একটি হাওয়ায় উড়ে যাওয়া ‘জীবন, পালকজন্ম’
"The poetry of a people takes its life from the people’s speech and in turn gives life to it; and represents its highest point of consciousness, its greatest power and its most delicate sensibility."
সালটা ১৯৩৩। একটি বই বেরোল, যার নাম ‘The Use of Poetry and the Use of Criticism’ এবং যাঁর বক্তব্য ধারণ করেছিল এই বই, তিনি বিশ্ববিশ্রুত কবি (যদিও ‘কবি’ তাঁর মূল পরিচয় হলেও, তিনি একাধারে ছিলেন সফল নাট্যকার, সমালোচক, সম্পাদক, প্রকাশক ও আরও অনেক কিছু) থমাস স্টার্নস্ এলিয়ট। যাঁকে আমরা সংক্ষেপে টি এস এলিয়ট বলেই চিনি, জানি ও পড়ি। ‘বক্তব্য’ কথাটা এই কারণেই বলা, প্রকাশিত এই বইতে যেগুলিকে ‘লেখা’ হিসেবে আমরা দেখছি ও পড়ছি, সেগুলি আসলে ১৯৩২ থেকে ১৯৩৩-এর মধ্যেকার সময়ে হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটিতে দেওয়া আটটি ‘লেকচার’, যার ‘কালেকশন’ হল এই বই। উপরোক্ত ইংরেজি লাইনটি বইয়ের প্রথম অংশ ‘Introduction’ থেকে নেওয়া, যা প্রথম তিনি লেকচার হিসেবে ‘ডেলিভার’ করেন ১৯৩২ সালের ৪ঠা নভেম্বর।
ওই ইংরেজি অংশটির একটি চলনসই বাংলা অনুবাদ করলে এরকম হয়: ‘একজন মানুষের কবিতা ওই মানুষের বলা কথা থেকেই তার জৈবনিক সত্ত্বা গ্রহণ করে, আর বদলে ফিরিয়ে দেওয়ার নামে, ওই কথাগুলোকেই জীবন্ত করে চেতনার সর্বোচ্চ শীর্ষবিন্দু, সর্বোত্তম শক্তি এবং সবচেয়ে সূক্ষ্ম সংবেদনশীলতার প্রতিনিধিত্বের দ্বারা।’
হয়তো কথাগুলো একটু বেশিই খটমট লাগল, আর তা লাগার এক এবং অদ্বিতীয় কারণ হল এই নিম্নমানের অনুবাদ। তবে যে বিষয়টি পাঠকদের দেখতে অনুরোধ করব, তা হল ‘life’ শব্দটির ব্যবহার। কথাটি দুবার ব্যবহার করা হয়েছে। প্রথমবার বলা হচ্ছে কবিতা কীভাবে তার প্রাণ মানুষের কথা থেকে খুঁজে পায়, আর তারপরে বলা হচ্ছে সেই কবিতাই কীভাবে মানুষের ওইসব কথাকে জীবন্ত করে তুলছে বা কাজটি করতে সক্ষম হচ্ছে। এ এক আশ্চর্য কৌশল, এ এক আশ্চর্য নির্মাণ, যা কবি জানেন, কবি পারেন; হয়তো একে আয়ত্তে আনতে হয়, অথবা এ এমনিই এক ক্ষমতা, যা কবিসত্ত্বার সাথেই জাত বা হয়তো কবিকেই জন্ম দেয় ও একজন ব্যক্তিকে ‘কবি’ করে তোলে ও তাকে আজীবন এক বোধ প্রদান করে ‘গাইড’ করে যায়।
আজ যে-লেখাগুলি নিয়ে আলোচনা করার জন্য ক্ষেত্র প্রস্তুত করতে গিয়ে আগের এই এত কথা ব্যবহার করা হল, সেগুলিও কবিতা, যা ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে আনন্দ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড-এর ‘সিগনেট প্রেস’ থেকে প্রকাশিত ‘জীবন, পালকজন্ম’-র অন্তর্গত।
শুরুর অংশটিতে যে ‘মানুষ’, ‘মানুষের কবিতা’, ‘মানুষের কথা’ ইত্যাদি ব্যাপারগুলো পেলাম, যা ১৯৩৩-এর বলা কথা, তা এতগুলো দশক পেরিয়েও কীভাবে বিশুদ্ধতা ও বাস্তবতা নিয়ে এই কাব্যগ্রন্থে উপস্থিত রয়েছে, তা-ই বোঝানো উদ্দেশ্য ছিল।
প্রারম্ভিক কথাতেই পাঠকদের মূল্যবান অনেকটা সময় নষ্ট করে ফেলা হল যেহেতু, আর কথায় না সময় নষ্ট করে কবিতাগুলির সম্ভাব্য ভাবের মধ্যেই নিজেদের মনোনিবেশ করা উচিত এবার। মানে যাকে বলা যায়, ‘beat around the bush’ না ‘ফলো’ করে ‘hit the bull's eye’ পদ্ধতিটি ‘ফলো’ করা।
উদ্দিষ্ট কাব্যগ্রন্থে ৪০টি কবিতা রয়েছে, যার প্রথম কবিতার নাম ‘অপেক্ষা’।
শুরুর এই কবিতাটির মধ্যে উল্লেখযোগ্যভাবে শব্দবাহুল্যের বজর্ন আছে, যাকে ইংরেজিতে ‘precision’ বলে। মাত্র ১৪ শব্দ দিয়ে মুক্তছন্দ বা free verse-এ লেখা কবিতাটি স্পষ্ট করে নিজের কথা যে বলছে না তেমনটা নয়, আবার পাঠকদের একইসাথে ভাববার অবকাশও করে দিচ্ছে। কবিতাটি —
‘কবিতা, হয়তো দুঃখ
যে
একটি
নির্জন স্টেশনে
বসে আছে
যার কোথাও
যাওয়ার কথা নেই’
কবিতাটির প্যাটার্নটি বেশ লক্ষ্যণীয়। কোথাও তিনটি, কোথাও দুটি আবার কোথাও একটি মাত্র শব্দ দিয়ে কবি লিখছেন কবিতাটি, যা কিন্তু সম্পূর্ণ লাইনের মর্যাদাই পাচ্ছে। এখন কথা হচ্ছে এই ‘অপেক্ষা’ কীসের? যে-কারণে কবিতার এমন নামকরণ এবং কোন কারণে কবিতাটির প্রসঙ্গ ‘কবিতা’ নিয়েই? এখানে কবি কবিতা বিষয়টিকে personify করছেন, ব্যক্তিসত্তা আরোপ করছেন। যদি আমরা নিজেরা ভাবি, তাহলে বুঝতে পারব, কবিতা কেবলমাত্র কিছু শব্দ, মাত্রা, ছন্দ, ছন্দহীনতা ইত্যাদির বিষয় একেবারেই নয়, বরং তার বাইরে একটি প্রাণের স্পন্দনের অনুভব। মানুষ যেভাবে কবিতা লেখে, কবিতাও তেমনভাবে আমাদের কথা বলে আমাদের। সে আর জড় কিছু হয়ে থাকে না, বরং সংবেদনশীল এক প্রাণের ধারক হয়ে ওঠে। এই কবিতার জন্য মানুষ অপেক্ষা করে যায় — একটি সঠিক লাইন, শব্দের জন্য, যার মধ্য দিয়ে একজন সঠিকভাবে এবং সম্পূর্ণভাবে নিজেকে প্রকাশ করতে পারে। এই প্রকাশ শুধু শব্দের জন্য নয়, বরং নিজের মুক্তির জন্য, নিজেকে রেখে যাওয়ার জন্য। অথচ আমরা এখানে দেখছি কবিতা নিজেই অপেক্ষা করছে ‘নির্জন স্টেশনে’, কেন? তবে কি সে-ও সঙ্গ পেতে চায়? প্রকাশিত হতে চায়? আর কবিতাকে প্রথম লাইনে ‘দুঃখ’ বলে বলার মধ্য দিয়ে অন্য এক সত্যের উদ্ঘাটন সম্ভব হয়ে উঠছে। কবিতা আসলে এক এমন শিল্প, যেখানে একজন তাঁর আনন্দের মুহূর্ত, অনুভূতিতে ভাগ করেন না, বরং নিজের যন্ত্রণা, নিজের দুঃখ, হতাশা, কান্নাকেই ফুটিয়ে তোলেন (আনন্দ অনুভূতি যে ফুটিয়ে তোলা হয় না একেবারেই তেমনটা নয় অবশ্যই); একটি আশ্রয় খুঁজে পেতে চান। আবার এই দুঃখকে যে কোথাও যেতেই হবে কারওর কাছে তেমনও তো নয়। ফলে এই যে ‘হতে পারা’ আর ‘না-হতে-পারা’-র মাঝে এক আশ্চর্য শূন্যতা কিন্তু সেতুর মতো করে দাঁড়িয়ে থাকে কবিতা, তা আমরা একটু ভাবলেই খুঁজে পাব নির্দিষ্ট এই কবিতাটি থেকে।
আর এই যে সেতুর কথা বলা হল, সংযোগের ধারণা তৈরি হল, তৈরি হল ছুঁয়ে থাকার দরকারি চিন্তাটির উদ্রেক, তা যেন কবি এই কাব্যগ্রন্থের অন্য একটি কবিতা, ‘যতি’-তে বলছেন এভাবে — ‘যেকোনও বিচ্ছেদ, জানি, কোথাও মিলন হয়ে আছে —/ জলে ডুবতে ডুবতে কেউ হাত যদি তোমাকে বাড়ায়/ সে হাত বিচ্ছিন্ন হয়ে কাছে-দূরে, ভেসে চলে যায়’
আসলে কিছুই যে বিচ্ছেদ নয় বৃহৎ জীবনের, আর জীবন বলতে যে শুধুই নির্দিষ্ট আয়ুর বিনিময়ে বেঁচে থাকাই নয়, যা বিচ্ছেদ, তা-ও যে আসলে মিলন, জীবনের সাথে মিলন, সময়ের সাথে মিলন তার কী আবেশপূর্ণ আভাস পেলাম লাইন ক'টি থেকে।
সময় আমাদের ঘোরায়, আমাদের এগিয়ে নিয়ে যায়। হয়তো গন্তব্য পায় কেউ, হয়তো কেউ পায় না। আবার হয়তো গন্তব্য নামের বিষয়টি আসলে মিথ্যে। আমাদের চলে যেতে হয় তাই চলে যাই। যেখান থেকে আমরা সামনের দিকে তাকিয়ে কিছু না দেখতে পারলেও, পেছনের দিকে তাকিয়ে দেখতে পারি কতটুকু ফেলে এসেছি, এগিয়ে এসেছি। কিন্তু সে-পথে ফেরার উপায় থাকে না। হয়তো একই পথ, কিন্তু পেছন ফিরে যাওয়া যায় না। এরই নাম জীবন। এরই নাম বেঁচে থাকা। এই বোধ হয়তো কবিকে তাড়িয়ে বেড়ায় — এই বোধ হয়তো কবিকে দিয়ে লিখিয়ে নেয় ‘বিন্দু’ নামের কবিতায় ‘বুঝি না তাও, মনখারাপ করে/ কেউ কোথাও পৌঁছবে না আর/ ফেরার পথও নতুন কোনও পথ/ মুহূর্তের বাসস্থান নেই’ বা ‘বুঝি না, তাও বোঝাতে চায় জল/ ডুব দিয়েছ অনিশ্চয়তায়/ যে কোনও দিক মন্ত্র হতে পারে—/ কোনও পথের ফেরার পথ নেই’-এর মতো চিন্তাপ্রবণ লাইন। লক্ষ্যণীয়, ‘পথের ফেরার পথ নেই’ লেখার মধ্য দিয়ে কবি আবার ‘পথ’-কে personification-এ নিয়ে আসলেন।
পথ বা রাস্তা, যা-ই বলা হোক না কেন, তা কখনও সুগম হয় না। আমাদের এই যাওয়া, যেতে চাওয়ার মধ্যে একটা কোথাও যেন দায় থাকে, থাকে একটা ছুটিয়ে মারার তাগিদ, প্রবণতা। হয় আমরা কিছুর অনুসরণ করে যাই সারাটা জীবন, নতুবা আমাদের অনুসরণ করে চলে কেউ বা কিছু। আসলে এ যেন এক প্রায় অন্ধকার জঙ্গলে শিকার আর শিকারির উত্তেজনাপূর্ণ অন্তহীন টানাপোড়েনের খেলা, আর এই খেলা থেকে যায় যখন এই দুজনের কেউ একজন ‘এলিমিনেট’ হয়ে যায়; সেটা শিকার হতে পারে, অথবা শিকারি নিজেই। এই বাস্তব দর্শন ভরিয়ে রেখেছে ‘রাস্তা বদলাও’ কবিতার শেষ তিন লাইনে — ‘পিছুডাক মানে কিছু অহঙ্কারী বাঘ/ তোমাকে অনুসরণ করতে করতে শান্ত হয়ে গেছে।/ শিকারের মৃত্যু হলে, শিকারিরও খিদে মরে যায়।’
এইসব লাইন আমাদেরও যেন শান্ত করে, থামায় আর প্রণোদিত করে একবার পাঠের পর পুনরায় পাঠে।
এই যে শেষ লাইনটিতে ‘খিদে’ শব্দটি পেলাম আমরা, এই পৃথিবীতে এর চেয়ে বড় সত্য, বড় সংগ্রাম আর কিছু আছে কি? ‘খিদে’ প্রতিটি মুহূর্তে আমাদের বেঁচে থাকা নিশ্চিত করে। এই খিদে কখনও খাদ্যের জন্য, কখনও আরও আরও বিভিন্ন কারণের জন্য। মূলত খাদ্য, যার জন্য জীবনসংগ্রাম চলে প্রতিদিন। একেকজনের সংগ্রাম একেকজনের কাছে একেকরকম। যাঁরা সমাজের প্রান্তিক শ্রেণী, তাঁদের সংগ্রাম, সামান্য দু'মুঠো খাবারের জন্য সবচেয়ে বেশি। আর তাঁদের সেই সংগ্রাম বাইরে থেকে আমরা বুঝে নিতে পারি না। কিন্তু কবি তো পারেন, অনুভূতি দিয়ে, শব্দ দিয়ে এই সংগ্রাম, সেই হাহাকার, যন্ত্রণাকে ভাষা দিতে। এই বইয়ের ‘শ্রী’ নামের কবিতার কেন্দ্রীয় চরিত্র হলেন নামহীন এক কানাডোম। এই ‘কানাডোম’ কথাটি বেশ তাৎপর্যপূর্ণ মনে হল। কেননা, একদিকে যেমন শরীরের অন্যতম মূল্যবান অংশ চোখ নেই, মানে থেকেও নেই, অন্ধ বা কানা, আবার অন্যদিকে পেশায় তিনি কী? একজন ডোম; যাঁর কাজ মৃতদেহ পোড়ানো। আর কী পরিহাস জীবনের, অন্যের মৃতদেহ পুড়িয়ে করা উপার্জন দিয়ে জীবন চলে তাঁদের। ভাত ফোটে। এখানেও তা-ই হচ্ছে। কিন্তু তারও আগে একটি বিষয় খোলসা করে দেওয়া যাক বরং? এই ‘কানাডোম’ আসলে অন্য কেউ নয়, স্বয়ং কবিই। আর এত মৃতদেহের মাঝে তিনি কাউকে চান, কাউকে ভালবাসেন, কেউ আছেন; যাঁর জন্য এই মৃত্যু ঘেঁটে, ‘ছাইপাঁশ ঘেঁটে’ বাড়ি নামের স্থানে ফেরেন, যেখানে ফিরে এসে প্রকাশ্যে বলেন বা স্বগতোক্তি করে বলেন ‘তোমার জীবন্ত মুখ ভালোবাসি।’ বা ‘আমি কানাডোম শুধু/ লাশ পোড়াই,/ লাশের আগুনে/ আমাদের ভাত গরম হয়।’-এর মতো কী ভীষণ সত্য কিন্তু ‘ডিস্টার্বিং’ লাইন কিছু। আরেকটি খুবই চমকপ্রদ বিষয় হল এমন বার্তা, এমন বাস্তবতার কথা বলা একটি কবিতার নাম ‘শ্রী’ দেওয়া। ‘শ্রী’ শব্দের অর্থ সমৃদ্ধি, সৌন্দর্য ইত্যাদি; আর এখানে দেখছি একজনকে, যিনি বলছেন ‘ছাইঘেঁটে নিয়ে আসি অসমাপ্ত পাপ’, যিনি বলছেন ‘আমি কানাডোম শুধু/ লাশ পোড়াই,/ লাশের আগুনে/ আমাদের ভাত গরম হয়।’
আর এর থেকেই আমরা বুঝতে পারি, এই কথায় কতটা শ্লেষ, কতটা চাবুক রয়েছে।
এই কাব্যগ্রন্থে যেমন নিজের চেতনা দিয়ে চিনে নেওয়া আছে পারিপার্শ্বিককে, তেমনই আছে নিজের মধ্যে থাকা আরেক নিজের প্রতি কিছু কথা, কিছু আলাপ, বোধ, দর্শন। এই বোধ, এই দর্শন আসে তাঁর consciousness থেকে। যে consciousness একজনকে বুঝতে শেখায় ‘পাথরেরও মৃত্যু হয়, ক্ষয়ে যাওয়া সভ্যতা যেমন/ আয়ু ধুলো হয়, ধুলো, মাটি।’ অথবা ‘ধুলো থেকে জন্ম নেয় আয়ু।/ আয়ু থেকে ধুলো।’ (কবিতার নাম - স্থাপত্য)।
এই যে আয়ুর ধুলো হয়ে যাওয়া বা বিপরীতটি, মানে ধুলোর আয়ু হয়ে ওঠা, সে শুধু সময়ের অধীনে, যাকে ইংরেজিতে বলা যেতে পারে এভাবে – matter of time; এই যে সময়, তার মধ্য দিয়ে যেভাবে ঘটনাকে ধরে রাখা হয়, তেমনই ঘটনাও কিন্তু সময়ের ভাবনাকে জীবন্ত করে রাখে। আর এই সময় যেমন আবহমান কাল-কে ধরে, তেমনই প্রতিনিধিত্ব করে সমকালেরও। এই কাব্যগ্রন্থে কিন্তু তারও উল্লেখ রয়েছে। প্রসঙ্গত বলে রাখা ভাল, এই কাব্যগ্রন্থটি ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে প্রথম প্রকাশিত হলেও, এর মধ্যে থাকা কবিতাগুলি ২০২২ থেকে ২০২৫ সাল সময়ের মধ্যে রচিত। এই স্বল্প কালখণ্ডে অনেক অনেক ঘটনা ঘটে গিয়েছে, আর সেসব ঘটে যাওয়া ঘটনার মধ্যে সবচেয়ে fatal বা প্রাণঘাতী কিছু থেকে থাকে, তা হল করোনা ভাইরাসের হঠাৎ প্রাদুর্ভাব ও তৈরি হওয়া মৃত্যুমিছিল। এতে কেবল আপনজন ও অন্যান্যদের মৃত্যু দেখা, বিবিধ হাহাকার শোনা ছাড়া আর কিছুই ছিল না! সাথে ছিল নিজেকে একপ্রকার বাঁচাতে ও অন্যদেরও বাঁচাতে নেওয়া পন্থা, এক পরিশুদ্ধি যেন, যার ইংরেজি নাম ছিল Quarantine বা Self-quarantine বা বাংলায় বললে এরকম হয়: সঙ্গরোধ বা রোগ-অন্তরণ। আর এইসব প্রসঙ্গ, আবহ এসেছে ‘শ্লোক’ কবিতায় এভাবে – ‘বন্ধুর মৃত্যুর কাছে হাঁটুমুড়ে বসি।/ ভয়, ভাইরাসের মতো বোবা করে দেয়/ কারো মৃত্যু হলে, বুঝি, নিজেরই মৃত্যুর কথা’
এই যে ‘ভয়’ আর ‘ভাইরাস’ শব্দদুটির ব্যবহার ও পাশাপাশি অবস্থান, তা আসলে কবি হিসেবে হিন্দোল ভট্টাচার্যের শব্দের সূক্ষ্ম প্রয়োগের নিপুণতাকে বুঝিয়ে দিচ্ছে এবং পাঠকদের মনে করিয়ে হচ্ছে একবিংশ শতকের একটি গুরুত্বপূর্ণ ও বিষাদময় অধ্যায়কে।
অনেক কথাই হয়ে গেল, কথায় কথায় আরও অনেক কথা হয়ে যাবে। এখন কথা এটাই যে, সব কথা যদি এই তালমাত্রাজ্ঞানহীন প্রবন্ধলেখকই বলে দেয়, তবে পাঠকদের জন্য থাকে কী! তেমন করাটা তো একপ্রকার অন্যায়, তাই না? তাই আর অন্যায় বাড়াতে চাইছি না, এবার এই কাব্যগ্রন্থের নামধারী কবিতাটি নিয়ে খানিক আলোচনা করেই এই লেখার ইতি টানা যাক, কেমন?
‘জীবন, পালকজন্ম’ কবিতাটি আসলে জীবনের হালকা অথবা ঝোড়ো হাওয়ায় উড়ে যাওয়া পালকের কবিতা, নিজেকে আবিষ্কারের কবিতা, অন্যকে খুঁজে পেতে চাওয়ার কবিতা, ভেসে থাকার কবিতা, ভেসে যাওয়ার কবিতা, ঠিকানা হারানোর কবিতা, আশ্রয় পাওয়ার কবিতা, এক শূন্যতা, এক মনখারাপ, ‘কী যেন নেই’ এমন একটা ভাবের কবিতা এবং সর্বোপরি ভালবাসার কবিতা। কবিতাটির কিছু লাইন –
‘তোমাকে চিনেছি, ভাবি, তারই পর ভেঙে যায় সমস্ত দেওয়াল/ কাকে তবে চিনি, ঘড়ি উল্টোদিকে ঘোরে, ভাঙে কাচ/ শূন্য থেকে লাফ দিয়ে এসেছি যেন বা শূন্যে, পা রাখব কোথায়?’ বা ‘তোমাকে দুঃখের মতো ভালোবাসি, যেকোনও সময়’ অথবা ‘আকাশ ভাঙার দিন চলে এল, চারিদিকে প্রসবের ব্যথা/ একটি কবিতা আজ শিশুর লাশের মতো পরিত্যক্ত, একা/ সে আমায় খুঁজেছিল, মনে পড়ে, মনখারাপ দেশের মানুষ।’
অতএব, এই সিদ্ধান্তে যে আসাই যায় যে, এগুলি কেবলই ‘কবিতা’ নামের কিছু অলীক কল্পনা নয়, বরং জীবনের মধ্য দিয়ে নিজেকে অথবা নিজের স্বরূপে অন্যকে খোঁজা, জীবন নিংড়ে লেখা পঙ্ক্তিসকল। যেখানে শব্দের মধ্য দিয়ে কবি চান যাকে, সেও প্রতীক্ষারত থাকে কবিকে পাওয়ার আশায়। এ এক আশ্চর্য মিলন, এ এক মহামিলনের বার্তার চেয়ে কিছু কম নয়। যেখানের মূল শব্দ হল, ডাক হল এরকম – ‘গভীর ঘুমের মধ্যে, কোথাও হয়তো তুমি আছ’ বা ‘তবে কি নিজেরই ঘুমে ডাক দেব, এসো পরিত্রাণ?’ বা ‘হয়তো কোথাও তুমি আছ, তাই ডাকিনি তোমায় - / আমার আরুণিজন্ম এ শহরে উপবাস চায়।’ অথবা ‘হয়তো গভীর ঘুমে আছ তুমি, চেয়েছ আমায়।’, যা লিখিত রয়েছে এই কবিতাগ্রন্থের শেষ কবিতা ‘যে কথা ব্যক্তিগত’-তে…