখিয়ে দিয়েছ নরম মাংসের ঠিকানা।

এবার তোমরাই বোঝো!

শ্লীলতা আঁচড়ে তুলে নিয়ে খুবলে খেয়েছে সুধাপিন্ড।

আমি বেশ দেখতে পারছি, তোমরা কি পারছো না দেখতে?

তোমাদের মাথায় হাত দাও একবার টোকা দাও ভিতরে টং টং করে শব্দ হবে।

কিছুই নেই দেখে এসো মগজ কোথায় আছে জমা।

আদিম শকুনের পুরো ঝাঁক এসেছে কালো গিজগিজ করছে।

তোমরা দেখতে পারছো না? আমি দেখতে পারছি।

তোমরাই দায়ী! এবার কি করবে।

প্রাচীন পাপের সুড়ঙ্গে পা দিয়েছো হাড় টুকুও কি অবশিষ্ট থাকবে?

আমি দেখতে পারছি সেই আদিম শকুনের হিংস্র চোখ, তোমরা এখনো দেখতে পাওনি?



প্রবন্ধ : ফজলুল করীম

মার্কিন সাম্রাজ্যের সাহিত্যিক ময়নাতদন্ত সাম্য রাইয়ান-এর উপন্যাস ‘সকল প্রশংসা মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের’ সমকালীন বাংলা সাহিত্যের এক অত্যন্ত সাহ...