পুরাণে মৃত্যুকে নারীরূপে কল্পনা করা হয়েছে। অভীক বন্দ্যোপাধ্যায় প্রদত্ত সত্যপ্রিয় ঘোষ স্মারক বক্তৃতা ‘জড় মন চেতনা— মৃত্যুর পরিপ্রেক্ষিতে’ থেকে কিছুটা তুলে ধরছি— “কমললোচনা এক নারী করুণস্বরে বিলাপ করে চলেছেন; মৃত্যু তার নাম। প্রজাপতি ব্রহ্মার জীব-ধ্বংসে অক্ষমতার ক্রোধকে নির্বাপিত করার এবং তাঁর কর্ম সম্পূর্ণ করার দায়িত্ব অর্পিত হয়েছে এই নারীর ওপর, কিন্তু অধর্মের ভয়ে ভীতা হয়ে করজোড়ে ব্রহ্মাকে নিবেদন করছেন ‘আমি কদাচ বিলপমান প্রাণীগণের প্রিয়তম প্রাণ বিনাশ করিতে সমর্থ হইব না। হে পিতামহ! আপনি, আমাকে অধর্ম হইতে রক্ষা করুন।’ কিন্তু কে এই মৃত্যু? কেনই বা তার এত বলবীর্য ও পৌরুষ? সত্যযুগের রাজা অকম্পনের পুত্র হরি যুদ্ধক্ষেত্রে নিহত হওয়ার পর শোকাকুল রাজা এই প্রশ্ন করলেন নারদকে। যেখানে পুরাণে মৃত্যুকে দেবীরূপে, নারীরূপে কল্পনা করা হয়েছে সেখানে শোকাকুল রাজা অকম্পন তাঁর পুত্রের মৃত্যুর পর ‘মৃত্যু’-কে পুরুষের পৌরুষের অভিধায় ভূষিত করেছেন। একজন মানুষের শেষ হয়ে যাওয়ায়, চিরতরে পৃথিবী থেকে তাঁর শরীরী সত্তা বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ায় গভীর এবং প্রচণ্ড তীব্র শূন্যতার জন্ম হয়। এই চলে যাওয়া মৃতের আত্মজনের মনে এত তীব্র প্রতিক্রিয়ার জন্ম দেয় যে তখন সে রাজা অকম্পনের মতো মৃত্যুকে পুরুষের পৌরুষ এবং বলবীর্যের সাথে তুলনা করে তার অস্তিত্ব নিয়ে, তার ক্রিয়াশক্তি নিয়ে প্রশ্ন করে বসে। এই মৃত্যুই তবে জীব জগতে এক মুখ্য শক্তি যার ওপরে কোনও শক্তি নেই যা জীবনের মাহাত্ম আমাদের চরম ভাবে বুঝিয়ে দিতে পারে। অর্থাৎ এখানে প্রশ্ন মৃত্যুর অস্তিত্ব নিয়ে। অদতেও কি মৃত্যু আছে? আমাদের জন্ম আছে মাতৃগর্ভে, আমাদের আত্মপ্রকাশ আছে পূর্ণাঙ্গ মনুষ্য দেহে এবং পৃথিবীতে তার ভূমিষ্ঠ হওয়াও আছে। নারদ এ বিষয়ে যা শুনেছিলেন তাই বললেন রাজাকে। ‘সর্বলোকের পিতামহ ব্রহ্মা মনুষ্যসহ সকল প্রাণীকুল সৃষ্টি করার সময়ে দেবী বসুন্ধরার কাতর অনুনয়ে বিরত হলেন। বসুন্ধরা বিশাল প্রাণীকুলের ভারে নিপীড়িতা, অথচ পিতামহ কিছুতেই সৃষ্টি সংহারের পথ নির্ণয় করতে পারছেন না। এমন অবস্থায় তাঁর ক্রোধ প্রভাবে আকাশে অগ্নি উৎপন্ন হয়ে সমস্ত সৃষ্টিকে ধ্বংস করতে লাগল। এগিয়ে এলেন রুদ্র, সৃষ্টি রক্ষার জন্য ব্রহ্মাকে কাতরভাবে প্রার্থনা জানালেন। অনন্তর লোকপিতামহ ব্রহ্মা প্রজাদিগের হিতানুষ্ঠানের নিমিত্ত পুনরায় অন্তরাত্মাতে স্বীয় তেজ ধারণপূর্বক অগ্নির উপসংহার করিয়া সৃষ্টিহেতু প্রবৃত্তিধর্ম ও মোক্ষহেতু নিবৃত্তিধর্ম কীর্তন করিলেন। তিনি যখন ক্রোধজনিত হুতাশন সংহার করেন, তৎকালে তাঁহার সমস্ত ইন্দ্রিয়দ্বার হইতে কৃষ্ণ, রক্ত ও পিঙ্গলবর্ণ, রক্তজিত্ব, রক্তাস্য ও রক্তলোচন, বিমল-কুণ্ডলালঙ্কৃত, বিবিধ ভূষণে বিভূষিত এক নারী প্রাদুর্ভূত হইলেন। এখানে মৃত্যুরূপা নারীর রূপ লক্ষণীয়। তীব্র ভয়ঙ্কর তাঁর রূপ আর মৃত্যুর গাঢ় প্রাজ্ঞতা ও প্রক্রিয়াশীলতা প্রকাশ পায়। ‘যেহেতু তিনি উদ্ভূত হয়েছেন ব্রহ্মার সংহার বুদ্ধি প্রভাবিত ক্রোধ থেকে তাই এই নারীকে মৃত্যু আখ্যা দিয়ে তাকে পৃথিবীর সমুদয় প্রজাগণকে সংহার করার দায়িত্ব দেওয়া হল। কিন্তু নারীর স্নেহ-বাৎসল্য-করুণারসবোধ মৃত্যুর মনে সংশয় আনল। মৃত্যু তখন বহু সহস্র বছর তপস্যা করে প্রজাপতির কাছে এই আশ্বাস পেলেন যে, লোভ, ক্রোধ, অসূয়া, ঈর্ষা, দ্রোহ, মোহ ও নির্লজ্জতা নামক পুরুষ-ইন্দ্রিয়বৃত্তিসমূহ প্রাণীগণের দেহ ভেদ করবে। এই কাজে লোকপাল যম, ব্যাধিসকল এবং ব্রহ্মা স্বয়ং মৃত্যুকে সহায়তা করবেন; মৃত্যুর কোনো অধর্ম হবে না। পিতামহ বললেন, ‘আমার করতলে তোমার যে সমুদয় অশ্রুবিন্দু নিপাতিত রহিয়াছে, উহা প্রাণীগণের আত্মসম্ভূত ব্যাধিরূপে প্রাদুর্ভূত হইয়া প্রাণ সংহার করিবে; তাহা হইলে তোমার অধর্ম হইবে না।’...”
হিন্দু পৌরাণিক কাহিনিকে ব্যবহার করেছেন লেখক। মৃত্যুর প্রথম আবির্ভাব ঘটছে পৃথিবীতে। তার আগে পৃথিবীতে মৃত্যুর কোনো অস্তিত্ব ছিল না। কোনো নির্দিষ্ট সভ্যতা বা সময়কালকে তুলে ধরেননি লেখক। এতে প্রথমে একটু অস্বস্তিতে পড়তে হয়। নৃতাত্ত্বিক দৃষ্টিতে দেখলে এগুলো খানিকটা হলেও বিচ্যুতি। তবে সম্পূর্ণ উপন্যাস পাঠ করলেই আমরা টের পাই যে শুধুমাত্র কল্পনাই লেখকের কৌশল। কল্পনা থেকে উদ্ভুত আরও নানা তত্ত্ব উঠে এসছে সেসব নিয়ে আলোচনা করব। যেহেতু শুধু কল্পনা এই উপন্যাসের ভিত সেই কারণে স্থান ও কালও কাল্পনিক। সেখানকার মানুষদের জীবনযাপন এবং প্রথা ধরে নিতে হবে সবই কাল্পনিক। মৃত্যুকে প্রথম প্রাণীদের মধ্যে প্রবেশ করানোর ভিতর অনেক প্রশ্ন মনে ঘুরপাক খায়।
১. মৃত্যুকে পৃথিবীতে পাঠাচ্ছেন ব্রহ্মা। প্রথম মৃত্যু ঘটবে কোনো জীবের। তবে এর জন্য নির্দিষ্ট সময়কাল অন্তত চিহ্নিত করা প্রয়োজন ছিল। উপন্যাসে নানা মনস্তাত্ত্বিক জটিলতার সঙ্গে মোকাবিলা করেও লেখক এই সময়কালের সূক্ষ্ণ এবং জরুরি বিষয়কে উপেক্ষা করেছেন। সঙ্গে স্থান বা সভ্যতার উল্লেখও নেই। এর ফলে মৃত্যুর সঙ্গে জড়িয়ে নৃতাত্ত্বিক অনেক প্রথাকে পরিষ্কার করা যাবে না। মানুষ প্রথম কীভাবে বুঝতে পারল— মৃত্যু যে হচ্ছে তা আদতে মৃত্যু কি না। মৃত্যু একটি প্রক্রিয়া যা অবধারিত এটার বোধ হওয়ার কোনো মনস্তাত্ত্বিক জার্নি উপন্যাসে নেই।
২. প্রথম মৃত্যুর পরই মেয়েটির আর্ত কান্না অনেকটাই অলীক ঠেকে। যেখানে প্রথম মৃত্যু বিষয়টা জড়িয়ে। মনে রাখতে হবে মৃত্যুর পর কান্না শোকযাপন এ সবই পরম্পরাগত অভ্যেস। প্রথম মৃত্যু অনুযায়ী যে-বহিঃপ্রকাশ আমরা উপন্যাসে যা দেখেছি সেটা লেখকের অলীক কল্পনা মনে হয়। যদিও প্রশ্ন উঠতে পারে যে সেসব আমরা কেউই বলতে পারব না, প্রথম প্রতিক্রিয়া কী হত। তবুও যে-জার্নির মধ্যে দিয়ে পৌঁছনোর ছিল সেটা উপন্যাসে আমরা পাইনি।
আরও প্রশ্নের উদ্রেক হলেও যখন ভাবি এই উপন্যাস কেবলমাত্র কল্পনাশ্রয়ী তখন সেসব প্রশ্নের দিকে মন না দিয়ে উপন্যাসের কল্পনার জগৎ নিয়ে ভাবতে বসি। কীভাবে একটি উপন্যাস যা শুরু হল মৃত্যুকে প্রথম পৃথিবীতে পাঠানোর মধ্যে দিয়ে তা ক্রমে হিংসা যুদ্ধ স্বৈরাচারী শাসন এবং মানুষের মনোবল জয়কে উদ্যাপনের মধ্যে দিয়ে শেষ হয়। তবুও সম্পূর্ণ উপন্যাসকে মৃত্যু টানা ঘিরে আছে। এসব বিষয় উপন্যাসের বিষয়কে কাহিনির বৈচিত্র্যে ভরিয়ে তোলে। যা প্রশংসনীয়। তবুও মানুষের জীবনে মৃত্যু যে একটা মোক্ষম দিক আর তার সাথে যে শরীরের রোগ ও জরা প্রক্রিয়াদুটো জড়িয়ে আছে সেটাকে লেখক নিজের কল্পনার পরিধির মধ্যে আনতে পারতেন। শেষ পর্যন্ত পড়তে গিয়ে মনে হয়েছে মানুষের মনে প্রতিক্রিয়ার জন্ম যার থেকে হিংসার উদয়। এই হিংসা তারপর কীভাবে স্বৈরাচারের হাত ধরে যুদ্ধ এবং সভ্যতা ধ্বংসের দিকে এগিয়ে নিয়ে গেছে তার প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছেন লেখক প্রথম থেকে। ঈশ্বরের উপস্থিতি যেখানে সক্রিয় সেখানে ক্ষয় হিংসা অনীশ্বরীয় উপস্থিতিও সক্রিয়। এই উপন্যাসের লিখনপদ্ধতিতে এটা স্পষ্ট। গল্পে সংলাপ নেই বললেই চলে। লেখকের ন্যারেশনে এই উপন্যাস শুরু থেকে শেষ পাঠককে ক্রমাগত রোমাঞ্চের মধ্যে নিয়ে গিয়ে স্লথ করে দেয়। যুদ্ধক্লান্ত মানুষের শরীরের মতো গদ্য হয়ে ওঠে ক্লান্ত। ন্যারেটর ধীরে ধীরে বলছেন, প্যারাগ্রাফ দীর্ঘ হচ্ছে। বিষয়টা কোথায় পৌঁছাবে আমরা কেউ অনুমান করতে পারি না। এও একটি লেখার পদ্ধতি।
ষষ্ঠ অধ্যায়ের শেষে ফিউদাউসের লেখা একটু উদ্ধৃত করছি: “মানুষ তেমনি একা একা শুধু নিজের নিজের শুধু আলাদা আলাদা কতকগুলো চলমান মাংসের দলা নয়, সব মানুষ মিলেই তবে মানুষ।” আমরা অস্তিত্বময় একমাত্র সামনের মানুষটার জন্য। ক্রমাগত প্রতিফলিত হওয়ার প্রক্রিয়ায় আমরা মানুষ। আমি তুমি এই বোধ একত্রিত হলে নিজেদের মানুষ মনে হয়। অস্তিত্বের সাথে অস্তিত্বের যোগাযোগে আমরা মানুষ হচ্ছি। অর্থাৎ মানুষ হওয়ার প্রক্রিয়াতে আমি-তুমির এই প্রয়োজন খুঁটিনাটি ভাবলে আমরা বুঝতে পারি আমরা মানুষ। “আমি মানুষ” এই বোধ শুধুমাত্র আসে অপর একজন মানুষের বিশ্বাসে। যা কখনোই একা ঘটতে পারে না। এর সাথে “মায়েরা কাঁদছে। শিশুরা কাঁদছে। কাঁদতে কাঁদতে তারা তাদের অশ্রুবিন্দু হাতের তালুতে নিয়ে মৃত্যুর দিকে ছুঁড়ে মারছে। মৃত্যুর বিষাক্ত শরীর সেই পবিত্র অশ্রুবিন্দুর স্পর্শে বার বার ঝলসে যাচ্ছে। আর তখন মৃত্যু যন্ত্রণায় বার বার আর্তনাদ করে উঠছে। তার যন্ত্রণাকাতর আর্তনাদ শুনতে শুনতে মা আবার গর্জে উঠলেন— মৃত্যুকে হত্যা করো!” এভাবেই একত্র মনোবলে আরও বেশি মানুষকে মানুষ হওয়ার বোধ করিয়েছে। আর “মৃত্যুকে হত্যা করো!” এও তো প্রতিহিংসারই অংশ। মৃত্যুর বিরুদ্ধে আত্মবিশ্বাস না প্রতিহিংসা? বিষয়টা ভাবায়।
যদি এই উপন্যাসকে ডিসটোপিয়ার একটি চূড়ান্ত উদাহরণ হিসেবে ভেবে নিই তবে ভুল কিছু হবে না তবুও আমি কোনো কোনো সময় ভাবি স্বৈরাচারী শাসন যে কী করতে পারে মানুষের সভ্যতাকে, সেটাও তো লেখক এই মূল কাহিনির আড়ালে বলতে চেয়েছেন এও হতে পারে। আবার হতে পারে এই কাহিনি ফাঁদার উদ্দেশ্যই হল কীভাবে মানুষ মৃত্যুকে স্বীকার করতে শিখছে এর অভিযাত্রাও হতে পারে। হতে পারে সেটায় পৌঁছাতে গিয়ে লেখক মানুষের সঙ্গে মানুষের লড়াই দেখাতে চেয়েছেন সারভাইভাল অফ দি ফিটেস্ট দেখানোর জন্য। যেদিকেই উপন্যাসের কাহিনি ইঙ্গিত করুক-না-কেন এই লেখার বিষয় অবশ্যই মৃত্যু এবং কীভাবে মানুষের মানসিক বিবর্তন হচ্ছে তা দেখানো এবং এর সাথে মানুষের মৃত্যুর সাথে বসবাস করার সহ্যক্ষমতার বিবর্তন ও শিক্ষা এও কিন্তু লেখকের লক্ষ্য হতে পারে।
বিগত একটা মাস টানা কেটেছে এই উপন্যাসের সঙ্গে। আটত্রিশটা অধ্যায়ের উপন্যাস। এই উপন্যাস কোনো অংশেই আখ্যান নয়। উপন্যাসের মধ্যে দুটো সময়— মৃত্যুর জন্মের আগে ও পরে। আর-একটা সময় যখন মৃত্যুর মৃত্যু ঘটছে (?)— যখন মানুষ নিজের মধ্যে আত্মবিশ্বাস সঞ্চয় করে মৃত্যুর মুখোমুখি হচ্ছে। মায়ের নেতৃত্বে মৃত্যুর মুখোমুখি হচ্ছে সবাই। শেষের সময়টা মায়েদের। তাদের নেতৃত্বে মৃত্যুর মুখোমুখি হচ্ছে সমাজ। মাতৃতান্ত্রিকতাই যে সভ্যতার শেষ সম্বল। মৃত্যুর পৌরুষকে এভাবেই প্রতিহত করা যায়। সাহসের অশ্রু ব্যথার অশ্রু মৃত্যুকে মুছে দিতে সক্ষম! আর বিপরীতে মৃত্যু দেবীর অশ্রু হিংসা ও মৃত্যু ছড়াতে সক্ষম। এই উপন্যাস একটি অবসানের গল্প বলে। হিংসায় যুদ্ধতে মৃত্যুতে জর্জর একটি সভ্যতা কীভাবে নিজের পুনর্জীবন ঘটাতে সক্ষম তা এই উপন্যাস থেকে আমরা শিখি। আমরা শিখি যুদ্ধের ক্লান্তি, মানুষের শক্তির সীমাবদ্ধতা বুঝিয়ে দেয় কেন যুদ্ধ আর না। কেন মৃত্যু কিছু না। কেন জীবন বড়ো। কেন যুদ্ধের মধ্যে সন্তান জন্মের আঁচ। এসবই ইঙ্গিত এভাবে মৃত্যু না। আর যাবতীয় কিছু যা উপন্যাসে ঘটেনি সেটাই লেখক ঘটাতে চেয়েছেন পাঠকদের মনে। তাই মৃত্যুর জন্ম যেমন হচ্ছে তেমনই তার মৃত্যুও ঘটছে (?)।