Sunday, June 28, 2026

গুচ্ছ কবিতা : সন্তু মুখোপাধ্যায়



আগামী 


কেউ ফিরে গ্যালো

অন্তিম শয্যার পাশে শুয়ে

শোকাহত মা

ফুরসৎ নেই কাউকে দোষ দেবার! 

সারা গায়ে কালি মেখে 

ল্যাংটো ছেলেটি মানচিত্র আঁকছে

উল্টো করে ঝুলিয়ে রেখেছে -

দেড় দশকের পাপ চিহ্ণ । 





মাস্তুল


উপত্যকায় দাঁড়িয়ে মাস্তুল দেখি

খেদ হয় -

অনেকদিন সমুদ্রজল মাখিনি

বিস্তীর্ণ দ্বীপের পরিযায়ীর মতো কেবল

দূর থেকে উষ্ণতা মেপেছি

শরীরী ভাষ্যে রোমন্থন করেছি –

পাড় ভেসে যাওয়ার অনুশোচনা ! 


তবু একজন নুলিয়া 

আমাকে পরখ করতে ভোলেনি । 





প্রেমপত্র 


দেখা হওয়া বা ভালোলাগা ছাড়াও কিছু কথা থাকে অসম্পূর্ণ। যেভাবে একটি ময়ূর বৃষ্টির ঠিক আগে নেচে নেয় উত্তাল, যেভাবে কিশোর বালকটি ছুঁয়ে নেয় প্রথম মেঠোফুল সেভাবে আমাদের প্রেমকথা ফুরোয় না! 

অন্তহীন পথের মাঝে যদি কোনো বাঁকে দেখা হয় তোমার আমার তা একান্ত সুখ বলে জেনো। ফিরে এসে শুধু বলে যাও ছেড়ে যাওয়ার ভুলটুকু কিম্বা রবাহূত পাখির পালক গুঁজে নিও চুলে তোমার। কতকটা পথ শুধু একাকি চলেছি আকাঙ্ক্ষিত অর্জনের আশায়, মিশে গ্যাছে কত বনফুল পাখি দিন যাপনের শেষে। তবু একটি প্রেমপত্র লিখে রাখি গোপন চোখের ঈশারায়। 





স্বেদবিন্দু


আপাতত নির্বাসনে আছি

চোখের পলকে পাল্টে যাচ্ছে 

মাটিঘর বারান্দা আর সূর্যঘড়ি

মুলতুবি ঘোষণা করছে -

চা সহযোগে মূল্যায়ণ


অল্পতেই মন খারাপ হলে

ফুরিয়ে যায় না কিছুই

শুধু

একটা শব্দ ছুঁয়ে যায়

তোমার স্বেদবিন্দু। 





অন্তর্ঘাত


যদি কখনও আকাশকে ছোট মনে হয়

তবে জেনে নেবে

সেই পরিধি সীমানা অতিক্রম করেছে 


নিঃসন্দেহে একটি মানুষ

নিজের মতো একটি ভূখণ্ড গড়তে পারে

তার নাম দিতে পারে - স্বপ্ন

স্বপ্ন কখনও  আকাশের সমার্থক নয়

বরং বিপরীত। রাষ্ট্র ও সমাজের বিপরীত। 



এর উর্ধ্বে জেগে থাকে

সরল সমীকরণ -

অন্তর্ঘাত ! 

গুচ্ছ কবিতা : সাম্য রাইয়ান

 


পাড়াতো বানর


পৃথিবীর কোনও গল্পে এই বানরটি নেই

যে আমাদের বাড়িতে এসেছে গতকাল

গাছ থেকে গাছে লাফিয়ে বেড়াচ্ছিলো

স্বরসন্ধির আড়ালে তার উজ্জ্বল গরিমা

ডুমুর পাতার দিকে ঝুঁকে থাকা রেণু


উঠোনে কলার থেকে অভিমানে খসে যাচ্ছে বোতাম

শুকনো বৃষ্টির পরে অ্যানিমোমিটারে বাড়ছে হাওয়া


বিব্রত বানর কোথায় লুকিয়ে আছে কে জানে!

মা তাকে খুঁজে হয়রান

কলার কাদি হাতে

সাথে ক’টা খুচরো বিস্কুট


পৃথিবীর কোনও বনে এই বানরটি নেই

চুপচাপ বসে আছে পাতার আড়ালে৷





ক্রিয়ার বাগান


বিপন্ন সমস্তটুকু জুড়ে একটি অট্টহাসি 

চেপে বসেছে, দুধশাদা রাজহাঁস


দূরাগত চিত্রকর বসে আছে, সদাহাস্যরসে

                    পানপাতা শুষে নিচ্ছে আলো

ময়দানে তুমুল ইশারা, দশদিক জমকালো৷


তোমার ছায়ায় দাঁড়িয়ে

একটানা

কথা বলে হেসে নিচ্ছি

রোদে

শুকিয়ে নিচ্ছি ঘ্রাণ৷


তবুও সকল বিষণ্নতা জুড়ে ঘুমিয়েছে ক্রিয়ার বাগান৷





ব্রিজ, ব্রিজ


জুতোর মাপে পা এঁকে নিচ্ছি৷ ব্রিজের উপর ব্রিজ

ভেদ করে পুলিশের গাড়ি, অথবা অ্যাম্বুলেন্সও

হতে পারে৷ পরিচিত ধানক্ষেতজুড়ে ভ্যানগঘ৷


হাইফেন চক্রের পাশে আমি ও মহোদয়

লুফে নিচ্ছি জলের শুশ্রূষা৷


ভ্রান্তিটুকুই বাঁচিয়ে রাখবে আমাদের

দেখে নিও—

হাহাকারে নষ্ট হবে চোখ৷


এই বুদ্বুদগুলো নদীর নিঃশ্বাস 

বেঁচে থাকার চিরকৌশল—


উড্ডীন পাখিদল

আমাদের ভেতরে রেখে যাচ্ছে ডানার ছায়া৷

তার চোখে চেনা জল, ঠোঁটে অসংখ্য ঢেউ

একটি ডানায় লিখছে লুপ্ত রোদের ইতিহাস৷ 





রাংতা-মাঠের কাহিনি


রাংতার মাঠে ফিসফাস, ডাহুকের ছায়া

আগুনসন্তাপে উধাও বাড়িঘর!


শুধু কিছু শিউলির ঘ্রাণ লুকানো

                             জুতার বাক্সে


তারপর, কত নির্জন দুপুরে

রোদকে আগুন ভেবে পালিয়েছে বৈমাত্রেয় ডানা!


সুদূর শূন্যতায় ভেসে ওঠে শাদামাটা রেখা

মেঘ তার কতটা উত্তাপ ধারণ করতে পারে!


ধূর্ততা ও সাইরেন পুড়িয়ে দিচ্ছে ঠোঁট

গোপন হিংসায় কেঁপে উঠছে অপাদমস্তক


কোথাও সমুদ্র আছে

আশ্চর্য জ্বরের ভেতর এটুকু শান্ত-স্বস্তি৷





সাগর স্বরলিপি জানে


তীরঘেঁষে যেটুকু লিপি অস্পৃশ্য ভালগার 

মিশে গেছে দুপুরের রোদে, আশ্চর্য ধূর্ততায়

আনত ভূমির কাছে দুলে ওঠে অন্ধকার

হাতিরা স্নান সারে উজ্জ্বল গরিমার দিনে


এখানে এমনই আগুন—বনের জীবন

সাইরেন ফেলে পালিয়ে যাচ্ছে প্রহরী৷

কিছুটা হিংসা ভুলে তুমি দূর পাতাল থেকে

বাড়াও হাত-ভর্তি রেণু৷ 


স্বরলিপি—ওই পত্র থেকে দুলছে সাগর

দ্যাখো বাদ্যযন্ত্রসমেত দুলে ওঠা শাখায়-পাতায়৷

প্রাচীর ভেদ করে এগিয়ে যাচ্ছে ঢেউ, 

তোমার চোখে বালি ও ফেনা; আস্ত সাগর…

Thursday, June 25, 2026

গুচ্ছ কবিতা : সুশ্রুত আইচ



 ১।

 চওড়া কাগজ জুড়ে

                 ফড়িং মেরেছি একটা! 


তারপর, 

         অবিরাম


তোমায় চিঠি লেখার ভান করে

লিখেছি,

   

           প্রতিবার    আলাদা      আলাদা 


                          আমার পরিচয় 


এমাথা ওমাথা ঘুরে ঘুরে 

                  আমরা  সম্ভবত নিজেদের খুব কাছে এসে পড়েছি





২।

খুব কাছে গেলে

ভিন্ন ঠেকে চাহনির অভিঘাত 


তাই 

নিখুঁত দূরত্ব রেখে 

দেখতে চেয়েছি


কিভাবে, 

তুমি তোমার পূর্ণাঙ্গ ছবিটির দিকে  

                                              হেঁটে চলে যাও!





৩।

ক্রমশ মাঝমাঠের দিকে এগিয়ে আসছে গোলপোস্ট! অহেতুক টেনে লম্বা করার মত সময় আর আছে কী? 


প্রায় গোটা আকাশ জুড়ে পাখিরা ফিরছে 


তাদের ছায়া টুপটাপ, ঝড়ে পড়ছে ;

              

                                                          বৃত্তের বাইরেটায় 


আমরা এতোকিছু ভেবেই উঠতে পারলাম না। চটি-জুতো আর পায়ের মাপ বদলে গেছে দেখে 

আমাদের সে কি খোরাক! মাইরি তখন থেকে দাঁত কেলিয়েই যাচ্ছি!  


"আরেকটা বিড়ি ধরা ভাই, বিকেল তো ফুরিয়ে এলো "


বন্ধুর সাথে এই শেষ কথা।





৪।

মাত্রাছাড়া বাতাস ফুলছে ঝোলায়৷


শঙ্খে ফুঁ দিলে,

                   দিন বড় হয় 


শিশি ভেঙে যায় 

                পোড়া আতরের


                                 থাকা না থাকার ফারাক ,

সেদিন নিদ্রাভ্রমণে শরীর নিল না আমায়! 


উঠে দেখি

ফের কোনও স্ত্রীলোকের পেটে হাত পা ছুঁড়ছি 


বলাই বাহুল্য,


এই হেতু, আমার প্রেমিকারা বারোমাস দুঃখে থাকে





৫।

আমরা এখন যেখানে আছি ; আসলে সেখানেও আমরা নেই। যেন এই স্বপ্ন কিছুতেই শেষ হচ্ছে না।

যেন জলরঙ ফেটে বেরিয়ে আসছে 


আমরা কেন যে উন্মাদ নই

আমরা কেন যে আরও বেশি সচেতন নই এ বিষয়ে 


আমাদের হারিয়ে যাওয়া, ফিরে আসার মত সহজ নয়; কেন যে বেজে ওঠো ; থামতে ভুলে যাও! 


কিছুই বুঝিনা ছাই তোমার খেলা 


আমরা এখন ; আমরা তখন ; তুমি তো কবেকার 


যদি কোনও শব্দে দেখা দাও ; লিখি

লিখে রাখি 

আমাদের হাসি মুখ ; দুঃখ আমাদের!

Monday, June 22, 2026

গুচ্ছ কবিতা : ভাস্কর সরকার


 

এই ঈশ্বর এই ছুরি


খেলার মাঠেতে ওরা

দূরে কালো কালো মেঘ

সরে সরে যায়

পশ্চিম দিকেতে সূর্য নেমে আসে

রোদের ভেতর বৃষ্টি বৃষ্টি

প্রতি ফোঁটা সোনার কণার মতোন 

চিক চিক করে

পৃথিবী বুঝতে পারেনি ──

এ কী বৃষ্টি? 

আলো?

বিদায়? 

শুরু?

প্রকাশিত নাকি গোপন?






ছায়াছবি


ধবল আভার এক স্ত্রী চিতল হরিণ স্বভাবগত দৌড়ে পালায়


স্থির হয়ে শুয়ে থাকে তার ছায়া

জলের ভেতর






স্ক্রিপ্ট


ধরুন ── 

আপনি আজ রাতে মারা যাবেন 

তারপর আপনার কিছু মনে থাকবে না

দুশো লাখ লোক আপনাকে ঘাড়ে করে নিয়ে যাবে কোনো ঘোলা জঙ্গলে নদীতে

তখন পুরো অন্ধকারও নয় কিংবা পুরো আলোও নয়

অসীম জল চারদিকে জল আর জল কোনো তীর নেই 

পাখিও নেই 

আর সেই জলের বুকের উপর কোনো এক সময়ের স্যাক্সোফোনের সভা ভেসে চলবে


বিথোভেন বব ডিলান রবি শংকর মোৎসার্ট 

আরোও আরোও...






ভরপেট ভ্রমর সন্তান


তার বাবা তার বাবা তার বাবা...

বসিয়ে দিয়ে চলে শরীরে মায়া হরিণছানা

পথে চলতে চলতে ফুটে গেছে কার পায়ে কুলের কাটা কিংবা 

বেওয়ারিশ লাশের হাড়

নেউলের দাঁত কার কীরকম কী ছিঁড়ে 

নিয়ে গেল - তাতে কার কী!

তার বাবা তার বাবা তার বাবা 

এসব কেউই পরোয়া করেনি 

প্রজননের ভূমিকা ও রচনা  নিয়ে বড় চাউমাউ ছেপে গেছে বটতলার ব্যানারে 

ঐ মূলত দীর্ঘ সন্তানেরা মদের ঘরে বসে আজও পোষে


আজও...






রসপিপাসুজন


প্রথম মানুষ দ্বিতীয় মানুষ 

বেটে লম্বা মানুষ কালা ধলা ওরা

রাত ঠিক আড়াইটে ঘড়িতে 

নিয়মিত কথা কয় 

মানব মানবী চায়

প্রার্থনাকারী ফড়িং যেভাবে 

হাঁটু মুড়ে থাকে শিকারী বেশেই 

সম্পর্ক জিকিরে জিকিরে সূরা হয়নি

আবার হয়নি বিচ্ছেদও 

কাঠবিড়ালি শালিকের মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়বে পৃথিবীর যত মফসসলি সংবাদ


কালো / বিষ /  কৃষ্ণ / অশুভ /  অজানা—সব যাবতীয় ঘটবে


একটা গভীর কালো নদী

কালিদহ কালিদহ নাম...

Sunday, June 21, 2026

গুচ্ছ কবিতা : চঞ্চল নাঈম

 







দড়ির গিঁট


একটা অচেনা জট—

সহজে খোলে না


টান দিলে

আরও শক্ত হয়


—ধৈর্য ছাড়া

তা খোলা যায় না


কিছু জট

অবুঝ বলপ্রয়োগে নয়

বোঝাপড়ায় নীরবে খোলে


 



ভুল সময়ের সাক্ষাৎ


আমরা ঠিক সময়ে দেখা করি না

সবসময় একটু আগে বা পরে—

সেই ফাঁকে তৈরি হয়

আমাদের সমস্ত অমিল


তুমি যখন পৌঁছাও

আমি তখন নির্জনে চলে যেতে থাকি

আমাদের মিলন-সমূহ

শুধুই স্মৃতির মধ্যে জড়ো হতে থাকে


যেন আমরা কখনোই একসাথে নই

একসাথে থাকার ধারণায় আছি


 


 

বাতাসের জীবনী


বাতাসের কোনো ঘর নেই।

সে কখনো

নিজের নামে জমি কেনে না।

কোনো শহর তাকে নাগরিকত্ব দেয় না।


তবু সে

সব গাছের সঙ্গে পরিচিত,

সব নদীর খবর জানে,

সব পাহাড়ের কানে

গোপন কথা বলে।


আমি মাঝে মাঝে ভাবি—

স্থায়ী ঠিকানা না থাকাই

হয়তো সবচেয়ে বড় স্বাধীনতা।


 


 


 

Monday, June 15, 2026

গুচ্ছ কবিতা : পার্থসারথি চট্টোপাধ্যায়



কয়েকটি কবিতা 


নৈশ-আলোর কোনও পানসী নেই

সমুদ্রে তলিয়ে যাচ্ছে কাঠের জাহাজ

দুটো তারা 

ফ্রক পরে খেলা করছে ...

কিছু দূরে গুল্মময় পাথরের চূড়া থেকে

দেখা গেল কপ্টারের চাকা।


পাখির অস্থি, সাপের খোলস, পিঁপড়ের ডিম 

কোথাও শিশুদের 

নিজস্ব খেলনাবাটি নেই। 


সাদা বালি ভরা মুঠি 

বুনো ঘাস ও চেরাই কাঠের আগুন

এত তাড়াতাড়ি — নিভে আসছে! 


তারা দুটি এরপর কোনদিকে দৌড়ে চলে যাবে? 




সাইকেডেলিক জ্যোৎস্না ! 

বারান্দায় প্যালেট রাখা আছে

কালো রঙ ঘুরে ঘুরে আসছে

সিঁড়ি ভেঙে নামছে

মাটি খুঁড়ে বের করছে স্রোত। 


মাছ একটি রুপোলি উদ্ভিদ

পুড়তে পুড়তে 

অন্ধ হয়ে যাচ্ছে। 


আপনি ব্রাশ চালিয়ে আঁকুন

ঘুমের ভিতরে কতগুলি কালো দরজা

ঠিক এইভাবে ডানা মেলছে। 


বস্তুত আপনার কাছে

কোনও সাদা পায়রার ছবি তৈরি হয়নি। 




অফ করা ট্রানজিস্টার

কতক্ষণ পরে 

আপনাকে ঘুম থেকে 

শিকড়সুদ্ধ উপরে ফেলতে পারে?


ফুল ফোটার কোনও শব্দ নেই বলে

তৈরি করলেন

টর্পেডো মিউজিক ! 


আপনি লক্ষ্য করুন

বহুমাত্রিক অসুস্থতা কোন ঋতুর দিকে

তার চন্দনপিঁড়ি পেতে রেখেছে। 


জীবন একটি শাপলা ফুল ও রোগা শালিকের উপন্যাস। 




স্বাদু লাল ফল —

অপুষ্ট গাছের দোলনায়

সুড়ঙ্গে সাঁতার কাটছে বাদামি পোকা। 


ডায়েরিতে টুকে রেখেছি 

শিশুদের ছায়া, ফড়িংয়ের গান, নিঃসঙ্গ বাতাস

চশমার ভাঙা কাঁচ থেকে ঝরে পড়ছে দৃশ্যগুলি। 


সমুদ্রতীরে একটা মড়া গাছ দোল খাচ্ছে

অসুখের ডালপালা বেশ ভূতুড়ে

উড়ে আসা বিদ্যুৎ হঠাৎ নীল হয়ে যায়। 

তেঁতো আর বিস্বাদ — এই বৃষ্টি ! 


তবুও আশ্চর্য এই ফল

কামড় বসাতে গেলে চাঁদ ভেঙে দ্বিখণ্ডিত হয়।

Friday, June 12, 2026

গুচ্ছ কবিতা : আমির হামজা

 



মানুষী 


ধানহীন মাঠে বৃদ্ধি নিচ্ছে 

অতিকায় ধাতব জিরাফ, গ্রীবার নিচে বৃক্কের ন্যায় একটি পুকুর — থানকুনি,  শিরিষ, মুণ্ডহীন তালগাছ 


বাঁশ গাছের শুকনো স্নায়ু আগলে নিচ্ছে হালি পাখনা,মজ্জাহীন টিনের চালা…


ধবল চামড়া, বাঁশপাতা চোখ নিয়ে রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে যে গাছ — সে আমার মানুষী





নদী ও চৌরাস্তা 


চৌরাস্তার মোড়ে পাবলিকের চোখ রাঙানি ছিটিয়ে তোমাকে দেখছি 


হাবাটে হতে হতে এক মুঠো কাঠগোলাপ তোমার কোলে জমা করছি, সিঁদুর নদী হয়ে মাথা ভরা চুলে স্নান করছো নিভৃতে

ঠোঁটের উপর তিল বাড়ি 

ডুব দিতে দিতে খুঁজে পেলে — সফল ডুবুরি 

না হলে আমিও ফল্গুধারা 





ধাতব কঙ্কাল 


জলের থালা থেকে জন্ম নিচ্ছে বক,

পানকৌড়ি এসে নাকের কাছে আঁশটে গন্ধ প্রসব করে যায়

দায়িত্ব বেড়ে যায় জন্ম বড় করার 


তবুও উলঙ্গ ধাতব কঙ্কাল এখনো অধৈর্য হয়নি..

ছিন্ন মস্তিষ্কে স্নায়ু লেগে আছে,উপরে তিনটি কাক অতএবের ঘরে বসেবসে 

সাফাই গাইছে 


কবিতার কাছে গেলে খোয়াব দেখি — এক মানুষীর ,টিনের চালায় বসি,নির্জনে হলদে সবুজ শোনপাপড়ি পাতে তুলে হাওয়া করে,

শ্যালোর জল ছিটিয়ে দেয়,

হাতে করে ভেজায় ঠোঁট …





চতুষ্কোণ 


প্রজাপতির পাখনা সাঁতরে নিচ্ছে লৌহ জল

শুঁড়ের ঠোঁটে রেণু, জিন এবং আগামী


নিস্তব্ধ সরে টোকা দিচ্ছে পাকা রুই-মৃগেল,

তবুও পাঁজর ছাড়ানো দেহ 

খুঁজে নিচ্ছে চতুষ্কোণ — চাদর



সমস্ত কুহক সরিয়ে নিচ্ছে সরষে পিঁপড়ে,

পিছনে আদিম মোড়ল


এখানে উবু হয়ে গাছ জল খায়,আঙুল ভেজায় 

ডুবে যায় নাকী!

সাদা-কালো প্রপেলার পিঠে শুয়ে থাকে 

চোখে তার অসীম তৃষ্ণা





ক্লোরোফিল 


মানুষ আদতে গাছ, আলো মাখে না বলে

লালাভ ধমনী-শিরা 

রঞ্জকহীনতা ও রঞ্জকের আপোস —গাছ 


ভেতরে ভেতরে সবুজ শিরা উপশিরা

ভেসে আছে — প্রকাণ্ড বাঁশ ঝাড়


দু একটা ফিঙে বুকে বাসা বাঁধে, সময় — অসময়ে উড়ে যায়

Wednesday, June 3, 2026

 


যা কিছু অস্পৃশ্য এবং ভূতো


১।

ভূতো বড়ো সাধারণ ছেলে। ভূতোর মতো অসাধারণ বানিয়ে বলতে কেউ পারে না। ভূতো গাঁজা খেয়ে গাঁজাকে ভুলে যায়। ভুলে যাওয়া গান মনে করে ভূতো নিজেকেই গেয়ে যায় চোখ বন্ধ করে। ভূতোর প্রেমিকা থাকে উৎসবের শহরে। যদিও ভূতোর কোনো প্রেমিকাই নেই। কেননা ভূতো সারাক্ষণ মাঠে ঘাস পোকা পাখিদের সাথে ঘুরে বেড়ায়। সন্ধ্যা হলে ধোঁয়ার ভেতর বসে একটা মিথ্যেকেও শুধু শুধুই  জীবন্ত করে তোলে। ভূতোকে বিশ্বাস করা যায় না। ভূতোকে অস্বীকার করতে গিয়ে ভূতোর প্রেমে পড়ে যাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি থাকে। অতএব মেনে নেওয়া ভালো ভূতোর সত্যিই প্রেমিকা আছে।

ওই দেখো প্রেমিকার সঙ্গে ভূতো যাচ্ছে জঙ্গলে। একা হতে যাচ্ছে দুজন। জোনাকি যেমন অন্ধকারের সঙ্গে একা। বাঘ যেমন শিকারের সঙ্গে একা। তেমন উৎসবে যাচ্ছে দুজন। দুজনের চোখে কৃষ্ণমেঘের দল। দুজনের চোখে অবিশ্বাসের জল।



২।

আপাদমস্তক অন্ধকার একটা ওভারকোটের নাম ভূতো। পোষাক পুরোনো হলে এবং বহু ব্যবহার সত্ত্বেও তার ভাবমূর্তি ভেঙে না পড়লে দেহের বৃদ্ধি যেভাবে তাকে আলমারির অহংকারে রেখে আসে, ভূতোকেও সেভাবে — বিশেষ কোনো ঋতুর বিরক্তিকর দিনে খুলে দেখা হবে তাই অনেকক্ষণ ওষুধে ভিজিয়ে রাখা হয়েছে। এরপর ঘষে ঘষে যাপনের ময়লা তুলে ফেলা হবে। কোনো কোনো দাগ এতোটাই উপেক্ষিত ছিলো — ঘরোয়া কোনো টোটকাই আজ আর তাকে সম্পূর্ণ মুছে ফেলতে পারছে না। অস্বচ্ছ অথচ স্মৃতিলব্ধ দাগ নিয়ে ভূতো রোদ্দুরে শুয়ে আছে। রোদ্দুর তাকে বোঝাচ্ছে — ওভারকোটের দিন আবার আসবে। আলমারির অন্ধকারে সে যেন তার চরিত্র হারিয়ে না ফেলে।



৩।

তোমার সঙ্গেই রয়েছে ছুরিটা অথচ খুঁজে পাচ্ছ না তুমি। সারাক্ষণ সে তোমার মাথার ভেতর ছুটি কাটাচ্ছে আর তোমাকে সন্দেহজনক করে তুলছে শিকারী কুকুরের মতো। বুনো একটা গন্ধ তোমাকে উত্তেজিত করে তুলছে এই বৃষ্টিহীন মেঘের দিনে। লম্বা শ্বাস পড়ছে  আর রোঁয়াগুলো ফুলে উঠছে ঘাড়ের। সন্ধ্যার রেস্তোরাঁয় একের পর এক গ্লাস শূন্য করে ভাবছ জলের প্রতিধ্বনি এসে তোমাকে এলোমেলো করে দিয়ে যাবে খানিক। এতোসব মাথার মধ্যে নিয়ে তুমি তোমার প্রেমিকের সাথে শুতে যাবে ঘরে ফিরে। সারাদিনের সমস্যাগুলো সামলে উঠতে যে তোমার দুটো হাত কম পরে যাচ্ছে  এটা খুব নীচু স্বরে বলবে ও আলোটা কমিয়ে দেবে অন্যহাতে।  ছেলেটা অল্প আলো পছন্দ করে। এতে তিনজনের বেশ সুবিধাই হয়। ছুরিটা দুজনের মাঝখানে নিশ্চিন্তে ঠ্যাঙের ওপর ঠ্যাং তুলে দিয়ে সংসার ও তার প্রয়োজন অপ্রয়োজনের হিসেব শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে পড়ে।


তখন গিয়ে ভূতোর একবার ডেকে দেখাতে ইচ্ছে করে। ম্যাডাম, এই আপনার ভেতরের ভয়, সন্দেহের বরফ, যত্নের ছুরি। একে দুজনের মাঝখানে রাখবেন না। পারলে অন্যকাউকে দিয়ে দেবেন, যাকে আপনি নিজের থেকেও বেশি সহ্য করছেন এতোদিন। ভূতোকে সহ্য করেছেন।



৪।

ঘরের ভেতর বসে ঘরের কথা ভাবাই হয় না। যেমন ধ্যানের ভেতর নিজেকে বাদ দিয়ে সকল কিছুই স্পর্শ করা যায়।চোখবন্ধ থাকলে তখন সব কিছুই দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। সেভাবেই এই ভিনরাজ্যের লোডশেডিংএ শুয়ে ভূতো দেখছে — মায়ের ঠাকুরের সিংহাসনটা উঁইয়ে ধরেছে। ঠাকুরগুলোও বেশ পুরোনো। কোনো কোনো ফটোগ্রাফের মুখগুলো খুব বেশি ঝাঁপসা হয়ে আছে।  চটে যাওয়া রঙের ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে আছে সোনার কলসী কাঁখে একটা হাত। এই হাত একদিন উজ্জ্বল রং দিয়ে বাঁধানো ছিলো। ঠাকুরের ও বয়স বাড়ে তবে। যেভাবে মায়ের বেড়েছে। মা আর ঠাকুর তবে একই। ইদানীং মা আর পূজা দিতে বসে কান্না করে না। জল দিয়ে সবাইকে স্নান করিয়ে ফুল তুলসী রেখে দেয় পায়ে। তারপর প্রদীপ জ্বালিয়ে, ধূপ জ্বালিয়ে একটা প্রনাম করে উঠে যায় খুব ধীরে। এই যে ধীরে শব্দটা লিখলো ভূতো, এর ভেতরে একটা জীবনের অবক্ষয় ও বিশ্বাসের পাথর পড়ে রয়েছে। এই পাথর স্পর্শ দিয়ে অনুভব করা যায় না। যুক্তি দিয়ে ভেঙে দেওয়া যায় ঠিকই। কিন্তু বিশ্বাসের সামনে কোনো যুক্তি কাজ করে না।  ভিনরাজ্যের এই গন্ডগ্রামে চিকিৎসা সেবা দিতে গিয়ে ভূতো হাড়ে হাড়ে এই সত্য অনুভব করেছে।  পাথরও ভেঙে যেতে পারে যদিও মাকে ভেঙে ফেলা, মায়ের বিশ্বাস ভেঙে ফেলার মতো নাস্তিক ভূতো না।



৫।

অপদার্থের মতো ঘুম পায় । ঘুম পাশ কাটাতে গেলে গতদিনের  শ্বাসকষ্ট আবার। মাথার অন্ধকার চোখে নেমে আসে। ভূত ভবিষ্যৎ কিছু মনে থাকে না ভূতোর । হাত কাঁপে, পা কাঁপে। হৃদয়ের পাথর পর্যন্ত কেঁপে রাস্তা অবরোধ করে দাঁড়ায়। অবরোধের ভেতর শুয়ে বসে ঘুমোতে ভালোই লাগে ভূতোর। ঘুম ভাঙার পর না বলতে পারা একপ্রকার তৃপ্তি চারপাশে হাত পা ছড়িয়ে ফুটে থাকে। খচ্চরকে খচ্চর বলতে ইচ্ছে হয় না তখন। ঘাড়ের ওপর আদর রেখে বলে — সুহৃদ তোমার  সূর্যাস্ত প্রকাশ হয়েছে। জামার বোতাম আটকাও।

Monday, June 1, 2026

শিখা রায়

 


প্রতীক্ষা

তখন বেশ সকাল। ভোরের কুয়াশায় দূরপাল্লার ট্রেন এসে থামলো  সশব্দে। ছোট স্টেশন। আড়ম্বর কম।অল্প স্বল্প লোক নামলো। সামান্য সরগরম হলো স্টেশন-চত্বর। চায়ের দোকানে একটু ভিড় বেশি। পুরি ভাজির দোকানের কিছু বিক্রি-বাটা হলো। কালো কোটের টিকিটবাবু  প্লাটফর্মের  এদিকে ওদিকে ব্যস্ত  হয়ে ঘোরাঘুরি করে চলে গেলেন। 

ট্রেন চলে গেল। আস্তে আস্তে স্টেশন চত্বর শুনশান। আবার সব স্বাভাবিক। স্টেশন-চত্বরের কুকুরগুলো আবার কুন্ডলী পাকিয়ে ঘুমের তোড়জোড় করছে। কুলি রামশরণ রামধুন গাইছে নিচুস্বরে আপনমনে ।ভিখারি পাসোয়ান নিভে যাওয়া আগুন উসকে দিয়ে নিশ্চিন্তে বসলো। 

এদিকে,ট্রেন থেকে নড়বড়ে পায়ে নেমে,সিমেন্টের ঠান্ডা বেঞ্চে এক বৃদ্ধা বসে আছেন। পাশে দুটো তিনটে  দমসম মলিন-কাপড়ের ব্যাগ। চোখে মুখে চিন্তার ছাপ। নিভে যাওয়া চোখে উৎকন্ঠা । এদিকে ওদিকে মাথা ঘুরিয়ে কাউকে খুঁজে চলেছেন । কেউ হয়তো আসবে । তাকে দেখে মনে হচ্ছে, তিনি ভুল স্টেশনে নেমে পড়েছেন। তার সারা শরীরে অজানা সন্ত্রাস।  

বৃদ্ধা নড়বড়ে ভঙ্গিতে বসে। ভুলো কুকুর যথারীতি পাশ ঘেঁষে বসলো তার। যেন কতকালের পাহারাদার। বৃদ্ধা কালো ভুসো চাদরটা আরো মুড়েসুড়ে বসলেন। এবার ঠান্ডাও পড়েছে। বেলা হয়েছে। কিন্ত রোদের তেজ নেই। চাওয়ালা সুবল এক ভাঁড় চা দিয়ে গেল বৃদ্ধাকে। বৃদ্ধা আঁচলের খুঁটে রাখা খুচরো পয়সা দিতে গেলেন। সুবল মাথা নেড়ে চলে গেল। বৃদ্ধা গরম চায়ের কাপে চুমুক দিলেন।

কুলি রামশরণ একসময়ে গান থামিয়ে বৃদ্ধার সাথে আলাপ জমাতে এলো। বৃদ্ধা নীরব প্রকৃতির। তাই আলাপ জমলো না। তবে তিনি কারুর অপেক্ষায় -তা বোঝা গেল। ভিখারি পাসোয়ান দূর থেকে বৃদ্ধাকে দেখছে।ভাবছে ভিখারি-সংখ্যা বাড়লো বোধহয়! তার কপালে চিন্তার ভাঁজ!

বেলা বেড়েছে। বৃদ্ধা একভাবে বসে। বোধহয় নড়াচড়া করতেও ভুলে গেছেন। তবে একবার উঠে কলের জলে হাত-মুখ ধুয়ে এলেন। পায়ে জড়তা।

ভাতের দোকানের বেঁচে যাওয়া ভাত-তরকারির হকদার পাসোয়ান, বৃদ্ধাকে ভাত দিয়ে গেল নিজের  ভাগ থেকে। তিনি অনভ্যস্ত ভাবে, সেই অযাচিত অন্ন গ্রহন করলেন। ভুলো কুকুরও ভাগ পেল।

আবার ট্রেন এলো। আবার চাঞ্চল্য। লোকজনের চলাচল। বৃদ্ধার চোখে স্থবিরতা। ট্রেন চলেও গেল। আবার সব শুনশান। শেষবেলায় গাছের শুকনো পাতা উড়ছে জনহীন প্ল্যাটফর্মে। বৃদ্ধা বেঞ্চের ধুলো ঝেড়ে শুয়ে পড়েছেন। মাথার ধারে ভুলো কুকুর ও বোধহয় দিবাস্বপ্ন দেখছে। আর বৃদ্ধা বোধহয় ফিরে গেছেন তার ফেলে আসা জীবনে। সেই জীবনে, যেখানে তার ঘর ছিল। ভালোবাসার মানুষজন ছিল। অগোছালো স্বপ্ন ছিল।

সন্ধ্যা নামছে। শীত আসছে। স্বপ্ন ভেঙে গেছে। স্বপ্ন ভাঙা চোখে আকাশ দেখেন তিনি। কুলি রামশরণ একটা পুরোনো কম্বল দিয়ে যায় তাকে। ভিখারি পাসোয়ান আগুনটা উসকে দেয়। সামনে লম্বা শীতের রাত আসছে। বৃদ্ধার প্রতীক্ষার শুরু হলো। বুকের আগুন জ্বালিয়ে তিনি এই দীর্ঘ শীতের রাত পার করবেন। রাতের অন্ধকারে চেনা মুখগুলো তার এখন অচেনা মনে হয়।

রামশরণ রামধুন গায় গুনগুন করে। স্টেশন-চত্বরে এখন শান্তি বিরাজমান। যদিও প্রতীক্ষার অবসান নেই। স্বপ্নগুলো যাওয়া আসা করে নিজের মনে। যদিও পাতা পড়ার শব্দে, বৃদ্ধা চমকে ওঠেন। ভাবেন, এই বুঝি কেউ এলো। দিনের পরে দিন যায়। সময় বয়ে যায় নদীর মতো। অবলীলায়!



প্রবন্ধ : ফজলুল করীম

মার্কিন সাম্রাজ্যের সাহিত্যিক ময়নাতদন্ত সাম্য রাইয়ান-এর উপন্যাস ‘সকল প্রশংসা মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের’ সমকালীন বাংলা সাহিত্যের এক অত্যন্ত সাহ...