দুটি কবিতা
অদিতি রায়
নিমন্ত্রণ করে গেল যারা
কোথাও তো যাওয়া উচিৎ,
সাদা ঘর সমুদ্রের ধার
অথবা গাছের বাড়ি- বৃষ্টি অরণ্যে
নিমন্ত্রণ করে গেল যারা
ঝড়ের একান্তে এসে, হাত ধরে বলে গেল "অবশ্যই আসবেন"-
যে কোনো শোকের রাতে, যে কোনো বিহনে।
যাওয়া তো উচিত সেই দেবদারু
ইত্যাদি সরলবর্গীয় লোক, মাথা তুলে পাহাড়েও খাড়া,
ভয় নেই অতল প্রপাতে বলে গেল হাত ধরে যারা-
তাদের কাঠের ঘরে, শ্যাওলায় হিম ধরা দিনে,
মস ফার্ণ লাইকেন ঝুলে আছে দেওয়ালে দেওয়ালে-
সাজানো বাতিরা ভেঙে গেলে
প্রায়-কিছু-না গুছিয়ে চলে যাওয়া যেত সেই সিঁড়িতে সিঁড়িতে,
অথচ কীসব জাল, মাকড়সা বুনে রেখে দ্যায়। হাটে ও বাজারে।
এই ঘর জেলখানা।
একত্রে পিষে ফেলে নিমন্ত্রণপত্র উহাদের!
তবু তো যাওয়াই যায় -একদিন যাবেনা- কি?
সামুদ্রিক বিছানায় শুয়ে-
আকাশী নিঃশ্বাস নিতে,
দুগ্ধফেননিভ শয্যা এক রোদে আর রোদে ভরে যায়।
অপহ্নুতি
আমাকে অঙ্কুর দিয়েছিলে?
নিজে কি হওনি উপ্তভাত?
আমাকে প্রেমিকা বলেছিলে-
প্রেমিক হওনি সারারাত?
হাঁটুজলে বয়ে গেছে নদী
এটুকুতে হয়না মরণ
যদি বা লোধ্ররেণু লাগে,
বসন্ত আসেনা স্মরণ
আর ছিল বাককুশলতা
স্পষ্ট করি লেগেছিল ভালো
পানশালা নস্যি রঙে ডুবে
যেন মীণ আঁখিতে তাকালো
কুন্দ কীসেতে উপমিত?
শিমূল কীসের শিহরণ?
গড়িয়ে গিয়েছে পাত্র-ভর
অন্ধকারধন্য যে স্ফূরণ
চেনাজানা এতদূর সারা
প্রেক্ষাপটে দু'একটা তড়িৎ
বারোমাস্যা গাহে ফুল্লরা
তূণে বধ্য মৃগ ও মারীচ।
----------------------------
গুচ্ছ কবিতা
বাপি গাইন
শাফিন সমগ্র
এক
দীর্ঘ এক বরফযুগের পর
সম্পর্কের পাথর বেরিয়ে পড়েছে
যেন শাফিনের এই মুখ আজও পুনঃরুদ্ধার করা যায়।
এখন যা কিছু ঘটবে সব দৈব
সব অপরজন্মের অস্ত্র ব্যবহার
পুরোনো রক্তপাত মুছেছে আবার নতুন আঘাত সাজানো
নতুনকে অসহ্য তারপর।
এই মুখ ঘাট থেকে ঘাটে ভেসে ওঠা রক্তবীজের দেহ
এই দেহ তুমুল সন্দেহ, স্বয়ং সৎকার।
দুই
পাথরের সঙ্গে থাকতে থাকতে একটা মানুষ কখন পাথর হয়ে যায় - সে নিজেও জানে না।
এই পৃথিবীর আলো ও বাতাসকে ভয় পাওয়ার অনেক কারণ আছে ।
যে শাফিন শুধুই উপেক্ষা দিয়ে গড়া তাকে ভয় পাওয়ার যথেষ্ট কারণ আছে ।
যখন এই পৃথিবীটাকেই অগ্রাহ্য করে তুমি বেড়ে উঠছ
আর বিশ্বাস নামক জন্তুটাকে ছিড়েঁ ফেলছ নিজের জীবন থেকে
তখন মহুূর্মুহর্মু ঘন্টা বাজছে কোথাও
আর স্পষ্ট হয়ে উঠছে নাটকীয় হাত
যে হাত অদৃশ্য সবার পেছনে ।
তিন
যে দরজায় বারবার আঘাত করার পরও দরজা নিরুত্তর থাকে
আর এক পুরোনো ঘড়ির শরীর টেনে নেওয়া শব্দ জীবনের ধারণা দেয়
সেই ধারণার মুখ কখনও শাফিন হতে পারে না।
অথবা একমাত্র সেই শাফিন হওয়ার যোগ্য
কেনা আজও সে প্রতি শব্দহীন-
লম্বা একটা ভুলের তালিকা সম্পাদনা করে যাচ্ছে
আর ঘেমে উজ্জ্বল হয়ে উঠছে সপ্রতিভ মুখের চামড়া।
যে কোনও প্রকার যৌথ সম্পর্কে আলাপকে ছুঁড়ে ফেলা হয়ে ছে জীবনীসমগ্র থেকে
যে কোনও প্রকার দুর্বলতা এড়িয়ে যাওয়া - যা গৃহের ধারণা দেয়।
চার
নিজের মৃত দেহ মুখে জীবনের দিকে ছুটে যাওয়ার নামই শাফিন।
শাফিন কোন মেয়ে মানুষ না, মানুষই না সম্ভবত।
এজন্য শূন্যের দিকে বাড়িয়ে দেওয়া প্রেমিকের হাতও কোনও পুরুষতন্ত্রের হবে না স্বাভাবিক।
সে অর্থে শাফিন এক জীবনধর্ম - একথা সত্য।
তাকে জীবনের ক্ষত ও শ্লেষ দিয়ে বঝুতে হবে ।
আকাঙ্খার দস্তানা খুলে ফেলে স্পর্শ করতে হবে সেই মৃত দেহটিকে ।
পাঁচ
দেখো শাফিন - পশ্চিমের আলো নিভে আসছে ।
আর বিশাল এই আকাশে একা একটা পাখি
কোথায় যে যাচ্ছে , আমরা জানি না কিন্তু
এই চলে যাওয়ার ভেতরে ঘর শব্দটি
না থেকেও কে মন অমোঘ সত্য হয়ে আছে ।
ছয়
অস্ত্রের চরিত্র আমরা জানি
হিংসার চরিত্র জানি ।
কেবলমাত্র ভাবাসার কাছে এসে
আমরা আজও দ্বিধা বিভক্ত হয়ে পড়ি শাফিন।
দিক ভুল হয়ে যায়।
সাত
ফেরা শব্দটির গায়ে চোখ মুছে দাঁড়িয়ে রয়েছে শাফিন
ভেতরে মেঘ আগুন জল
ভেতরে যোগ বিয়োগ শূন্য...শূন্য... শূন্য...
শূন্যের ভেতর দাঁড়িয়ে রয়েছে শাফিন
লাল শাড়ি শিশুর ক্রন্দন দিয়ে তাকে আর স্পর্শ করা যাচ্ছে না।
------------------
গুচ্ছ কবিতা
রূপায়ণ হালদার
বাজি উৎসব
অস্বাভাবিক চিৎকারে কেঁপে ছিল শরীর।
সংকোচে মাথা তুলে দ্যাখি
মাথা ভাঙছে অসময়ের ঘুম।
সাবধান হয়
টাকা খরচ করি বাজি উৎসবে,
অমাবস্যার রাতে ফানুস ওড়ায়,
তবুও আলোতে দ্যাখি না স্মৃতি-নক্ষত্র,
দ্যাখি না আনন্দ।
বাজি পোড়ে, আনন্দ পোড়ে
পোড়ে না শুধু
কলকাতার অসুস্থ কন্ঠস্বর।
কবিতা জন্ম দেবেনা, আমায়
তোমাদের স্বজন করতে বেড়িয়েছি
হাটে-বাজারে, ঘূর্ণবাতের কেন্দ্রে আলো জ্বেলে
খুঁজেছি নিম্নচাপ, ছটা ঋতুকে দিয়ে
হস্তমৈথুন করায়
তবুও কেনো এত বিতৃষ্ণা গ্ৰাস করে?
মনে হয়
কবিতা জন্ম দেবে না, আমায়।
হাতে মেখেছি রক্ত, সমুদ্রে ঠেলে দিয়েছি
নুড়িপাথর, তবুও....
বালিতে মিশে গিয়েছে শুভাশিস মন। ভালোবাসা।
সটাং কোনো এক অচেনা দৈত্য মুখ চেপে ধরে,
কোনো এক প্রান্তরে হাঁটলে মনে হয় অজস্র
দেওয়াল এসে পিষ্টে দেবে শরীর।
শীতের পোশাক পড়ে গাছতলায় বসি,
প্রার্থনা করি
কুয়াশা আপন করো আমায়।
লাল পট্টি বেঁধে আমরা এসেছি
১
নাম দ্যাখে আমি ছুটে এসেছিলাম মহাপুরুষের দ্বারে। চারিদিকের বাতাস তখনও মনে ভক্তি দিয়েছে। একবছর না কাটতেই দ্যাখি ঢোকার সময় আমার চোখে লাল পট্টি ছিল। অনুভূত হয় গিরগিটির স্বর্গরাজ্যে আমি একা, একমুখী অথচ বৈচিত্র্যময় রঙের তৈরি মানুষ। লাল পট্টি বেঁধে ঢুকেছিলাম। চিরকাল যে আমি কালো রং বর্জন করে এসেছি, সেই কালো রং পুরোপুরি ঢুকেছে মনে। আমি দৃঢ় হয়েছি ইয়ার্কি আর রসের কথা বলে। চোখ প্রথম লাল খুলে পেয়েছে ছেলে ধরার কৌশল। নিস্তরঙ্গ চিত্তে সামনে পা রাখি, ছেলে খুঁজতে গিয়ে দ্যাখি অধিকাংশ সেই ধান্দায়। মৃত্যুহার কমে জন্মহার বাড়তে থাকে।
২
লাল পট্টি বরাবর আমাকে অবাক করে। ব্যক্তিগত রঙে যে কালো ছিল তা পরিস্ফুটনের সুযোগ দিয়েছে মহাপুরুষের দ্বার। এখানে কেউ অসুখি নেই। কেনোনা, আমরা সবাই ছেলে। নিস্তরঙ্গ হয়ে এখানে ছেলে খোঁজা যায়।
৩
যত খুলি তত লাল পট্টি বেঁধে দিয়ে যায় কোনো নিরাকার মানুষ। বছর চারেক যাওয়ার পর যখন রাস্তা দ্যাখবো, সব শান্ত মনে হবে।
৪
আমার প্রত্যেকটি কথা লাল পট্টি দিয়ে বাঁধা। এখানে কেউ এসে কালো হয়(আমার মতো) কেউ কালো হয়ে আসে। অথচ সুখি। কেনোনা আমাদের চোখ লাল পট্টি দিয়ে বাঁধা।
আমরা মানুষ হবো। কারণ, “যে সয় সেই রয়”
তাই প্রেম
চিৎকারের সাথে সোহাগ করিনি
তাই প্রেম
ইস্তাহার দিয়ে চলে যায়
আগুনের সাথে বন্ধু করি না
তাই প্রেম
খুঁজে নেয় সামান্য দেশলাই
জলের সাথে শত্রুতা, দূরে থাকি
তাই প্রেম
আমার সামনে নদী হয়ে যায়
নিঃশব্দে ভয়; কবিতা আশ্রয়
তাই প্রেম
পাগল বলে পথ হারায়।
ইচ্ছে করে গায়ের তিক্ত বর্ণমালায়
তোমাকে ছুঁইয়ে দিয়ে বলি,
জীবনে বিষন্নতা.....
থাকলে অমৃতি।
এসো হাত এসো
অসীম মুহূর্ত ভেঙে উঠে এসো হাত
নিস্তব্ধ অন্ধকারে ফেলে দাও অলীক প্রমাদ
তুচ্ছ করো নিহারিকা গুচ্ছ
আয়না-শরীর ফেলে কাছে এসো
যদি না পায় দ্যাখা আর
কিছুটা সময় ধরে দেখবো একবার
এসো হাত বুকে নিয়ে ঘুরি
আমার হৃদয় থেকে সমস্ত মাধুরি
এসো হাত; ঠিকানা বদল করো
মুহূর্ত যায় হোক; এদিকে ফেরো

No comments:
Post a Comment