Monday, September 23, 2024

বান্ধবনগর | শরৎ ১৪৩১ | বিশেষ অনলাইন সংখ্যা

অন্তর্ঘাতের খসড়া

ছাপা সংখ্যার পাশাপাশি, অন্তর্জালেও বান্ধবনগরের বিশেষ অর্ঘ্য। এই শরতে। নির্বাচিত দশজনের কবিতা। 

যে-বন্ধুরা বান্ধবনগরের ডাকে সাড়া দিয়েছেন, ভালোবাসা ছাড়া তাঁদের আর কী দেবার আছে আমাদের!  

এখন থেকে  নিয়মিত বান্ধবনগরের অন্তর্জাল সংখ্যাও  প্রকাশ করব আমরা। বন্ধুদের কাছে অনুরোধ, লেখা পাঠান। গল্প  উপন্যাস প্রবন্ধ কবিতা সহ যে কোনও রচনা।  

এই শরতের বুকের ভেতর অভূতপূর্ব আগুন। সবাইকে আগ্নেয় শুভেচ্ছা জানাই। 


সুমন গুণ


---------------------------------------------------------


কবিতা পড়তে নীচের লিঙ্কে ক্লিক করুন


জাতকের কবিতা | চৈতালী চট্টোপাধ্যায়


মৃত্যুর বিরুদ্ধে | সৈয়দ কওসর জামাল


মূর্তি | নিশীথ ষড়ংগী


বৃক্ষকথা | অগ্নি রায়


ছোট বোন, বড়ো বোন, ধর্ষিতা বোন | শমিত মণ্ডল


মোক্ষম প্রশ্নগুলি | দেবজ্যোতি রায়


মানচিত্র | বেবী সাউ


ছন্দ | শ্যামশ্রী রায় কর্মকার


স্থগিত | প্রিয়াঙ্কা চৌধুরী


জাতকের কবিতা | চৈতালী চট্টোপাধ্যায়

একজন্মের কথা বলছিলাম তোমাকে।

যখন পাথর ছুঁড়ে সিঁথি রক্তে ভরিয়ে দিয়েছিলে।

হাতে পায়ে কষকষে লোহার বেড়ি পরিয়ে রাখতে।

চুল ধরে টেনে নিয়ে যেতে অন্যের শয্যা থেকে নিজের শয্যায়।

পরের জন্মে পেটে শিক্ষা পড়েছিল, তাই, নান্দনিকভাবে বন্দি করেছ। 

যখন খুশি ধর্ষণ করবে বলে স্বামী হয়েছ।

হত্যা করেছ ঘরের মধ্যে চুপ করাতে চেয়ে। 

পথেঘাটে খুন করেছ মাংস খাবে বলে।

আরেকজন্মের কথা বলব তোমাকে, যে-জন্মে 

তুমি নারী কী পুরুষ,সে কথা অবান্তর হয়ে যাবে

মৃত্যুর বিরুদ্ধে | সৈয়দ কওসর জামাল

শুধুই গোধূলিকথা... কখনও দেখোনি 

বুঝি দীপ্ত ভোরবেলা?

সেখানে কি ফোটে না দ্রোহের ভাষা, 

তর্জমা করে না কোনো মানুষের আয়ু?

যদি বলি, আমার বিদ্রোহ ঠিক আমার 

মতন, একা এবং একেলা

ছুটে যাই পথ খুঁজে, যার কোনো শেষ 

নেই, যত যাই টানটান স্নায়ু


আশ্রয় পেয়েছি কোনো সূর্যাস্তের 

অশান্ত গভীরে

প্রশ্ন করি পথের দেবীকে, আমাকে 

এখনও আর কতদূর যেতে হবে?

আমাকে বলে না কেউ সামনে 

দিগন্তের রেখা, পথ শেষ, পাখিরাও

                            ফিরে আসে নীড়ে

পথের দুঃখের কাছে বসে ছিল 

অসহায় পথিকেরা, তাঁদের বিষণ্ণ চোখ

                                ডুবেছে নীরবে


নাকি ঈশ্বরের স্তবে—ওরাও জানে না, 

আমি পৃথিবীর সীমা ছুঁয়ে থাকা

                     প্রান্তিক বিদ্রোহী

তাদের ফুসলিয়ে নিয়ে যেতে চাই 

গোধূলির কাছে, দেখাব কীভাবে

                       আমাদের রক্তিম জীবন

মুছে যায় ধীরে ধীরে নীলের আঁধারে—

বসে থাকে মৃত্যুর বান্ধবত্রয়ী—

তারা হাতধরাধরি করে থাকে সর্বক্ষণ--

গভীর নিদ্রার পথ, ব্ল্যাক হোল,

                          আর বিস্মরণ।

মূর্তি | নিশীথ ষড়ংগী

টীকা ও টিপ্পনীসহ এক এক মূর্তি ধরে 

ভাঙচুর করতে করতে যাও--

স্থবির, অপ্রচলিত, দূষিত ও প্রতিক্রিয়াশীল।


চারপাশে জড়ো হওয়া,শাসক ও মুৎসুদ্দি বাহিনীর 

চরিত্র-পাথরে গড়া সৌধ, ইমারত 

ঘৃণা-তরবারি দিয়ে,ভাষার পরশু দিয়ে দ্বিখণ্ডিত করো


সন্ধ্যাতারা থেকে অন্য আরও এক শুকতারা অব্দি 

দেখো

তোমার মল্লার নেমে আসে 

ঝকঝকে, দীপ্ত আর আয়তনবান --


ঐ দেখো, রাষ্ট্রনীতির তপ্ত কুটিল আকাশে 

বুরোক্র্যাট মেঘ ফুঁড়ে ওঠে 

হা হা জিভে চেটে খায় তরুণী , প্রকৃতি-শরীরও

মাটি, জল, হাওয়া, রোদ তীক্ষ্ণ দাঁতে কাটে।


মূর্তি ভাঙো, স্বার্থ ভাঙো, মেকি মেধাজীবী


প্রকৃত সারস,তার, চোখের জলের দিকে দৃষ্টি জমিয়ে

তোমার উদ্গত অশ্রু, সংক্ষেপে লুকাও

বৃক্ষকথা | অগ্নি রায়

নিতান্ত টবের গাছগুলির কথা জানা হল না আজও--- এই দুঃখ রাতে প্যাঁচার মত জেগে থাকে। মাথার ভিতর থাকে কাঁটাগাছ। নামপদ বহুবার হারিয়েছে পাকদন্ডিতে যখন এক্সপ্রেস গতিতে আসা পাহাড়ি বাদলের পর শ্যাম্পু সেরে পাইন দাঁড়িয়েছে সামনে। যে ডালে বসেছি কোনও গ্রীষ্মের ছুটির দুপুরে, বৃদ্ধ হয়ে যাওয়া যে সব ছালবাকল তুলতে তুলতে হুলুস্থুল ফেলে দিয়েছি লাল পিঁপড়ের গর্তে, যার কোটরে লুকিয়ে রেখে দিয়েছি প্রেমপত্র — তাদের পরিচয় জেনে নেওয়া হয়নি কখনও।

অর্কিড ঝোপে মাঝরাতে পায়চারি করতে বেরিয়ে মনে হয়েছে বেতালের খুলি গুহার প্রতিবেশী বাওবাব! মধ্যরাতে দেখা মুর্শিদাবাদের বিলাসী আমগাছ আর তার পল্লব বদলে ফেলেছে ভোরে। বিরহ তখন  কুয়াশার মতো আমবাগানে। কোম্পানির কাল পেরিয়ে তার গোল্লাছুট দৌড় তখন মুঘল চৌকির দিকে যেখানে কোমরবন্ধ থেকে তরবারি খুলে গাছে পিঠ ঠেকিয়ে বসতেন শ্রান্ত সিপাহশালার। যে বাগানের মদিরগন্ধে পশ্চিম এশিয়া থেকে উড়ে এসে বসত নীল মাছি।

ঘুমের মধ্যে রেনফরেস্ট সংখ্যার পাতাগুলি প্রশ্নপত্র হয়ে উড়তে থাকে! স্বপ্নে পাওয়া বিজন বোট্যানিকাল মোড়ে ক্যানোপি কলোনির বিলম্বিত ছায়ার নিচে একা খাতা হাতে বসে থাকি আর ব্যর্থ আঁকিবুঁকির ছায়া ঘনায়। পুরানে বর্ণিত অতিকায় মহাবৃক্ষের থেকে দুটি শাখা গলার কাছে এগিয়ে আসে,  উত্তর না লিখতে পারলে আরও অসংখ্য শিকড়দাম গলা জড়িয়ে ধরবে এই আতঙ্কে ধড়মড় করে দুঃস্বপ্ন ভেঙে যায়। ছোট ছোট টবের দীর্ঘশ্বাস রাতের ঝুলবারান্দাকে অপরাধী করে রাখে

ছোট বোন, বড়ো বোন, ধর্ষিতা বোন | শমিত মণ্ডল


জেগে আছে নদী আর জেগে আছে ব্যথিত মানুষ।

আমাদের জনপদ সেও তো ব্যথিত!  

অন্ধকারে জ্বেলেছে যে মোমবাতি সে তো ছোটবোন, 

থাকে দরমার ছোটো ঘরে, মাথায় টালির চাল 

টালা কিংবা টালিগঞ্জ অথবা মালদা।

অন্ধকারে অন্য মেয়ে, সেও আজ মোমবাতি হাতে 

বড়ো বোন, থাকে পাকা ঘরে, টালা, কিংবা টালিগঞ্জ 

অথবা মালদা... সকলের চোখে সকালে যে নদী 

ছিল এখন বিকেলে সব আগুনের রাঙা নদী...


আগুনের নদী জেগে আছে, জেগে আছে 

মিছিলের শ'য়ে শ'য়ে ক্রোধিত মানুষ 


ধর্ষিতা বোনটি তার হাতটি নাড়ালো।

মোক্ষম প্রশ্নগুলি | দেবজ্যোতি রায়

ফুল থেকে রক্ত ঝরে

পাতার সবুজে কালো রং 

শিশুর খেলনাগুলি বদলে যায় অস্ত্রের আকারে 

আকাশে জ্বলছে তীব্র  মোমবাতি নক্ষত্রের মতো।

অনিশ্চিত মৃত্তিকায় এসবের সূচনা-কম্পন 

এতদূর ভাবতে ভাবতে একটি গাছের নীচে

নীরবে দাঁড়াই। অশরীরী শব্দের জাদু-

বৃদ্ধের জগৎ-ও এই স্থিতিশীলতাকে আর বিশ্বাস করে না। 

কোথায় দাঁড়াবে তবে?


বাড়ির দেয়াল থেকে চিলেকোঠা 

প্রতিধ্বনিময়

পাখি ডেকে ওঠে-- এবার বিচার চাই 

নদীর তরঙ্গে কান পেতে মাঝি শোনে

বিচারের দাবি 

নিহত সময় ক্রমশ অস্থির হচ্ছে 

বিচারে সন্দেহ নিয়ে ঝিলে মরা মাছ ভাসে!


তোমার ঘুমের মধ্যে যে কোনো মুহূর্তে ঢুকে পড়বে

সি আর পিসি-র পাতাগুলি 

মোক্ষম প্রশ্নেরা কড়া নাড়ছে গূঢ় ইতিহাসে 

বন্ধুরা প্রস্তুত। ফেটে পড়বে ক্রোধে ও বিষাদে।

মানচিত্র | বেবী সাউ

ভাঙন লিখিনি কিছু, শুনি দূরে আজান বেজেছে


আজানে কি ভয় বাজে? শাঁখে বাজে বিপদসঙ্কেত?

দিগন্তের হিংসার দৃশ্য, অপলক আগুনের ছায়া


আঁচড় কেটেছি বলে মাটি থেকে রক্ত ছুটে আসে


এত কিছু হয়, তবু এ পৃথিবী চুপ করে তার

গুনেছে সময়, যেন, সময়ের দায় আছে কিছু।


আমারও বিয়ের কথা ছিল প্রেম বিবাহের দিন

ছিল জোঁক শস্য থেকে শরীরের নোঙর অসীম...


বাতাসে পতপত করছে চাঁদের আলোয় ভাইজান


ভাঙন লিখিনি কিছু, তবু শোনো বেজেছে আজান

বিপদসঙ্কেত শুনি, দেশভাগ, সীমান্তের মতো


তুমি কি আমার কেউ নও? শুধু মানচিত্র এঁকে

কারা যেন চলে গেছে সমুদ্রের গভীর সাগরে।


জীবনে অপর কেউ এসেছিল তবে সুনয়না?

এ বিবাহ ভেঙে গেলে, অন্য কোনও বিবাহ হবে না?

ছন্দ | শ্যামশ্রী রায় কর্মকার


দৈনন্দিন টিমটিম করে যাদের ভিটেতে 

দেওয়ালে দুঃখের ছোপ বাড়তে বাড়তে মহাকায় 

বান্ধব বলতে ছায়া, প্রেম বলতেও শরীর পেরিয়ে

তেমন কোথাও পৌঁছে যেতে পারেনি এখনও 

এমনই ভেবেছো তুমি, নিজেকে মহান ভেবে ভেবে 

ফুলে ফেঁপে উঠেছ যে, ডানাওয়ালা দানবের মতো 

তাদের আকাশে গিয়ে চক্রাকারে ঘুরে বারবার 

বলতে চেয়েছো, "দ্যাখো! চিনেছ কি আমার ক্ষমতা?"

তোমার পালক ওই উড়ে পড়ল তাদের জলে 

রুপোয় মোড়ানো, চিক চিক করে উঠলো সন্ধ্যায় 

ওরা তাকে চাঁদ ভেবে পাড়ে বসে কত না কাহিনি

বুনে তাতে সুখ-দুঃখ, ব্যর্থতাও মুড়েটুড়ে রেখে 

টলতে টলতে ঘরে চলে যাচ্ছে, পায়ে পায়ে মিল 

তুমিই একেলা, ভূত, পড়ে আছ, বর্তমান নেই 

ভবিষ্যৎ নেই, কেউ নেই ছন্দে ছন্দ মেলাবার

স্থগিত | প্রিয়াঙ্কা চৌধুরী

আমার সমস্ত লেখা, আমার সমস্ত না-লেখায় 

কেন যে বিষাদ আসে অগ্রণী ভূমিকা নিয়ে শুধু 

শূন্যতার উৎস খুঁজে হয়রান হয়ে গেছি কবে! 

তবুও সময়হীন এক মুহূর্ত শিরার ভিতর 

চিন্তাশূন্য হয়ে পড়ে মস্তিষ্ক। ধ্যান বলি তাকে 

শোক নেই। অশ্রু নেই। শ্রম নেই। অনুতাপ নেই 

পাথর সারাজীবন যত্রতত্র জমিয়েছি যত 

বিবিধ সম্পর্ক ঘিরে। নানাবিধ উদ্বেগে, উত্তাপে 

সমস্ত স্থগিত রেখে অহো, এই অনাকাঙ্ক্ষা ভোর 

তোমার কাছেই এসে অনুগত হাতটুকু পাতি...

তোমাকে জাগতে হবে | ঋদ্ধি পান

রাস্তার বুকে আঁকা আছে

গোপন দাবানল

চারিদিকে থিকথিক করছে পা

এবং হাতের আগুন

তোমাকে শেখার দিন

তোমাকে শেখানোর দিনক্ষণ

আজও ভুলি না

বারুদের গন্ধে মরে যাচ্ছে

গোটা খাতা,

খাতার কালিতে ডুবছে

শহর ও শহরতলি।

একটি নারীর জন্মদিনে

যেদিন সকলে আলো জ্বালবে

উৎসব ঝলসে উঠবে,

পৃথিবীর মোহমুক্তির পথ সেই দিন থেকে

হবে আঁকা

দুটি হাতের মেহেন্দির কারুকাজ

চোখের রক্তের থেকেও গাঢ়

কি প্রবল আর্তনাদ!

ভুলতে পারিনি যেদিন সে প্রত্যেকদিন

আমাকে ছেড়ে চলে যায়! 

Tuesday, September 17, 2024

বিনয় মজুমদার :: বাংলা কবিতার ধ্রুপদি আশ্রয়

আর অন্ধকার নয়, আর নয় অবাঞ্ছিত ছায়া। 

উন্মুক্ত স্বস্থানে স্থিত, বৃক্ষাবলি অধিক সংখ্যায়

ফুল, ফল পেয়ে থাকে, ফসলের উপচার পায়। 

এবার উন্মাদ হবো, অবশেষে উন্মত্ত নখরে

খুলে নেবো পলাতকা পরিটির ঠিকানা, দরজা। 

ইলোরার চিত্রাবলি, হরিণের মাংসের মতোন 

বিলম্বিত ব্যবহার পাবো আমি জিহ্বায়, জগতে, 

এরূপ বিরহী ভয় যথার্থই হয়েছে আমার।

তবে তুমি গুহাচিত্র, নিঃসন্দেহে দীর্ঘায়ু, সফল।

আর অন্ধকার নয়, আর নয় অবাঞ্ছিত ছায়া। 

Monday, September 16, 2024

কবিতার রোমান্টিসিজম ও বায়রনের নিলামী চিঠি :: শুচিস্মিতা দাস :: বান্ধবনগর


সম্প্রতি নিলাম হতে চলেছে মেজর জন কার্টরাইটকে লেখা বায়রনের চিঠি। চিঠিটি লেখা হয়েছিল ১৮১৩ সালে। গ্লস্টাশায়ারের একটি বাড়িতে পাওয়া গেছে এই চিঠি। জন কার্টরাইটের সঙ্গে একটি ব্যক্তিগত কাজে দেখা করার কথা ছিল বায়রনের কিন্তু শেষ মুহূর্তে তা বাতিল করে দেন বায়রন। চিঠিতে তিনি লেখেন:

'মহাশয়, 

অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে জানাচ্ছি, জরুরি কারণে আগামিকাল সকালেই আমাকে লন্ডন ছেড়ে চলে যেতে হবে। আপনার এবং স্যর এফ- এর সঙ্গে দেখা হবে জেনে যে আনন্দ পেয়েছিলাম হঠাৎ তাতে ব্যাঘাত ঘটল। আজ সকালেই আমি একটি ঘটনার কথা জানতে পারলাম। আমার এই পরিস্থিতির কথা আগে আপনাকে জানাতে পারিনি বলে আপনার কাছে ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি। 

ইতি ---

বায়রন'     

চোরলি’স নিলাম হাউস এই চিঠিটির দাম স্থির করেছে প্রায় ৭৫০০ পাউন্ড।

ট্রিনিটি কলেজ, কেম্ব্রিজ-এর পড়াশোনা শেষ করে যুবা বায়রনের ইচ্ছা হয় পৃথিবী ঘোরার। ১৮০৯ থেকে প্রায় দুবছর ভূমধ্যসাগরীয় নানা প্রদেশে ঘুরে বেড়িয়ে এসে লেখেন তাঁর ভ্রমণআলেখ্য ‘চাইল্ড হ্যারল্ড’স পিলগ্রিমেজ’--- যা খুব তাড়াতাড়িই সমাদৃত হয় ইয়োরোপের সাহিত্যমহলে। পাশাপাশি বায়রনের ব্যক্তিগত জীবনও ছিল বৈচিত্র্যময়। সৎ বোন অগাস্তার সঙ্গে জন্ম দেন একটি সন্তান।  বিবাহিত জীবনে অশান্তি। বন্ধুদের কাছে দেনা।  স্বাধীন জীবন যাপনের লক্ষ্যে ১৮১৬ সালে ইংল্যন্ড ছেড়ে চলে যান। ঘরছাড়া উন্নাসিক কবি প্রথম গ্রীষ্ম কাটাতে এলেন জেনেভাতে, কবি পিবি শেলী ও তাঁর স্ত্রী মেরি শেলীর সঙ্গে। সেখানেও সম্পর্কে জড়ালেন মেরির বোন ক্লেয়ার ক্লেয়ারমণ্টের সঙ্গে। ক্লেয়ারমণ্টের গর্ভে জন্ম নেয় বায়রনের আরেকটি সন্তান। এরপর দীর্ঘকাল ইতালিতে বসবাস করেন তিনি। কাব্য-সাহিত্য ছাড়াও তাঁর বিশেষ উৎসাহ ছিল তখনকার রাজনীতি ও সামরিক ক্রিয়াকলাপে। অটোমান সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে গ্রীক বিদ্রোহীদের আন্দোলনে সক্রিয় সমর্থন ছিল তাঁর। পারিবারিক সূত্রেই রাজনীতির সঙ্গে তাঁর পরিচয়। তাঁর পিতা জন বায়রন ছিলেন নৌবাহিনীর প্রধান সেনাপতি। এই নৌবাহিনীতেই বেশ কিছুকাল কাজ করেছিলেন ব্রিটিশ রাজনীতিজ্ঞ ও সমাজ সংস্কারক জন কার্টরাইট।   

‘রোমান্টিসিজম’ পশ্চিমা ভাবজগতের একটি বুদ্ধিবৃত্তিক ধারা। অষ্টাদশ শতকের শেষদিক থেকে শুরু হয়ে তখনের সাহিত্য, সঙ্গীত, চিত্রকলা ও স্থাপত্যে এক নতুন ঘরানার সূত্রপাত ঘটায় এই আন্দোলন। সেসময়ের সাধারণ ক্লাসিসিজম ও নব্য ক্লাসিসিজম-এর নিয়মানুবর্তিতা-সৌষ্ঠব-যৌক্তিকতা মানুষকে ক্লান্ত করে এনেছিল। নবজাগরণপ্রসূত ভৌত বস্তুবাদের বিপক্ষে এ ছিল  এক নতুন আলোকপ্রাপ্তি। সমাজবাদের বিরুদ্ধে ব্যক্তিবাদ ও প্রগাঢ় আবেগপ্রবণতাকে সঞ্চয় করে ‘রোমান্টিসিজম’-এর জাগরণ। উইলিয়াম ব্লেইক-কেই রোমান্টিক ভাবনার প্রথম অগ্রপথিক ভাবা হলেও মোট ছয়জন কবিকে নিয়ে ইংরেজি সাহিত্যের রোমান্টিক যুগ ধরা হয়। যাঁদের মধ্যে বিশেষ চর্চিত নাম--- লর্ড বায়রন।

বায়রনের বরাবরই ছিল চিঠি লেখার শখ। বারবার দেশবদল, ঠিকানাবদল হলেও বন্ধুদের হাতে পৌঁছে যেত চিঠি। কার্টরাইটকে লেখা চিঠিটির সূত্রে আমরা অন্য একটি তাৎপর্যপূর্ণ  চিঠির কথা এখানে উল্লেখ করি। চিঠিটি লিখেছিলেন বন্ধু শেলীকে।

'প্রিয় শেলী,

রেভানা, ২৬ এপ্রিল, ১৮২১

শিশুটি ভালোই আছে। তহবিলের অবস্থাও এখন মোটামুটি স্থির। শ্রীমতী শেলী আর তুমি আমার সিদ্ধান্তকে সমর্থন করেছ জেনে আমি স্বস্তি পেয়েছি। আমি শুনলাম, কীটস সম্পর্কে তুমি কী বলেছ--- অবশ্য যা শুনলাম সত্যিই কি তাই? সমালোচনা এমন মারাত্মক হওয়ার কী প্রয়োজন ছিল? কীটসের কবিত্ব নিয়ে তোমার-আমার চিরকালই মতভেদ ছিল। ওর এই অকারণ দুঃখসৃজন আমার পছন্দ নয়। এরচেয়ে যদি ও কবিতার মহানন্দময় উচ্চতায় পৌঁছতে পারত, সে-ও অনেক ভালো হত। হতভাগ্য কীটস! যদিও এই প্রবল আত্মমগ্নতা নিয়ে ও কতদূর ভালো থাকতে পারত, আমি জানি না। ‘কোয়ার্টালি’-তে ‘এন্ডিমিয়ন’-এর সমালোচনা পড়লাম। সুদীর্ঘ সমালোচনা। কিন্তু আজকাল পত্রপত্রিকায় এর চেয়েও ভালো সব সমালোচনা তো প্রকাশিত হয়।

জানো, আমার প্রথম কবিতাগুচ্ছেও এডিনবার্গের প্রভাব আমি বুঝতে পারি। কিন্তু তা ছিল রাগ, প্রতিরোধ ও অসন্তোষের কথা। কখনোই হতাশাকে আমি স্থান দিইনি। যদিও আমি জানি, এর কোনটাই কবিতা লেখার জন্য সুরম্য ভাবনা নয় কিন্তু এ অস্থির পরিবেশে যে লিখতে আসবে--- তার কলমে প্রতিরোধ আসবেই। কেবলমাত্র এবং কেবলমাত্রই প্রতিরোধের কথা লেখার জন্যই আমাদের কবিতা লেখা উচিত।

'জীবনে দুর্যোগ আছে,  যন্ত্রণা ও ভয়।

তবু এ জীবন শুধু তারই জন্য সমর্পিত নয়।'

আমাদের আশেপাশের বন্ধুদের মধ্যে মধ্যমানের কবিতাপ্রসবের যে ধারা শুরু হয়েছে, তা নিয়ে আমি সত্যিই চিন্তিত। তুমি এ-ও জানো তোমার কবিতা নিয়ে আমি গর্ব অনুভব করি। তোমার কবিতা প্রকারবিহীন। আমি ‘সেন্সি’ পড়েছি--- সব ঠিক আছে, কিন্তু এর মধ্যে  যেন হৃদয় বড় কম। না না, আমি আমাদের আগের প্রজন্মের অতিনাটকপ্রিয়তাকে সমর্থন করছি না। তোমার ‘সেন্সি’--- আর যাই হোক, নির্বিকার কবিতা নয়। যেমন আমার নাটক, কবিতা---সবই নিজের সঙ্গেই নিজেরই বিরোধের কথা বলে। জানো শেলী, তোমার সঙ্গে আমার সেই আত্মবিরোধেরই সম্পর্ক---তাতে আমি, আমার কবিতার মতোই মুক্ত। 

তোমার লেখা ‘প্রমিথিউস’ এখনও আমার কাছে এল না। কতদিন ধরে পড়ব বলে স্থির করে রেখেছি। আমার নিজের কোনো প্রকাশনার কথাও কিছু জানি না। শেষ, ওই পোপ-বিতর্ক নিয়ে একটি পুস্তিকা বের করেছিলাম। জানি, সেটা তুমি কোনোদিন পছন্দ করবে না। কিন্তু জানো, আমি যদি জানতাম কীটস আর নেই--- অথবা সে আছে কিন্তু এমন নিষ্প্রাণ অবস্থায়--- আমি ওর কবিতা নিয়ে  এমন কঠিন মন্তব্য করতাম না। ওর এই পোপকে আক্রমণ নিয়েই আমি এত বিরক্ত হয়েছিলাম। ইদানীং ওর লেখার ধরণ নিয়েও আমার খানিক অভিযোগ ছিল।

তুমি চাও আমি সবথেকে ভালো কবিতাটা লিখি, তাই না? এই ছাড়া অন্য কোনো উচ্চতা বা ক্ষমতার ইচ্ছা আমারও নেই। আমার তো বার্ধক্য আসবে শেলী, কিন্তু জীবন? – তাকে যে আমি স্বভাবগতভাবেই বড় ভালবাসি। জীবনের থেকে আমার প্রত্যাশা বাড়ছে শেলী। তাই অস্থিরতাও। তারপর, এই ইতালীয়দের অপদার্থতা আমাকে চারিদিক থেকে হতাশ করে ফেলেছে--- এর খানিকটা সামাজিক, আবার খানিকটা ব্যক্তিগতও। শ্রীমতী শেলীকে আমার ভালবাসা জানিও।

তোমার বন্ধু,

বায়রন

পুনশ্চ: সামনের গ্রীষ্মে একবার হুট করে আমাদের দেখা হতে পারে না? অথবা, তুমি একা, একদৌড়ে এখানে চলে আসতে পারো না?”

এরপর জেনেভাতে এল কত মনোরম গ্রীষ্ম। পাতা ঝরল। ‘রোমান্টিসিসম’ ইংরেজি সাহিত্য জগতের সবচেয়ে ক্ষণস্থায়ী যুগ হিসাবে আখ্যায়িত হল। অজস্র চিঠির পাতায় থমকে থাকল বায়রনের অসমাপ্ত ব্যক্তিজীবন, ইতালীয় সামরিক শক্তির প্রতি ক্ষোভ, প্রেমের কবিতা। এই আদ্যন্ত অযুক্তিবাদী প্রেমই রোমান্টিসিজম-এর মূল উপজীব্য। সচেতন ইন্দ্রিয়বাদের বিপক্ষে গিয়ে যা প্রাধান্য দেয় অবচেতনকে।  একের পর এক প্রেমে পড়েছেন বায়রন। ইতালীতে থাকাকালীন আবার প্রেমে পড়েন টেরেসা গীসিওলির সঙ্গে--- যিনি ছিলেন এক ইতালীয় সম্ভান্ত্রের স্ত্রী। সেসময়েই লেখা ইংরেজি সাহিত্যজগতে তাঁর সবচেয়ে বড় অবদান---‘ডন জুয়ান’। ১৮২৪ সালে প্রবল জ্বরে মারা যান বায়রন। শোকতপ্ত অনুগামীরা তাঁর শবদেহ নিয়ে আসেন ইংল্যন্ডে। নটিংহ্যামশায়ারে সেদিন এক ভালবাসার শোকস্তব্ধতা! ব্রিটিশ সমালোচকদের মতে তিনি লিখেছিলেন ‘সাংঘাতিক বিশুদ্ধ’ প্রেমের কবিতা। এই অসঙ্গতির উদযাপনেই যেন বেঁধে রেখেছিল এই মহান দুই কবিকে--- দাপটে চলেছিল অযৌক্তিকতার ‘রোমান্টিসিজম’।

Saturday, September 14, 2024

যোগ :: বিজয় সিংহ :: বান্ধবনগর

পক্ষীকুল ভোরে আর সেভাবে জাগে না, রাতভোরে 

আচার্যের প্রদক্ষিণ চলে চন্দ্র-করোটিকে ঘিরে 

যোগসিদ্ধহীন আমি রুদ্রাক্ষের ছায়া নিয়ে

দেখেছি আশ্চর্য সেই করোটিতে কত কত 

সৌরপ্রকাশ কত অশত্থের ছায়া কত আদানির জিভ 

বজ্রের থমথম আর

আই এম স্যাড টুডে আয়াম অন দ্যা ওয়ে'র নৈঃশব্দ্য


রবীন্দ্রগানের সূক্ষ্ম ও প্রসন্ন মীড়গুলি

উপড়িয়ে ছিলাম তথা বেলাফন্টের অনন্ত তথা আদানির নারীদের;

হেতু ভাগীরথী নয়, আমার পছন্দ শাদা ডুলুঙের যথাস্রোত যেখানে

না-সরস্বতীর হংসী কেলি করে


তার যোনিসন্ধি থেকে তুলি মূল

বেজন্মা ভাইরাস আর

স্তনসন্ধি জাগিয়েছি ত্রিদামিনীর চিনগারি এনে ফলে 

বেলাফন্টের উন্মাদ আমিই আর

রবীন্দ্রের মায়াবী কুহক আর

আদানির জিহ্বার অতিদীর্ঘতা


ফলত সমস্ত গুপ্ত মেটাফর ধারণ করেছে যত বিষ, গৌড়ীয় শৈলীরা তত

রুদ্রাক্ষের ছায়া নিয়ে প্রদক্ষিণ করে গেছে

দেবের চাতুর্য

দেবীলালের ঔরস, ম্লান

দেবীদের ওষ্ঠজাত সেইসব মনহুস ধ্বনি, যারা

উড়ে ছিল দূর সিন্ধুপারে, যারা

তারাদেশে অগ্নি ও পরাগ রেখেছিল 

প্রবন্ধ : ফজলুল করীম

মার্কিন সাম্রাজ্যের সাহিত্যিক ময়নাতদন্ত সাম্য রাইয়ান-এর উপন্যাস ‘সকল প্রশংসা মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের’ সমকালীন বাংলা সাহিত্যের এক অত্যন্ত সাহ...