বিশ্বস্ত কিছু কথার পাশে
চড়ুই বাসা বাঁধছিল অনেকটা পূজার ডালার ছোট্ট ঝুড়ির মতো
উঠোন বাগানের টগর গাছের চার ডালের পাতায় ঘেরা মাঝের সুরক্ষিত
জায়গার বেষ্টনিতে, প্রথমটা বুঝতে পারিনি, স্বাভাবিক
স্ত্রী দেখিয়েছিল, দেখেছো কি ছোট্ট নিরাপদ বাসা বানিয়েছে চড়ুই পাখিটি
ডিম পাড়বে বলে, মা হবে তো ! বুঝলে, মায়েদের কত যত্ন চিন্তা থাকে মনে
ভাবলাম, সত্যিই তো, পাখি মা, মানুষ মা,পশু মা সব মা এমন যত্নশীল আর
স্নেহশীলা হন সন্তানের জন্য, যেমন দেখেছি রমলাকে বুম্বা হবার সময়
মাতৃত্বকালীন যন্ত্রণা মায়েরাই ভোগ করেন। কষ্ট এবং অপার সুখও, সব
সবটাই মায়েদের, সেখানে পুরুষরা কোথায় !
একটি ফুলের পাশে
কয়েক ঘন্টা আগেও কুঁড়ি ছিল। ছোট্ট কুঁড়ি। নাজুক ও ভীরু
লাল ফ্রকের মেয়ে কিতকিত খেলত ধান শুকানোর পাশে হারিয়ে গেল দুপুর
মেয়েবেলা, পুরো ফুল হওয়া হলনা আর ওর
যন্ত্রণা হচ্ছিল, ওরা বুঝল না। পট পট পাঁপড়ি ছিঁড়ে ফেলল ওর ঐ কুঁড়ির
কেন এমন হয়, মন নেই কোনো!বাঘের মতো খিদে। লালা ! বড় অমানুষ।
চিরাচরিতের পাশে
যেখানে বুকের খুব নরম অংশ সেখানে একবার আঘাত লাগলে ভয়ানক
সেপটিসেমিয়া ডাক্তারি পরিভাষায় সহজে সারার নয়
রাধার হয়েছিল কৃষ্ণের মথুরা চলে যাবার পর এ সত্য বুঝেছিল অষ্টসখিরা
আমরা বুঝিনি
না বোঝার কারণ , আমাদের রক্ত মাংসে ক্রিয়াশীল উদগ্ৰ কাম পাপ বোধ
এর বাইরে বেরিয়ে আসতে পারিনি , এতবছর পরেও
জীবাত্মার পরমাত্মার মিলনে প্রেমের প্রকৃত পরাকাষ্ঠা
শরীর সেখানে একটি মাধ্যম মাত্র
চিন্ময়ী সত্তার হ্লাদিনী রাধার প্রেমই কৃষ্ণের সেই সৎ চিৎ আনন্দ স্বরূপ
অপমানিতের পাশে
ঘটনার আকস্মিকতায় হতভম্ব হয়ে পড়াটা একটা রোগের লক্ষণ মাত্র
সুতো ছিঁড়তেই যে যার মতো সওদা করতে বেরিয়ে পড়ে, তাদের থলির
আকার দেখবার মতো। তাক লাগানো তালিতাপ্পা
শহরের বিভিন্ন গ্যালারিতে অতি উৎসাহী জনের হাততালিতে সরগরম
আমরা বিকিয়ে যাই।বিকোনো অত্যন্ত সহজ পদ্ধতি। এ বিষয়ে বেশি কিছু
না বলাই ভালো। গুনীজনেরা ঠিক বলবেন । অপেক্ষা করি
সরলমতি মানুষেরা জটিল হয়ে উঠতে পারে ভাবিনি। চারদিকে কত ক্লেদ
টুকরো টুকরো ছবির পাশে
গতকাল একটি পেরেক পায়ে ফুটেছিল রক্ত ঝরছিল খুব। ব্যাথা রাত ভোর
ঘুমোতে দেয়নি উল্টো পাল্টা স্বপ্নে কালঘাম ছুটিয়ে ছেড়েছে
তারপর, নটে গাছ মুড়োনোর গল্প
দিনভর ছুটের সাম্রাজ্য মিনার সংস্কৃতি আর ঝাঁ চকচক দাঁতের বিজ্ঞাপন
চিবই না গিলি, বুঝতে বুঝতে সন্ধ্যার নৌকায় মগনলালের সভায় সটান

সময়ের দর্পণে এক সংবেদনশীল সত্তার পরিচয়
ReplyDeleteতৈমুর খান
-----------------------------------------------------------------------------
কবিতা যখন কেবল ছন্দের কারুকাজ না হয়ে ব্যক্তি ও সমাজের ক্ষতবিক্ষত প্রান্তের সাক্ষী হয়ে ওঠে, তখন কবির অবস্থান নির্দিষ্ট কোনো বলয়ে আটকে থাকে না। মৃণালেন্দু দাশের পাঁচটি কবিতার এই গুচ্ছটি লক্ষ করলে দেখা যায়, প্রতিটি কবিতার শিরোনামের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে ‘পাশে’ শব্দটি। এই ‘পাশে’ থাকা কেবল নীরব দর্শকের নয়, বরং এটি এক গভীর সহমর্মিতা, নৈর্ব্যক্তিক পর্যবেক্ষণ এবং সামাজিক দায়বদ্ধতার সম্মিলিত অঙ্গীকার। প্রকৃতির চিরন্তন সারল্য থেকে শুরু করে নাগরিক জীবনের ক্লেদাক্ত জটিলতা পর্যন্ত কবির যাত্রা এখানে এক অখণ্ড জীবনভাষ্য রচনা করেছে।
সংকলনের প্রথম কবিতা ‘বিশ্বস্ত কিছু কথার পাশে’ বিশ্বপ্রকৃতির এক শাশ্বত নিয়মের কথা বলে। উঠোনের টগর গাছে চড়ুইয়ের নিপুণ ও সুরক্ষিত বাসা তৈরির দৃশ্য কবির চোখে কেবল পাখিজগতের বৃত্ত নয়, তা সমগ্র জীবজগতের মাতৃত্বের মহিমাকে উন্মোচিত করে। কবি এখানে পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টির সীমাবদ্ধতা স্বীকার করে নিয়েছেন বিনম্রভাবে। গর্ভধারণ, তীব্র প্রসববেদনা এবং সন্তানকে ঘিরে অপরিসীম যে অপার্থিব আনন্দ—তার পূর্ণ অংশীদার কেবল নারীই। সৃষ্টির এই চূড়ান্ত দায়ভার ও স্নেহের সমীকরণে পুরুষ যে প্রান্তিক এক চরিত্র, কবির এই সততাপূর্ণ উপলব্ধি কবিতাটিকে প্রচলিত পারিবারিক অনুভূতির ঊর্ধ্বে এক দার্শনিক মাত্রায় উন্নীত করেছে।
প্রকৃতির এই সুরক্ষাবোধ পরক্ষণেই চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যায় দ্বিতীয় কবিতা ‘একটি ফুলের পাশে’-তে এসে। কবি এখানে সমাজের সবচেয়ে অন্ধকার ও হিংস্র বাস্তবতাকে প্রত্যক্ষ করেছেন। যে শৈশব ছিল লাল ফ্রক পরে উঠোনে কিতকিত খেলার আনন্দে চঞ্চল, তাকে গ্রাস করে নেয় একদল অমানুষের পাশবিক ক্ষুধা। কুঁড়ি ফুটে ফুল হওয়ার আগেই ছিঁড়ে ফেলা পাঁপড়ির মতো এক অবোধ শিশুকন্যার অপমৃত্যু ঘটে লালসার বলি হয়ে। প্রকৃতির যে স্বাভাবিক বিকাশ ও সুরক্ষা প্রথম কবিতায় দেখা গিয়েছিল, এই কবিতায় মানুষের পশুপ্রবৃত্তির কারণে তা বীভৎসভাবে বিপর্যস্ত। নিষ্পাপ সৃষ্টির ওপর এই আঘাত কবির বিবেককে প্রবলভাবে নাড়া দেয় এবং সমাজের অন্তঃসারশূন্যতাকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়।
তৃতীয় কবিতা ‘চিরাচরিতের পাশে’ কবির দৃষ্টিকে পার্থিব বর্বরতা থেকে উন্নীত করে এক গভীর আধ্যাত্মিক জিজ্ঞাসায়। সমাজ যখন স্থূল দেহজ কামুকতায় লিপ্ত, কবি তখন প্রেমের প্রকৃত নির্যাস খুঁজতে ফিরে যান প্রাচীন বৈষ্ণবীয় দর্শনে। মানুষের হৃদয়ের ক্ষতকে তিনি তুলনা করেছেন নিরাময়হীন সেপটিসেমিয়ার সঙ্গে—যার তীব্রতা রাধা অনুভব করেছিলেন কৃষ্ণের বিরহে। আধুনিক মানুষ স্থূল কাম ও পাপবোধের বেড়াজালে বন্দি থাকায় এই প্রেমের গভীরতা অনুধাবনে ব্যর্থ। কবির চোখে শরীর কেবল একটি সংযোগকারী মাধ্যম মাত্র; প্রেমের পরম পরাকাষ্ঠা মূলত জীবাত্মা ও পরমাত্মার সেই চিরন্তন মিলনে, যেখানে রাধার হ্লাদিনী শক্তিই কৃষ্ণের সৎ-চিৎ-আনন্দের স্বরূপ হয়ে আত্মপ্রকাশ করে।
পরের দুটি কবিতায় আধ্যাত্মিকতার ক্ষেত্র ছেড়ে কবি প্রবেশ করেন সমকালীন সমাজের বিকিকিনির হাটে। ‘অপমানিতের পাশে’ কবিতায় ধরা পড়ে আদর্শহীন সুবিধাবাদের উল্লাস। মানুষের সরলতা হারিয়ে যাচ্ছে, সামান্য সংকটের সুতো ছিঁড়তেই স্বার্থপরতার থলি নিয়ে নেমে পড়ছে তথাকথিত সুবিধাভোগী শ্রেণি। গ্যালারির কৃত্রিম করতালি আর নিজেকে সহজে বিকিয়ে দেওয়ার এই প্রতিযোগিতায় কবি স্তব্ধ ও ব্যথিত। চারপাশের এই আত্মিক স্খলন ও ক্লেদ কবির সংবেদনশীল মনকে ক্লান্ত করে তোলে।
এই ক্লান্তি চূড়ান্ত রূপ পায় শেষ কবিতা ‘টুকরো টুকরো ছবির পাশে’-তে। ব্যক্তিগত শারীরিক যন্ত্রণা (পায়ে পেরেক ফোটা) থেকে শুরু করে নাগরিক জীবনের ফাঁপা বিজ্ঞাপন, সুউচ্চ মিনারের অহংকার আর বিরামহীন ইঁদুরদৌড়—সব মিলিয়ে আধুনিক জীবন এক অন্তহীন প্রহসনে পর্যবসিত। রূপকথার সেই পরিচিত শান্ত উপসংহার বা ‘নটে গাছটি মুড়োনো’ আর বাস্তবে ঘটে না; বরং জীবন গিয়ে আটকে পড়ে জটিল চক্রান্ত ও শোষণের প্রতীক ‘মগনলালের সভায়’।
মৃণালেন্দু দাশের এই পাঁচটি কবিতা বিচ্ছিন্ন কোনো অনুভূতির প্রকাশ নয়, বরং সামগ্রিকভাবে মানুষের অস্তিত্বসংকটের এক সুসংহত পথপরিক্রমা। প্রকৃতি ও মাতৃত্বের প্রতি নিবিড় ভক্তি দিয়ে যে যাত্রার শুরু, তা একে একে পার হয়েছে অমানবিক অবক্ষয়, দর্শনের উত্তরণ এবং সামাজিক মিথ্যার চোরাবালি। শেষ পর্যন্ত কবির সংবেদনশীল সত্তা দাঁড়িয়ে থাকে সেই বিভ্রান্ত আধুনিক মানুষের পাশে, যে নিজের সত্তাকে হারিয়ে প্রতিদিন নাগরিক যন্ত্রের চাকার তলায় পিষ্ট হচ্ছে। এই সত্যনিষ্ঠ পর্যবেক্ষণই সমগ্র কাব্যগুচ্ছটিকে একটি সার্থক সামাজিক ও দার্শনিক নিদর্শনে রূপান্তরিত করেছে।