সম্প্রতি নিলাম হতে চলেছে মেজর জন কার্টরাইটকে লেখা বায়রনের চিঠি। চিঠিটি লেখা হয়েছিল ১৮১৩ সালে। গ্লস্টাশায়ারের একটি বাড়িতে পাওয়া গেছে এই চিঠি। জন কার্টরাইটের সঙ্গে একটি ব্যক্তিগত কাজে দেখা করার কথা ছিল বায়রনের কিন্তু শেষ মুহূর্তে তা বাতিল করে দেন বায়রন। চিঠিতে তিনি লেখেন:
'মহাশয়,
অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে জানাচ্ছি, জরুরি কারণে আগামিকাল সকালেই আমাকে লন্ডন ছেড়ে চলে যেতে হবে। আপনার এবং স্যর এফ- এর সঙ্গে দেখা হবে জেনে যে আনন্দ পেয়েছিলাম হঠাৎ তাতে ব্যাঘাত ঘটল। আজ সকালেই আমি একটি ঘটনার কথা জানতে পারলাম। আমার এই পরিস্থিতির কথা আগে আপনাকে জানাতে পারিনি বলে আপনার কাছে ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি।
ইতি ---
বায়রন'
চোরলি’স নিলাম হাউস এই চিঠিটির দাম স্থির করেছে প্রায় ৭৫০০ পাউন্ড।
ট্রিনিটি কলেজ, কেম্ব্রিজ-এর পড়াশোনা শেষ করে যুবা বায়রনের ইচ্ছা হয় পৃথিবী ঘোরার। ১৮০৯ থেকে প্রায় দুবছর ভূমধ্যসাগরীয় নানা প্রদেশে ঘুরে বেড়িয়ে এসে লেখেন তাঁর ভ্রমণআলেখ্য ‘চাইল্ড হ্যারল্ড’স পিলগ্রিমেজ’--- যা খুব তাড়াতাড়িই সমাদৃত হয় ইয়োরোপের সাহিত্যমহলে। পাশাপাশি বায়রনের ব্যক্তিগত জীবনও ছিল বৈচিত্র্যময়। সৎ বোন অগাস্তার সঙ্গে জন্ম দেন একটি সন্তান। বিবাহিত জীবনে অশান্তি। বন্ধুদের কাছে দেনা। স্বাধীন জীবন যাপনের লক্ষ্যে ১৮১৬ সালে ইংল্যন্ড ছেড়ে চলে যান। ঘরছাড়া উন্নাসিক কবি প্রথম গ্রীষ্ম কাটাতে এলেন জেনেভাতে, কবি পিবি শেলী ও তাঁর স্ত্রী মেরি শেলীর সঙ্গে। সেখানেও সম্পর্কে জড়ালেন মেরির বোন ক্লেয়ার ক্লেয়ারমণ্টের সঙ্গে। ক্লেয়ারমণ্টের গর্ভে জন্ম নেয় বায়রনের আরেকটি সন্তান। এরপর দীর্ঘকাল ইতালিতে বসবাস করেন তিনি। কাব্য-সাহিত্য ছাড়াও তাঁর বিশেষ উৎসাহ ছিল তখনকার রাজনীতি ও সামরিক ক্রিয়াকলাপে। অটোমান সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে গ্রীক বিদ্রোহীদের আন্দোলনে সক্রিয় সমর্থন ছিল তাঁর। পারিবারিক সূত্রেই রাজনীতির সঙ্গে তাঁর পরিচয়। তাঁর পিতা জন বায়রন ছিলেন নৌবাহিনীর প্রধান সেনাপতি। এই নৌবাহিনীতেই বেশ কিছুকাল কাজ করেছিলেন ব্রিটিশ রাজনীতিজ্ঞ ও সমাজ সংস্কারক জন কার্টরাইট।
‘রোমান্টিসিজম’ পশ্চিমা ভাবজগতের একটি বুদ্ধিবৃত্তিক ধারা। অষ্টাদশ শতকের শেষদিক থেকে শুরু হয়ে তখনের সাহিত্য, সঙ্গীত, চিত্রকলা ও স্থাপত্যে এক নতুন ঘরানার সূত্রপাত ঘটায় এই আন্দোলন। সেসময়ের সাধারণ ক্লাসিসিজম ও নব্য ক্লাসিসিজম-এর নিয়মানুবর্তিতা-সৌষ্ঠব-যৌক্তিকতা মানুষকে ক্লান্ত করে এনেছিল। নবজাগরণপ্রসূত ভৌত বস্তুবাদের বিপক্ষে এ ছিল এক নতুন আলোকপ্রাপ্তি। সমাজবাদের বিরুদ্ধে ব্যক্তিবাদ ও প্রগাঢ় আবেগপ্রবণতাকে সঞ্চয় করে ‘রোমান্টিসিজম’-এর জাগরণ। উইলিয়াম ব্লেইক-কেই রোমান্টিক ভাবনার প্রথম অগ্রপথিক ভাবা হলেও মোট ছয়জন কবিকে নিয়ে ইংরেজি সাহিত্যের রোমান্টিক যুগ ধরা হয়। যাঁদের মধ্যে বিশেষ চর্চিত নাম--- লর্ড বায়রন।
বায়রনের বরাবরই ছিল চিঠি লেখার শখ। বারবার দেশবদল, ঠিকানাবদল হলেও বন্ধুদের হাতে পৌঁছে যেত চিঠি। কার্টরাইটকে লেখা চিঠিটির সূত্রে আমরা অন্য একটি তাৎপর্যপূর্ণ চিঠির কথা এখানে উল্লেখ করি। চিঠিটি লিখেছিলেন বন্ধু শেলীকে।
'প্রিয় শেলী,
রেভানা, ২৬ এপ্রিল, ১৮২১
শিশুটি ভালোই আছে। তহবিলের অবস্থাও এখন মোটামুটি স্থির। শ্রীমতী শেলী আর তুমি আমার সিদ্ধান্তকে সমর্থন করেছ জেনে আমি স্বস্তি পেয়েছি। আমি শুনলাম, কীটস সম্পর্কে তুমি কী বলেছ--- অবশ্য যা শুনলাম সত্যিই কি তাই? সমালোচনা এমন মারাত্মক হওয়ার কী প্রয়োজন ছিল? কীটসের কবিত্ব নিয়ে তোমার-আমার চিরকালই মতভেদ ছিল। ওর এই অকারণ দুঃখসৃজন আমার পছন্দ নয়। এরচেয়ে যদি ও কবিতার মহানন্দময় উচ্চতায় পৌঁছতে পারত, সে-ও অনেক ভালো হত। হতভাগ্য কীটস! যদিও এই প্রবল আত্মমগ্নতা নিয়ে ও কতদূর ভালো থাকতে পারত, আমি জানি না। ‘কোয়ার্টালি’-তে ‘এন্ডিমিয়ন’-এর সমালোচনা পড়লাম। সুদীর্ঘ সমালোচনা। কিন্তু আজকাল পত্রপত্রিকায় এর চেয়েও ভালো সব সমালোচনা তো প্রকাশিত হয়।
জানো, আমার প্রথম কবিতাগুচ্ছেও এডিনবার্গের প্রভাব আমি বুঝতে পারি। কিন্তু তা ছিল রাগ, প্রতিরোধ ও অসন্তোষের কথা। কখনোই হতাশাকে আমি স্থান দিইনি। যদিও আমি জানি, এর কোনটাই কবিতা লেখার জন্য সুরম্য ভাবনা নয় কিন্তু এ অস্থির পরিবেশে যে লিখতে আসবে--- তার কলমে প্রতিরোধ আসবেই। কেবলমাত্র এবং কেবলমাত্রই প্রতিরোধের কথা লেখার জন্যই আমাদের কবিতা লেখা উচিত।
'জীবনে দুর্যোগ আছে, যন্ত্রণা ও ভয়।
তবু এ জীবন শুধু তারই জন্য সমর্পিত নয়।'
আমাদের আশেপাশের বন্ধুদের মধ্যে মধ্যমানের কবিতাপ্রসবের যে ধারা শুরু হয়েছে, তা নিয়ে আমি সত্যিই চিন্তিত। তুমি এ-ও জানো তোমার কবিতা নিয়ে আমি গর্ব অনুভব করি। তোমার কবিতা প্রকারবিহীন। আমি ‘সেন্সি’ পড়েছি--- সব ঠিক আছে, কিন্তু এর মধ্যে যেন হৃদয় বড় কম। না না, আমি আমাদের আগের প্রজন্মের অতিনাটকপ্রিয়তাকে সমর্থন করছি না। তোমার ‘সেন্সি’--- আর যাই হোক, নির্বিকার কবিতা নয়। যেমন আমার নাটক, কবিতা---সবই নিজের সঙ্গেই নিজেরই বিরোধের কথা বলে। জানো শেলী, তোমার সঙ্গে আমার সেই আত্মবিরোধেরই সম্পর্ক---তাতে আমি, আমার কবিতার মতোই মুক্ত।
তোমার লেখা ‘প্রমিথিউস’ এখনও আমার কাছে এল না। কতদিন ধরে পড়ব বলে স্থির করে রেখেছি। আমার নিজের কোনো প্রকাশনার কথাও কিছু জানি না। শেষ, ওই পোপ-বিতর্ক নিয়ে একটি পুস্তিকা বের করেছিলাম। জানি, সেটা তুমি কোনোদিন পছন্দ করবে না। কিন্তু জানো, আমি যদি জানতাম কীটস আর নেই--- অথবা সে আছে কিন্তু এমন নিষ্প্রাণ অবস্থায়--- আমি ওর কবিতা নিয়ে এমন কঠিন মন্তব্য করতাম না। ওর এই পোপকে আক্রমণ নিয়েই আমি এত বিরক্ত হয়েছিলাম। ইদানীং ওর লেখার ধরণ নিয়েও আমার খানিক অভিযোগ ছিল।
তুমি চাও আমি সবথেকে ভালো কবিতাটা লিখি, তাই না? এই ছাড়া অন্য কোনো উচ্চতা বা ক্ষমতার ইচ্ছা আমারও নেই। আমার তো বার্ধক্য আসবে শেলী, কিন্তু জীবন? – তাকে যে আমি স্বভাবগতভাবেই বড় ভালবাসি। জীবনের থেকে আমার প্রত্যাশা বাড়ছে শেলী। তাই অস্থিরতাও। তারপর, এই ইতালীয়দের অপদার্থতা আমাকে চারিদিক থেকে হতাশ করে ফেলেছে--- এর খানিকটা সামাজিক, আবার খানিকটা ব্যক্তিগতও। শ্রীমতী শেলীকে আমার ভালবাসা জানিও।
তোমার বন্ধু,
বায়রন
পুনশ্চ: সামনের গ্রীষ্মে একবার হুট করে আমাদের দেখা হতে পারে না? অথবা, তুমি একা, একদৌড়ে এখানে চলে আসতে পারো না?”
এরপর জেনেভাতে এল কত মনোরম গ্রীষ্ম। পাতা ঝরল। ‘রোমান্টিসিসম’ ইংরেজি সাহিত্য জগতের সবচেয়ে ক্ষণস্থায়ী যুগ হিসাবে আখ্যায়িত হল। অজস্র চিঠির পাতায় থমকে থাকল বায়রনের অসমাপ্ত ব্যক্তিজীবন, ইতালীয় সামরিক শক্তির প্রতি ক্ষোভ, প্রেমের কবিতা। এই আদ্যন্ত অযুক্তিবাদী প্রেমই রোমান্টিসিজম-এর মূল উপজীব্য। সচেতন ইন্দ্রিয়বাদের বিপক্ষে গিয়ে যা প্রাধান্য দেয় অবচেতনকে। একের পর এক প্রেমে পড়েছেন বায়রন। ইতালীতে থাকাকালীন আবার প্রেমে পড়েন টেরেসা গীসিওলির সঙ্গে--- যিনি ছিলেন এক ইতালীয় সম্ভান্ত্রের স্ত্রী। সেসময়েই লেখা ইংরেজি সাহিত্যজগতে তাঁর সবচেয়ে বড় অবদান---‘ডন জুয়ান’। ১৮২৪ সালে প্রবল জ্বরে মারা যান বায়রন। শোকতপ্ত অনুগামীরা তাঁর শবদেহ নিয়ে আসেন ইংল্যন্ডে। নটিংহ্যামশায়ারে সেদিন এক ভালবাসার শোকস্তব্ধতা! ব্রিটিশ সমালোচকদের মতে তিনি লিখেছিলেন ‘সাংঘাতিক বিশুদ্ধ’ প্রেমের কবিতা। এই অসঙ্গতির উদযাপনেই যেন বেঁধে রেখেছিল এই মহান দুই কবিকে--- দাপটে চলেছিল অযৌক্তিকতার ‘রোমান্টিসিজম’।