Saturday, April 25, 2026

গুচ্ছ কবিতা : নিসর্গ নির্যাস মাহাতো

 


প্রেম, প্রতিবাদ ও প্রাতিষ্ঠানিক


বন্ধু বা প্রাতিষ্ঠানিক


অফিসের সিঁড়ি বেয়ে

খানিক জিরোই, প্রিয় গাছের পাশে


মুখোমুখি আমি আর সে

দু'জনেই বুদ্ধির গোড়ায় ধোঁয়া ঢালি


হতে পারত সহকর্মী

ছবি হয়ে তাকিয়ে থাকে

চিবুকে হাত দিয়ে ধোঁয়ার ভিতর প্রশ্ন ওড়ায়-

"যেতে পারি কিন্তু কেন যাব?"


আ শক্তি, হা শক্তি

এসো এক গেলাসে বসি





বিধুর


বসন্তের কিছু অপেক্ষা জানে

ফেরানো চোখের নাম


 শেষ বাসের বিশ্রী শব্দও

        কৃষ্ণের মুরালি ধুন,


বিরহী মধুর





শিরোনামহীন


শেষ বসন্তের 

    পড়ে থাকা ফুল জানে

ধুলোপথে অপেক্ষা

           আঁকা থাকে

কিছু বিদায় মানে

সঙ্কোচ, ফেরানো মুখ 

কৃষ্ণের বাঁশি ভিজে গেছে

নীরব অশ্রু-ঘামে





ভয়


গভীর জঙ্গলে শুনেছি শেয়ালের সমবেত স্বর

নদীর ধারে সাপের ফোঁস

গ্রামাঞ্চলে বৃহতি 

বা

চিড়িয়াখানায় বাঘের গর্জন


সেই সব ভয়ঙ্কর 

বড় স্বাভাবিক, সুন্দর...


শুধু ভয় করে মানুষের উল্লাসে


নিশ্চিত কারও আর্তনাদ আছে 

ক্রূর চোখের ওপারে...





বিখ্যাত হব বলে


না পড়া কবিতা লিখে চলি রোজ

নামজাদা দুয়ারে তার চেয়ে ঢুঁ মারি বেশি

আনাজ বয়ে দিই কবিতার নামে

মাথা খুলে সঁপে দিই এর-তার পদতলে


তেল মাখা শরীরে ঘরে ফিরে

আয়নার মুখোমুখি হই

দেখি কবি হতে গিয়ে

উদোম ল্যাংটো হয়েছি আমি

Tuesday, April 21, 2026

প্রবন্ধ : রাধাবল্লভ চক্রবর্ত্তী

 


একটি হাওয়ায় উড়ে যাওয়া ‘জীবন, পালকজন্ম’


"The poetry of a people takes its life from the people’s speech and in turn gives life to it; and represents its highest point of consciousness, its greatest power and its most delicate sensibility."

সালটা ১৯৩৩। একটি বই বেরোল, যার নাম ‘The Use of Poetry and the Use of Criticism’ এবং যাঁর বক্তব্য ধারণ করেছিল এই বই, তিনি বিশ্ববিশ্রুত কবি (যদিও ‘কবি’ তাঁর মূল পরিচয় হলেও, তিনি একাধারে ছিলেন সফল নাট্যকার, সমালোচক, সম্পাদক, প্রকাশক ও আরও অনেক কিছু) থমাস স্টার্নস্ এলিয়ট। যাঁকে আমরা সংক্ষেপে টি এস এলিয়ট বলেই চিনি, জানি ও পড়ি। ‘বক্তব্য’ কথাটা এই কারণেই বলা, প্রকাশিত এই বইতে যেগুলিকে ‘লেখা’ হিসেবে আমরা দেখছি ও পড়ছি, সেগুলি আসলে ১৯৩২ থেকে ১৯৩৩-এর মধ্যেকার সময়ে হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটিতে দেওয়া আটটি ‘লেকচার’, যার ‘কালেকশন’ হল এই বই। উপরোক্ত ইংরেজি লাইনটি বইয়ের প্রথম অংশ ‘Introduction’ থেকে নেওয়া, যা প্রথম তিনি লেকচার হিসেবে ‘ডেলিভার’ করেন ১৯৩২ সালের ৪ঠা নভেম্বর।

ওই ইংরেজি অংশটির একটি চলনসই বাংলা অনুবাদ করলে এরকম হয়: ‘একজন মানুষের কবিতা ওই মানুষের বলা কথা থেকেই তার জৈবনিক সত্ত্বা গ্রহণ করে, আর বদলে ফিরিয়ে দেওয়ার নামে, ওই কথাগুলোকেই জীবন্ত করে চেতনার সর্বোচ্চ শীর্ষবিন্দু, সর্বোত্তম শক্তি এবং সবচেয়ে সূক্ষ্ম সংবেদনশীলতার প্রতিনিধিত্বের দ্বারা।’ 

হয়তো কথাগুলো একটু বেশিই খটমট লাগল, আর তা লাগার এক এবং অদ্বিতীয় কারণ হল এই নিম্নমানের অনুবাদ। তবে যে বিষয়টি পাঠকদের দেখতে অনুরোধ করব, তা হল ‘life’ শব্দটির ব্যবহার। কথাটি দুবার ব্যবহার করা হয়েছে। প্রথমবার বলা হচ্ছে কবিতা কীভাবে তার প্রাণ মানুষের কথা থেকে খুঁজে পায়, আর তারপরে বলা হচ্ছে সেই কবিতাই কীভাবে মানুষের ওইসব কথাকে জীবন্ত করে তুলছে বা কাজটি করতে সক্ষম হচ্ছে। এ এক আশ্চর্য কৌশল, এ এক আশ্চর্য নির্মাণ, যা কবি জানেন, কবি পারেন; হয়তো একে আয়ত্তে আনতে হয়, অথবা এ এমনিই এক ক্ষমতা, যা কবিসত্ত্বার সাথেই জাত বা হয়তো কবিকেই জন্ম দেয় ও একজন ব্যক্তিকে ‘কবি’ করে তোলে ও তাকে আজীবন এক বোধ প্রদান করে ‘গাইড’ করে যায়।

আজ যে-লেখাগুলি নিয়ে আলোচনা করার জন্য ক্ষেত্র প্রস্তুত করতে গিয়ে আগের এই এত কথা ব্যবহার করা হল, সেগুলিও কবিতা, যা ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে আনন্দ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড-এর ‘সিগনেট প্রেস’ থেকে প্রকাশিত ‘জীবন, পালকজন্ম’-র অন্তর্গত।

শুরুর অংশটিতে যে ‘মানুষ’, ‘মানুষের কবিতা’, ‘মানুষের কথা’ ইত্যাদি ব্যাপারগুলো পেলাম, যা ১৯৩৩-এর বলা কথা, তা এতগুলো দশক পেরিয়েও কীভাবে বিশুদ্ধতা ও বাস্তবতা নিয়ে এই কাব্যগ্রন্থে উপস্থিত রয়েছে, তা-ই বোঝানো উদ্দেশ্য ছিল। 

প্রারম্ভিক কথাতেই পাঠকদের মূল্যবান অনেকটা সময় নষ্ট করে ফেলা হল যেহেতু, আর কথায় না সময় নষ্ট করে কবিতাগুলির সম্ভাব্য ভাবের মধ্যেই নিজেদের মনোনিবেশ করা উচিত এবার। মানে যাকে বলা যায়, ‘beat around the bush’ না ‘ফলো’ করে ‘hit the bull's eye’ পদ্ধতিটি ‘ফলো’ করা। 

উদ্দিষ্ট কাব্যগ্রন্থে ৪০টি কবিতা রয়েছে, যার প্রথম কবিতার নাম ‘অপেক্ষা’। 

শুরুর এই কবিতাটির মধ্যে উল্লেখযোগ্যভাবে শব্দবাহুল্যের বজর্ন আছে, যাকে ইংরেজিতে ‘precision’ বলে। মাত্র ১৪ শব্দ দিয়ে মুক্তছন্দ বা free verse-এ লেখা কবিতাটি স্পষ্ট করে নিজের কথা যে বলছে না তেমনটা নয়, আবার পাঠকদের একইসাথে ভাববার অবকাশও করে দিচ্ছে। কবিতাটি — 

‘কবিতা, হয়তো দুঃখ

 যে 

একটি 

নির্জন স্টেশনে

বসে আছে

যার কোথাও 

যাওয়ার কথা নেই’ 

কবিতাটির প্যাটার্নটি বেশ লক্ষ্যণীয়। কোথাও তিনটি, কোথাও দুটি আবার কোথাও একটি মাত্র শব্দ দিয়ে কবি লিখছেন কবিতাটি, যা কিন্তু সম্পূর্ণ লাইনের মর্যাদাই পাচ্ছে। এখন কথা হচ্ছে এই ‘অপেক্ষা’ কীসের? যে-কারণে কবিতার এমন নামকরণ এবং কোন কারণে কবিতাটির প্রসঙ্গ ‘কবিতা’ নিয়েই? এখানে কবি কবিতা বিষয়টিকে personify করছেন, ব্যক্তিসত্তা আরোপ করছেন। যদি আমরা নিজেরা ভাবি, তাহলে বুঝতে পারব, কবিতা কেবলমাত্র কিছু শব্দ, মাত্রা, ছন্দ, ছন্দহীনতা ইত্যাদির বিষয় একেবারেই নয়, বরং তার বাইরে একটি প্রাণের স্পন্দনের অনুভব। মানুষ যেভাবে কবিতা লেখে, কবিতাও তেমনভাবে আমাদের কথা বলে আমাদের। সে আর জড় কিছু হয়ে থাকে না, বরং সংবেদনশীল এক প্রাণের ধারক হয়ে ওঠে। এই কবিতার জন্য মানুষ অপেক্ষা করে যায় — একটি সঠিক লাইন, শব্দের জন্য, যার মধ্য দিয়ে একজন সঠিকভাবে এবং সম্পূর্ণভাবে নিজেকে প্রকাশ করতে পারে। এই প্রকাশ শুধু শব্দের জন্য নয়, বরং নিজের মুক্তির জন্য, নিজেকে রেখে যাওয়ার জন্য। অথচ আমরা এখানে দেখছি কবিতা নিজেই অপেক্ষা করছে ‘নির্জন স্টেশনে’, কেন? তবে কি সে-ও সঙ্গ পেতে চায়? প্রকাশিত হতে চায়? আর কবিতাকে প্রথম লাইনে ‘দুঃখ’ বলে বলার মধ্য দিয়ে অন্য এক সত্যের উদ্ঘাটন সম্ভব হয়ে উঠছে। কবিতা আসলে এক এমন শিল্প, যেখানে একজন তাঁর আনন্দের মুহূর্ত, অনুভূতিতে ভাগ করেন না, বরং নিজের যন্ত্রণা, নিজের দুঃখ, হতাশা, কান্নাকেই ফুটিয়ে তোলেন (আনন্দ অনুভূতি যে ফুটিয়ে তোলা হয় না একেবারেই তেমনটা নয় অবশ্যই); একটি আশ্রয় খুঁজে পেতে চান। আবার এই দুঃখকে যে কোথাও যেতেই হবে কারওর কাছে তেমনও তো নয়। ফলে এই যে ‘হতে পারা’ আর ‘না-হতে-পারা’-র মাঝে এক আশ্চর্য শূন্যতা কিন্তু সেতুর মতো করে দাঁড়িয়ে থাকে কবিতা, তা আমরা একটু ভাবলেই খুঁজে পাব নির্দিষ্ট এই কবিতাটি থেকে। 

আর এই যে সেতুর কথা বলা হল, সংযোগের ধারণা তৈরি হল, তৈরি হল ছুঁয়ে থাকার দরকারি চিন্তাটির উদ্রেক, তা যেন কবি এই কাব্যগ্রন্থের অন্য একটি কবিতা, ‘যতি’-তে বলছেন এভাবে — ‘যেকোনও বিচ্ছেদ, জানি, কোথাও মিলন হয়ে আছে —/ জলে ডুবতে ডুবতে কেউ হাত যদি তোমাকে বাড়ায়/ সে হাত বিচ্ছিন্ন হয়ে কাছে-দূরে, ভেসে চলে যায়’ 

আসলে কিছুই যে বিচ্ছেদ নয় বৃহৎ জীবনের, আর জীবন বলতে যে শুধুই নির্দিষ্ট আয়ুর বিনিময়ে বেঁচে থাকাই নয়, যা বিচ্ছেদ, তা-ও যে আসলে মিলন, জীবনের সাথে মিলন, সময়ের সাথে মিলন তার কী আবেশপূর্ণ আভাস পেলাম লাইন ক'টি থেকে।

সময় আমাদের ঘোরায়, আমাদের এগিয়ে নিয়ে যায়। হয়তো গন্তব্য পায় কেউ, হয়তো কেউ পায় না। আবার হয়তো গন্তব্য নামের বিষয়টি আসলে মিথ্যে। আমাদের চলে যেতে হয় তাই চলে যাই। যেখান থেকে আমরা সামনের দিকে তাকিয়ে কিছু না দেখতে পারলেও, পেছনের দিকে তাকিয়ে দেখতে পারি কতটুকু ফেলে এসেছি, এগিয়ে এসেছি। কিন্তু সে-পথে ফেরার উপায় থাকে না। হয়তো একই পথ, কিন্তু পেছন ফিরে যাওয়া যায় না। এরই নাম জীবন। এরই নাম বেঁচে থাকা। এই বোধ হয়তো কবিকে তাড়িয়ে বেড়ায় — এই বোধ হয়তো কবিকে দিয়ে লিখিয়ে নেয় ‘বিন্দু’ নামের কবিতায় ‘বুঝি না তাও, মনখারাপ করে/ কেউ কোথাও পৌঁছবে না আর/ ফেরার পথও নতুন কোনও পথ/ মুহূর্তের বাসস্থান নেই’ বা ‘বুঝি না, তাও বোঝাতে চায় জল/ ডুব দিয়েছ অনিশ্চয়তায়/ যে কোনও দিক মন্ত্র হতে পারে—/ কোনও পথের ফেরার পথ নেই’-এর মতো চিন্তাপ্রবণ লাইন। লক্ষ্যণীয়, ‘পথের ফেরার পথ নেই’ লেখার মধ্য দিয়ে কবি আবার ‘পথ’-কে personification-এ নিয়ে আসলেন। 

পথ বা রাস্তা, যা-ই বলা হোক না কেন, তা কখনও সুগম হয় না। আমাদের এই যাওয়া, যেতে চাওয়ার মধ্যে একটা কোথাও যেন দায় থাকে, থাকে একটা ছুটিয়ে মারার তাগিদ, প্রবণতা। হয় আমরা কিছুর অনুসরণ করে যাই সারাটা জীবন, নতুবা আমাদের অনুসরণ করে চলে কেউ বা কিছু। আসলে এ যেন এক প্রায় অন্ধকার জঙ্গলে শিকার আর শিকারির উত্তেজনাপূর্ণ অন্তহীন টানাপোড়েনের খেলা, আর এই খেলা থেকে যায় যখন এই দুজনের কেউ একজন ‘এলিমিনেট’ হয়ে যায়; সেটা শিকার হতে পারে, অথবা শিকারি নিজেই। এই বাস্তব দর্শন ভরিয়ে রেখেছে ‘রাস্তা বদলাও’ কবিতার শেষ তিন লাইনে — ‘পিছুডাক মানে কিছু অহঙ্কারী বাঘ/ তোমাকে অনুসরণ করতে করতে শান্ত হয়ে গেছে।/ শিকারের মৃত্যু হলে, শিকারিরও খিদে মরে যায়।’

এইসব লাইন আমাদেরও যেন শান্ত করে, থামায় আর প্রণোদিত করে একবার পাঠের পর পুনরায় পাঠে। 

এই যে শেষ লাইনটিতে ‘খিদে’ শব্দটি পেলাম আমরা, এই পৃথিবীতে এর চেয়ে বড় সত্য, বড় সংগ্রাম আর কিছু আছে কি? ‘খিদে’ প্রতিটি মুহূর্তে আমাদের বেঁচে থাকা নিশ্চিত করে। এই খিদে কখনও খাদ্যের জন্য, কখনও আরও আরও বিভিন্ন কারণের জন্য। মূলত খাদ্য, যার জন্য জীবনসংগ্রাম চলে প্রতিদিন। একেকজনের সংগ্রাম একেকজনের কাছে একেকরকম। যাঁরা সমাজের প্রান্তিক শ্রেণী, তাঁদের সংগ্রাম, সামান্য দু'মুঠো খাবারের জন্য সবচেয়ে বেশি। আর তাঁদের সেই সংগ্রাম বাইরে থেকে আমরা বুঝে নিতে পারি না। কিন্তু কবি তো পারেন, অনুভূতি দিয়ে, শব্দ দিয়ে এই সংগ্রাম, সেই হাহাকার, যন্ত্রণাকে ভাষা দিতে। এই বইয়ের  ‘শ্রী’ নামের কবিতার কেন্দ্রীয় চরিত্র হলেন নামহীন এক কানাডোম। এই ‘কানাডোম’ কথাটি বেশ তাৎপর্যপূর্ণ মনে হল। কেননা, একদিকে যেমন শরীরের অন্যতম মূল্যবান অংশ চোখ নেই, মানে থেকেও নেই, অন্ধ বা কানা, আবার অন্যদিকে পেশায় তিনি কী? একজন ডোম; যাঁর কাজ মৃতদেহ পোড়ানো। আর কী পরিহাস জীবনের, অন্যের মৃতদেহ পুড়িয়ে করা উপার্জন দিয়ে জীবন চলে তাঁদের। ভাত ফোটে। এখানেও তা-ই হচ্ছে। কিন্তু তারও আগে একটি বিষয় খোলসা করে দেওয়া যাক বরং? এই ‘কানাডোম’ আসলে অন্য কেউ নয়, স্বয়ং কবিই। আর এত মৃতদেহের মাঝে তিনি কাউকে চান, কাউকে ভালবাসেন, কেউ আছেন; যাঁর জন্য এই মৃত্যু ঘেঁটে, ‘ছাইপাঁশ ঘেঁটে’ বাড়ি নামের স্থানে ফেরেন, যেখানে ফিরে এসে প্রকাশ্যে বলেন বা স্বগতোক্তি করে বলেন ‘তোমার জীবন্ত মুখ ভালোবাসি।’ বা ‘আমি কানাডোম  শুধু/ লাশ পোড়াই,/ লাশের আগুনে/ আমাদের ভাত গরম হয়।’-এর মতো কী ভীষণ সত্য কিন্তু ‘ডিস্টার্বিং’ লাইন কিছু।  আরেকটি খুবই চমকপ্রদ বিষয় হল এমন বার্তা, এমন বাস্তবতার কথা বলা একটি কবিতার নাম ‘শ্রী’ দেওয়া। ‘শ্রী’ শব্দের অর্থ সমৃদ্ধি, সৌন্দর্য ইত্যাদি; আর এখানে দেখছি একজনকে, যিনি বলছেন ‘ছাইঘেঁটে নিয়ে আসি অসমাপ্ত পাপ’, যিনি বলছেন ‘আমি কানাডোম শুধু/ লাশ পোড়াই,/ লাশের আগুনে/ আমাদের ভাত গরম হয়।’ 

আর এর থেকেই আমরা বুঝতে পারি, এই কথায় কতটা শ্লেষ, কতটা চাবুক রয়েছে।     

এই কাব্যগ্রন্থে যেমন নিজের চেতনা দিয়ে চিনে নেওয়া আছে পারিপার্শ্বিককে, তেমনই আছে নিজের মধ্যে থাকা আরেক নিজের প্রতি কিছু কথা, কিছু আলাপ, বোধ, দর্শন। এই বোধ, এই দর্শন আসে তাঁর consciousness থেকে। যে consciousness একজনকে বুঝতে শেখায় ‘পাথরেরও মৃত্যু হয়, ক্ষয়ে যাওয়া সভ্যতা যেমন/ আয়ু ধুলো হয়, ধুলো, মাটি।’ অথবা ‘ধুলো থেকে জন্ম নেয় আয়ু।/ আয়ু থেকে ধুলো।’ (কবিতার নাম - স্থাপত্য)।

এই যে আয়ুর ধুলো হয়ে যাওয়া বা বিপরীতটি, মানে ধুলোর আয়ু হয়ে ওঠা, সে শুধু সময়ের অধীনে, যাকে ইংরেজিতে বলা যেতে পারে এভাবে – matter of time; এই যে সময়, তার মধ্য দিয়ে যেভাবে ঘটনাকে ধরে রাখা হয়, তেমনই ঘটনাও কিন্তু সময়ের ভাবনাকে জীবন্ত করে রাখে। আর এই সময় যেমন আবহমান কাল-কে ধরে, তেমনই প্রতিনিধিত্ব করে সমকালেরও। এই কাব্যগ্রন্থে কিন্তু তারও উল্লেখ রয়েছে। প্রসঙ্গত বলে রাখা ভাল, এই কাব্যগ্রন্থটি ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে প্রথম প্রকাশিত হলেও, এর মধ্যে থাকা কবিতাগুলি ২০২২ থেকে ২০২৫ সাল সময়ের মধ্যে রচিত। এই স্বল্প কালখণ্ডে অনেক অনেক ঘটনা ঘটে গিয়েছে, আর সেসব ঘটে যাওয়া ঘটনার মধ্যে সবচেয়ে fatal বা প্রাণঘাতী কিছু থেকে থাকে, তা হল করোনা ভাইরাসের হঠাৎ প্রাদুর্ভাব ও তৈরি হওয়া মৃত্যুমিছিল। এতে কেবল আপনজন ও অন্যান্যদের মৃত্যু দেখা, বিবিধ হাহাকার শোনা ছাড়া আর কিছুই ছিল না! সাথে ছিল নিজেকে একপ্রকার বাঁচাতে ও অন্যদেরও বাঁচাতে নেওয়া পন্থা, এক পরিশুদ্ধি যেন, যার ইংরেজি নাম ছিল Quarantine বা Self-quarantine বা বাংলায় বললে এরকম হয়: সঙ্গরোধ বা রোগ-অন্তরণ। আর এইসব প্রসঙ্গ, আবহ এসেছে ‘শ্লোক’ কবিতায় এভাবে – ‘বন্ধুর মৃত্যুর কাছে হাঁটুমুড়ে বসি।/ ভয়, ভাইরাসের মতো বোবা করে দেয়/ কারো মৃত্যু হলে, বুঝি, নিজেরই মৃত্যুর কথা’ 

এই যে ‘ভয়’ আর ‘ভাইরাস’ শব্দদুটির ব্যবহার ও পাশাপাশি অবস্থান, তা আসলে কবি হিসেবে হিন্দোল ভট্টাচার্যের শব্দের সূক্ষ্ম প্রয়োগের নিপুণতাকে বুঝিয়ে দিচ্ছে এবং পাঠকদের মনে করিয়ে হচ্ছে একবিংশ শতকের একটি গুরুত্বপূর্ণ ও বিষাদময় অধ্যায়কে। 

অনেক কথাই হয়ে গেল, কথায় কথায় আরও অনেক কথা হয়ে যাবে। এখন কথা এটাই যে, সব কথা যদি এই তালমাত্রাজ্ঞানহীন প্রবন্ধলেখকই বলে দেয়, তবে পাঠকদের জন্য থাকে কী! তেমন করাটা তো একপ্রকার অন্যায়, তাই না? তাই আর অন্যায় বাড়াতে চাইছি না, এবার এই কাব্যগ্রন্থের নামধারী কবিতাটি নিয়ে খানিক আলোচনা করেই এই লেখার ইতি টানা যাক, কেমন? 

‘জীবন, পালকজন্ম’ কবিতাটি আসলে জীবনের হালকা অথবা ঝোড়ো হাওয়ায় উড়ে যাওয়া পালকের কবিতা, নিজেকে আবিষ্কারের কবিতা, অন্যকে খুঁজে পেতে চাওয়ার কবিতা, ভেসে থাকার কবিতা, ভেসে যাওয়ার কবিতা, ঠিকানা হারানোর কবিতা, আশ্রয় পাওয়ার কবিতা, এক শূন্যতা, এক মনখারাপ, ‘কী যেন নেই’ এমন একটা ভাবের কবিতা এবং সর্বোপরি ভালবাসার কবিতা। কবিতাটির কিছু লাইন – 

‘তোমাকে চিনেছি, ভাবি, তারই পর ভেঙে যায় সমস্ত দেওয়াল/ কাকে তবে চিনি, ঘড়ি উল্টোদিকে ঘোরে, ভাঙে কাচ/ শূন্য থেকে লাফ দিয়ে এসেছি যেন বা শূন্যে, পা রাখব কোথায়?’ বা ‘তোমাকে দুঃখের মতো ভালোবাসি, যেকোনও সময়’ অথবা ‘আকাশ ভাঙার দিন চলে এল, চারিদিকে প্রসবের ব্যথা/ একটি কবিতা আজ শিশুর লাশের মতো পরিত্যক্ত, একা/ সে আমায় খুঁজেছিল, মনে পড়ে, মনখারাপ দেশের মানুষ।’ 

অতএব, এই সিদ্ধান্তে যে আসাই যায় যে, এগুলি কেবলই ‘কবিতা’ নামের কিছু অলীক কল্পনা নয়, বরং জীবনের মধ্য দিয়ে নিজেকে অথবা নিজের স্বরূপে অন্যকে খোঁজা, জীবন নিংড়ে লেখা পঙ্‌ক্তিসকল। যেখানে শব্দের মধ্য দিয়ে কবি চান যাকে, সেও প্রতীক্ষারত থাকে কবিকে পাওয়ার আশায়। এ এক আশ্চর্য মিলন, এ এক মহামিলনের বার্তার চেয়ে কিছু কম নয়। যেখানের মূল শব্দ হল, ডাক হল এরকম – ‘গভীর ঘুমের মধ্যে, কোথাও হয়তো তুমি আছ’ বা ‘তবে কি নিজেরই ঘুমে ডাক দেব, এসো পরিত্রাণ?’ বা ‘হয়তো কোথাও তুমি আছ, তাই ডাকিনি তোমায় - / আমার আরুণিজন্ম এ শহরে উপবাস চায়।’ অথবা ‘হয়তো গভীর ঘুমে আছ তুমি, চেয়েছ আমায়।’, যা লিখিত রয়েছে এই কবিতাগ্রন্থের শেষ কবিতা ‘যে কথা ব্যক্তিগত’-তে…

গল্প : শিখা রায়



চিঠি-বাক্স




শুনশান দুপুর। শুকনো পাতার উড়ে যাওয়ার শব্দ ছাড়া আর কোনো শব্দ নেই। ঠিক সেই সময়ে অন্ধকার সিঁড়ির তলায় রাখা পুরোনো খয়াটে চিঠি-বাক্সের মরচে পরা কুলুপটার খোলার জোরালো শব্দ হয়।শান্ত দুপুরটাকে সশব্দে কেউ যেন ভেঙে খানখান করলো। ধুলো পড়া সিঁড়ির তলায় ত্রস্ত পায়ের আওয়াজ ও স্পষ্ট শোনা গেল।

      

এই সময়ে একতলায়, কোণের  আধভাঙা দরজাটা নিঃশব্দে খুলে যায়। ভীরু এক মেয়ে, মণিমালা, সাবধানে চিঠি-বাক্সের কুলুপ খোলে। নতুন কাগজের খসখস শব্দ স্পষ্ট শুনতে পাওয়া যায়।মণিমালা কাঁপা হাতে চিঠি লুকোয় বুকের ভাঁজে। এর চেয়ে নিরাপদ জায়গা আর কোথায়! শালিক পাখির মতো ঘাড় ঘুরিয়ে এদিক ওদিক দেখে। তারপর দরজায়  আওয়াজ না তুলে, ঘরে ঢুকে যায়। ভেতরের ঘরে জেগে থাকা বুড়ি আম্মা গলা তুলে হাঁক দেয, “দরজার আওয়াজ  হলো। কে এলো!”                          মণিমালা সাড়া দেয় না।সে তার আধো অন্ধকার ঘরে, জানালার ধাপে বসে। হাঁফায়। সে কুঁচকে যাওয়া খামটা  আঙুল বুলিয়ে সমান করে। তারপর নরম হাতে চিঠি বার করে। ওদিকে, সামনের হলুদ বাড়ির সাদা পর্দা হাওয়ায় দোলে। নড়েচড়ে-অচেনা  মানুষের চেনা ছায়া!

     

মণিমালা গোপন চিঠির  সোঁদা গন্ধ নেয়  চোখ বন্ধ করে। একলা  দুপুরে, আবছায়া  মনে, চিঠির  এলোমেলো কথায়  ডুব দেয়। সাদা  কালো শব্দের সঙ্গে কথা বলে। সময় গড়াতে থাকে।

            

দুপুর গড়িয়ে যায়। পড়ন্ত বিকেল এলোমেলো হয়ে যায়। হলুদ বাড়ির পর্দা আর নড়ে না। মণিমালা বিমনা মনে ঘরের কাজ সারতে থাকে। পাশের ঘরে, বৃদ্ধা আম্মার বকবকানি চলতে থাকে। সাঁঝ-পাট সেরে মণিমালা এবার বাক্স খুলে চিঠির বান্ডিল নামায়। রেশমী ফিতের বাঁধন খুলে, বিছানায় বিছায় সেই চিঠির রাশ। আবার গুছিয়ে রাখে। এ তার  বড়ো প্রিয় কাজ। তারপর অন্ধকার রাত  নিজের নিয়মে আসে।আম্মা ঘুমের  মাঝে কথা বলে। সে উত্তর দেয় না। তার বুকে তখন ঢেউ।

      

রাত গভীরে, নীলচে আলো জ্বেলে, সে চিঠির উত্তর লিখতে বসে। শব্দের কবিতা তৈরি  হয় নিকষ অন্ধকারে।অন্ধকারে চুঁইয়ে পরে নিঃশর্ত রক্ত। মণিমালা জেগে থাকে রাতভর। রাত শেষে সে নিঃশব্দ পায়ে সাবধানে সদর দরজা খুলে, অন্ধকার চিঠি-বাক্সের গোপন গর্ভে উত্তর রেখে আসে। আম্মা শুনতে পায় দরজা খোলার শব্দ। চেঁচিয়ে গাল পাড়ে। সে ঘরে ফিরে আসে। ভোরের বাতাসে তখন নিশ্চিত আশ্বাস। মণিমালা ঘুমিয়ে পরে। 

       

দিন যায়। রাত যায়। মাস যায়। বছর ঘুরে যায়। একদিন শীতের ভোরে হলুদ বাড়ির ভাড়াটিয়া ভাড়া গাড়িতে মালপত্র গুছিয়ে নিয়ে বিদায় নেয়। গলিতে শীতের কনকনে বাতাস বয়ে যায়। মণিমালা জানলার ধাপিতে একা বসে থাকে। হঠাৎ তার খুব শীত করে। পাশের ঘরে আম্মার সাড়া শব্দ নেই। শীতে  কুঁকড়ে গেছে আম্মার শরীর। গায়ের চাদরটা  সাপটে ধরে, মণিমালা চায়ের জল চাপায়।

    

ঋতু আসে। ঋতু যায়। সিঁড়ির নিচে চিঠি-বাক্সের  এখন কোনো কাজ নেই। বাতাসে দোল খায় ছোট দরজার কুলুপ। এক পায়রা দম্পতি  ইতিউতি ঘোরে। বোধহয় চিঠি-বাক্সে বাসা বাঁধবে তারা! মণিমালার হেলদোল নেই।

      

বসন্তের প্রথমে,হলুদ বাড়ির রং হয়। জানালা-দরজা খোলে। ভাড়া গাড়িতে নতুন ভাড়াটে আসে। সিঁড়ির অন্ধকারে আলো ফোটে। মণিমালা জানালায় দাঁড়িয়ে, তার মেঘের মতো চুল আঁচড়ায়। তার সারা শরীরে বাসন্তিক ইঙ্গিত। হলুদ বাড়ির সাদা পর্দায় অচেনা মানুষের ছায়া। চিঠি-বাক্সের  কঠিন  কুলুপ নড়েচড়ে। ভাঙা  দরজা আবার নিঃশব্দে খুলে যায়। আম্মা নিজের মনে বকবক করে। মণিমালা আবার রাতে জেগে থাকে— নীলচে আলোয় স্বপ্ন দেখে। তার চোখে সুখ উপচে পরে। চিঠি-বাক্সের  এখন অনেক কাজ। পায়রা যুগল ডানা ঝাপটায়। তাদের নিশ্চিত আবাস আবার অনিশ্চিত!




Saturday, April 11, 2026



রাষ্ট্রবাদী-১


কথা নেই, বাতিটার অপলাপে


পড়ে আছে নিরুৎসুক ছায়া, বড্ড কাছাকাছি।


               কামনার দিন বুঝি গেল


রাষ্ট্রীয় কণ্ডোম বড় সারল্য প্রত্যাশী


 


প্রত্যেক ফুলে তবু জাতকের স্বপ্ন লেগে আছে –


দরজার পাশে, একদা সাক্ষাতে বলেছিল


আড়ালিয়া। অধোবদনের সাথে


কথারাও ধাওয়া করে, তামসিক দৌড় থেকে


ছিপছিপে উঠে আসে কথার পাহাড়


 


রাষ্ট্র কায়েম করে পাহাড়ের নাম


 



রাষ্ট্রবাদী-২


কিছুতে সাজেনি যে তাকে আমি কি দিয়ে বোঝাই –


শাসকের রঙ এক জীবনের মতো, আশপাশে প্রহরীর দল


অদেখায় ঢেকে রাখে সাদা অনশন


 


সময় অনেক আছে, আমাদের হাতে তবু নেই।


মাঠের হৃদয়ে চাঁদ, অস্থির পথটাকে এঁকেছিল রাতে


সতত ঘুমের ঘোর, আমাদের সাথে আমাদের শিশুরা তখন


আঁচলের ভাঁজ ভেঙে অনর্গল জুটেছে একসাথে – হতে পারে দলমত


হতে পারে অনুসারী বিরোধে সম্ভোগে


শীতাতুর কুকুর সেজে পরসীমানায় – দেহজ প্রবল ফেউ


ডেকে আনে সহস্র আহ্লাদ। গলা ছাড়ে ভেক, চিত্রিত বৃষ্টির দেশে


সবাই চেতনে কামুক, সকলের রঙে আঁকা ঠোঁট মিশে যায় রঙে


 


তবু যে সাজেনা এমন, কিভাবে বোঝাই তাকে


               দলমতে ডুবে যায় জনসাধারণ





রাষ্ট্রবাদী-৩


ভবানী জঠর; এই লহ প্রসাদ, খাও…


খামোখাই বিদ্রোহ করেছিলে কাল। দেখেছ তৃষ্ণা আসে


খাপছাড়া বেড়ে উঠে খিদের লহর – করে বিচলিত


 


তাই অনুগত, হতে হয়। যতবার এদিক ওদিক


ভেবেছিলে পথ আছে – ততবার স্থির সীমানায়


কাঁটাতারে পক্ষির মৃতদেহ দোলে


            ভাবনারও ঘটে অবসর


 


স্থলের জানুতে এসে প্রবাহের মতি বদলায়


 



রাষ্ট্রবাদী-৪


আরেকবার উড়ে গেল হাঁস, খামারের দিকে


সঙ্গীরা বলেছিল ভালো, প্রহরের নাম যেথা দলীয় সংহতি


সেই দিকে উড়ে গেল হাঁস


 


কথাও ফুরালো। কেননা সাবধানে ইতিউতি


চলাই জীবন। মালিকের দেশে


কাল কেউ নিয়ে যাবে হাটে বা বাজার, খাঁচা জুড়ে


দানাপানি ছড়াবে অঢেল


 


তবেই ওজন বাড়ে, বাড়ে বল, বাড়ে মাংস


স্বাদের সম্বল নিয়ে শেষতক উড়ে গেল হাঁস


খামারের দিকে


 


এরপর বিকল্প গুঞ্জনটুকু মুছে দিতে পার, যদি চাও


পাত পেড়ে বসে থাকা অবয়বটাকে


আর কারো খাদ্যে পাঠাও


 


কিছুই হবে না তাতে, কোনো খেদ রহিবে না


হত্যার আহুতি পরে নরমাংসে থাকবে না ভেদ ভক্তি জ্ঞান


 


আর কোনো দাস এসে তোমার সমান


তোমারই শরীর হবে



 


রাষ্ট্রবাদী-৫


এভাবে প্রেমের কথা নয়, মিশুকে বাতিটার পাশে


জেগে আছে কাঁচের পুতুল, বিমোহিত পোকাদের দেশে


নিরুক্ত শরীর জুড়ে আগুনের পরিচিত ছাপ, মৃত্যুও ক্রিয়াশীল


আমাদের সব কথা নিয়ে গেছে


 


মরা নদী ধরে আছে জলের প্রলাপ


 


এভাবে প্রেমের কথা নয়, জানালা জড়িয়ে আছে


রাস্তার আলো, ঘরেও কিছুটা দূর নিয়ন দাঁতের খুনি


ছিঁড়ে নিলে যত অন্তরাল, আদিগন্ত গ্রাস করে


প্রচারিত সমাজ নিশুতি


 


নিরালা হারিয়ে কথা অনুদানে থিতু হয় নিভৃতি কাঙাল


 


নদীটার জল চাই, চাই মাঝি। এত খুন মাপ করে


সহচারী জেগে থাকে যদি, ছইয়ের সামনে রেখে ভেজা গামছা


সরবে পেরিয়ে যাব আরোপিত তরঙ্গ সঙ্কুল


 


মুখোমুখি প্রেম হয়ে ভেসে যাবে মানুষের কথা

Wednesday, April 8, 2026

গুচ্ছ কবিতা : অনিন্দ্য সরকার

 


স্মৃতি


সারাদিনের যেটুকু পাওয়া

যেটুকু ভাঙাগড়া, ক্ষয়


তুমি ভাবছো সব জমছে.. 


স্মৃতি নয়। দিনান্তের অপচয়। 





ভালোবাসা


আমি এতো যে ভালোবেসেছি

তবুও কি পাবো না তাকে? 


ঈশ্বর তো চাইনি... 


শুধুমাত্র চেয়েছি তোমাকে।





জীবন


সারাদিন শুধু একা একা চলা

সারাদিন শূন্যের মতো স্থির


আগলে রাখার কেউ নেই... 


এ জীবন নির্জন মুসাফির।





ঈশ্বর


কেন বলো তুমি ভীষণ একা? 

কেন বলো কেউ নেই কাছে? 


মুখ ফিরিয়ে দেখো... 


তোমার পাশে ঈশ্বর বসে আছে।





মরণ 


আমার জীবন নদীর ওপারে

ভেসে আসে কোন সুর


তরঙ্গ ওঠে প্রাণে... 


মরণ, তুমি অনেক দূর।

Saturday, April 4, 2026

গুচ্ছ কবিতা : সৃজিতা চক্রবর্তী




 কাশী এক নদী পর্যায়


মুক্তি


ধুতরা ফুলের ছায়ায় 

পবিত্রতা কেঁপে ওঠে,

নদী ঘোলাটে হয় 

সূর্যাস্তের বিসর্জনে,

ওতে মিশে আছে 

চিরমুক্তির চিতা ভষ্ম

আর মোক্ষ লাভের আর্তি।





উদযাপন


স্তূপ স্তূপ আগুন 

পোড়া চামড়ায় কালো দাগ

রঙিন জড়িতে মোড়া মাংসপিণ্ড  

অদৃশ্য দেবতা ধোঁয়ায় বিলীন ।

পবিত্রতার তাগিদ চরম।

সে

উদযাপন দেখে

নিশ্চল অবিরাম

চামর দুলে ওঠে আরতিতে।





সময়


ধুলো মাখা দীর্ঘ কাঠামো,

সময়ের থেকে প্রাচীন 

তার দৈর্ঘ্য প্রস্থ।

ভগ্ন কারুকার্য রক্ষা করে 

একটা শহর দাঁড়িয়ে আছে 

অলৌকিকতার ভরসায়।

তামাটে শিল্প সময় আটকে রাখে

কালচক্রের শূন্য গতিতে।





আধ্যাত্ম


অঘোরী তপস্যায় স্বপ্নে আসে —

পুনরায় ফিরে আসা পরিযায়ী

আয়ুকালের দুই প্রান্ত

— পবিত্র — অশুচি।

কর্মফলের অজুহাতে

নিঃশব্দ বাতাস মন্ত্র পড়ে,

 দিক নির্দেশ করে ডিঙিগুলোকে,

ওরা ধীরে ধীরে পারি দেয় 

আধ্যাত্মে — এক না ফেরার দেশে।


গুচ্ছ কবিতা : দেবজ্যোতি মল্লিক

 


নির্বিরোধ... 


যুদ্ধ একটা খিদের নাম। 

এই নৈরাজ্য, সন্ত্রাস, রাষ্ট্রবিপ্লব,

থালা হাতে চৌকাঠে দাঁড়িয়ে আছে।

উঠোনে উঠোনে রক্তভোজ, নখ, দাঁত, বাটি 

আমরা শান্তিকামী, চিরপ্রসন্ন, কবিতায় কুলুপ আঁটি।

খুব নিশ্চিন্তে আছি, মানে মানে এবারের যুদ্ধ শেষ হলে

আমাদের অকেজো মেরুদণ্ডে জাতীয় পতাকা উড়বে।





অকিঞ্চন... 


মহাজনী খাতায় বাঁধা রাখি সাধের ঘরবাড়ি

অভাবে-স্বভাবে চাল বাড়ন্ত, শাকভাত, তরকারি। 

ছেলে বড়ো হবে, ছেলে বড়ো হয়, 

তিল তিল বুক বাঁধি, পাঁজরে ক্ষয়।

চড়ুইচোখ আকাশ চায় দ্বিঘাত বৈভবে 

একদিন ঠিক হবে, সব একদিন ঠিক হবে।


খেলনাপাতি সাজিয়ে রাখি অক্ষমের দল,

আমরা দরিদ্র-দুর্বল।





অপ্রেম... 


যে জল অশ্রু, তার নাম শুনেছি জীবন।

অন্নে অনন্ত আকাল, অয়ি! শূন্য প্রণাম দিলাম। 

তোমায় ভালোবেসে জানি, জীবন বড়ো ছোটো, 

তবুও উন্মাদ আমি মৃত্যু বেছে নিলাম!





বীতশোক...


তোমার হাসির পাশে লম্বা বারান্দা মনে পড়ে।

আমরা হেঁটে যাবো জ্যোৎস্নার খুব কাছাকাছি।

বাদবাকি সব মিথ্যে, হয়তো সত্যি গিয়েছি ভুলে

অথবা হৃদি অকুল ভেসেছে জাহ্নবী ঘোলাজলে।


অলিন্দ চিরপ্রস্থান আঁকে, বুকে চিত্রিত শোক

এদিক ওদিক  পলায়নপথ, নির্বাণ-নির্মোক।

হারিয়ে যাওয়াই সহজ যখন, এমন বেবাক আমি

জ্যোৎস্নাসুখে কলিজা পোড়াই, অন্ধ মোহে থামি!


ফেরার আর পথ নেই, আয়ু নেই

আমাদের পদরেখা যা কিছু সব মলিন হয়েছে





প্রিয়তমাষু...


তুমি সুন্দর নও, যতটা ফুল 

তবু তুমি হাসলেই অসময়ে বসন্ত আসে। 

পাঁজরে পলাশমধু, মিশে যাই আমোদ উল্লাসে।

ব্রহ্মাণ্ডে, অনাত্ম সংসারে,

ওই আঁখিতে আমি অনন্ত শান্তির শয্যা পেতেছি।

বলো, আমার পৃথিবী কি এমন ফুলে ফুলে ভরেছে কখনো?

প্রবন্ধ : ফজলুল করীম

মার্কিন সাম্রাজ্যের সাহিত্যিক ময়নাতদন্ত সাম্য রাইয়ান-এর উপন্যাস ‘সকল প্রশংসা মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের’ সমকালীন বাংলা সাহিত্যের এক অত্যন্ত সাহ...