Tuesday, September 8, 2026
গুচ্ছ কবিতা : মৃণালেন্দু দাশ
গুচ্ছ কবিতা : তনুশ্রী কার্তিক
শান্ত বিরতি
যতবার পথের কথা উঠেছে,
ততবার এসেছে পথিকের কথা,
হেমন্তকালের কথা—
কেউ কেউ গন্তব্যে পৌঁছেছে,
কেউ কালের ভিতরেই রেখে গেছে
তার সমস্ত যাত্রা।
ফিরে আসা অসম্ভব এক পথের নাম।
একবার পথ মুছে গেলে
চরণ অবলুপ্ত হয়ে যাবে—
তবুও আমরা অনুপস্থিতির দিকেই পথ হাঁটি—
যেন জন্ম থেকেই বিদায়ের দিকে সমস্ত পথরেখা টানা ছিল; যাকে গন্তব্য বলে ভুল করি প্রতিদিন,
তা আসলে এক ছায়াবৃত শান্ত বিরতি—
যেখানে পৌঁছে সমস্ত নাম মুছে যায়
শূন্য পথের উপর হেমন্তের বাতাস
চিরকাল কাঁপতে থাকে...
নিঃশব্দ পদাবলী
কখনো কখনো কোনো ফুলের গন্ধ
আমাকে অকারণ বিষণ্ন করে তোলে।
কোনো কোনো সন্ধ্যার ধীর আলো
আমার নাম মুছে দেয়।
শরীরে তখন কেবল জ্বর আসে;
যেন বহু জন্মান্তরের ভুলে যাওয়া কোনো বসন্তের দাহ,
যেন-বা কোনো নিভে যাওয়া চাঁদের আলো
আবার নিঃশব্দে জেগে উঠেছে আমার রক্তের ভিতর।
অন্ধকার নিজের উৎসের নাম ধরে
অনন্তের ভেতর মাথা ঠুকে মরে—
নিঃশব্দ পদাবলীতে রাখি অনাহত বাঁশি—
যে সুর কোনোদিন বাজানো হয়নি,
তবু রাতের বাতাস তার আশ্রিত হয়ে ওঠে...
শেষপর্যন্ত সব নাম ঝরে যায়...
কিছু আলো মুছে যায় এই মর্ত্যের ধুলায়—
যদি রক্তে আবার দোলা দেয়
বহুজন্মের সেই অলৌকিক বিষাদ,
যদি কোনো ফুলের সুগন্ধে
কোনো বিস্মৃত কান্না জেগে ওঠে—
তবে এই আমার শেষ চরণ।
শূন্যভরা শ্লেট
প্রথমবেলায় বাবার মুখে মুখে একেচন্দ্র আওড়েছি
শ্লেট ভরিয়েছি শূন্য লিখে—
কাল রাতে বাবা জানালার কাছে এসেছিল।
হাওয়ায় চোখ বুজে আসছিল আমার
জানালার ওপারের অন্ধকার নীরবে আমার শৈশব ফিরিয়ে আনছিল
বহুদিন আগে যে হাত আমার কপালে ঘুম এঁকে দিত, সেই হাত এখনও রাতের ভেতর দিয়ে হেঁটে আসে।
আকাশে তারা ছিল না। কেবল পাতা নড়ছিল অল্প অল্প।
মনে হচ্ছিল, গাছেরা বিদায়ের ভাষা জানে; তাই তারা এত কম শব্দ করে।
দেয়ালের ছায়া দীর্ঘ হয়ে আমার শৈশবের পাশে এসে বসেছিল।
কোথাও কোনো শব্দ ছিল না—
শুধু নিঃশ্বাসের মতো
একটু একটু করে গভীর হচ্ছিল রাত্রি...
অন্ধকার হাতড়ে শ্লেট খুঁজি—
একটি জানালা সারারাত খোলা থাকে,
অন্ধকারের ভিতর একটি শিশু বাবার কণ্ঠস্বর ধরে
একেচন্দ্র আওড়াতে থাকে।
নীলনকশা
যখনই দূরে কোথাও যাওয়ার কথা ভাবি,
সমস্ত পথ আমার মুখোমুখি এসে দাঁড়ায়—
নতুন শহর, নতুন নদী, নতুন আকাশ
আরও দূরের দিকে ইশারা করে।
প্রতিটি স্বপ্নের পাশে বসে থাকে—
একটি শীতল শ্মশান।
ধোঁয়ার ভিতর হারিয়ে যেতে যেতে
সে যেন আমার শেষ যাত্রা এঁকে রাখে।
জানি না, কোন পথে গেলে ফিরে আসা যায়,
কোন নদী পার হলে মানুষ নিজেকেই হারায়।
একটি অদৃশ্য বিদায় জন্মের পর থেকেই
আমার পাশে পাশে হাঁটে—
কখনও ছায়া হয়ে,কখনও বাতাসে
ভেসে আসা কোনো পুরোনো গন্ধ হয়ে,
কখনও অকারণে থেমে যাওয়া
একটি বিকেলের মতো।
যত দূরে যাই,
তত গভীরে নিজেরই অনুপস্থিতির দিকে নামি।
প্রতিটি পথ আমাকে আমার কাছ থেকে
একটু একটু করে সরিয়ে দেয়।
তবু আমি আরও একবার দূরের দিকে তাকাব—
পাখি উড়ে যাক,
নদী তার জল নিয়ে যাক বহুদূরে।
সময়ের অনুরণনটুকু থেমে গেলে,
সমস্ত পথ অন্ধকারের দিকে নেমে যাবে।
নীলনকশা
যখনই দূরে কোথাও যাওয়ার কথা ভাবি,
সমস্ত পথ আমার মুখোমুখি এসে দাঁড়ায়—
নতুন শহর, নতুন নদী, নতুন আকাশ
আরও দূরের দিকে ইশারা করে।
প্রতিটি স্বপ্নের পাশে বসে থাকে—
একটি শীতল শ্মশান।
ধোঁয়ার ভিতর হারিয়ে যেতে যেতে
সে যেন আমার শেষ যাত্রা এঁকে রাখে।
জানি না, কোন পথে গেলে ফিরে আসা যায়,
কোন নদী পার হলে মানুষ নিজেকেই হারায়।
একটি অদৃশ্য বিদায় জন্মের পর থেকেই
আমার পাশে পাশে হাঁটে—
কখনও ছায়া হয়ে,কখনও বাতাসে
ভেসে আসা কোনো পুরোনো গন্ধ হয়ে,
কখনও অকারণে থেমে যাওয়া
একটি বিকেলের মতো।
যত দূরে যাই,
তত গভীরে নিজেরই অনুপস্থিতির দিকে নামি।
প্রতিটি পথ আমাকে আমার কাছ থেকে
একটু একটু করে সরিয়ে দেয়।
তবু আমি আরও একবার দূরের দিকে তাকাব—
পাখি উড়ে যাক,
নদী তার জল নিয়ে যাক বহুদূরে।
সময়ের অনুরণনটুকু থেমে গেলে,
সমস্ত পথ অন্ধকারের দিকে নেমে যাবে।
Monday, September 7, 2026
গুচ্ছ কবিতা : আপন রায়
কবিতা
১.
কোন কোন রাতে চাঁদের বুক থেকে ভেসে
আসে মোহনীয় জ্যোৎস্নার সুর
অথবা ছলনা চাঁদের
ডানা ভেঙে গেলে যন্ত্রণা সুর হয়ে ওঠে
শুঁয়োপোকা উড়ে যায় প্রজাপতি সুরে
সব হয়ে ওঠার পাশে না-হওয়াদের কঙ্কাল
পড়ে থাকে
পচনশীল সমস্তকিছুই ক্ষয়ে যায়
কবিতা বলতে আমি মেরুদণ্ডকেই বুঝি
২.
তরঙ্গের দোলনায় দুলে ওঠে চাঁদ
তোমার বুকে ও কিসের ক্ষত
সংক্রামক
হাত ফসকে যাওয়া আয়নায়
মুখ দেখছে অনাগত কেউ
সুপ্রাচীন ঢেউ তার বুকে
যেন সিনেমা শেষের বহুদূরে কেউ
বলে চলেছে সিনেমার সংলাপ
৩.
মানুষ অথবা মেঘ, জুম করলে, স্পষ্ট হয়ে ওঠে জল...
মৃতের কাজ শুয়ে থাকা, চুপচাপ শুয়ে থাকা
জীবিত, অন্তত কবর ভেঙে বেরোতে চাইবে
চাঁদ এক কালো সরোবর
জ্বলে ওঠে কোন কোন রাতে
যেমন কোন কোনদিন
কারো নীল শাড়ি বেশিই আকর্ষণ করে
সুখ, দুঃখ, বিষণ্ণতা, যুদ্ধ, স্থিতির ট্র্যাফিক পেরিয়ে
সব পথ ঘুরেফিরে তোমার দিকে যায়
গভীরে এখনও অন্ধকার
৪.
তুমি, বিসর্জনের পর শূন্য মন্দির
কান্নার পাহাড় ঠেলে চৈতন্যে ফেরো
সব স্মৃতিই নিজেকে ভাসিয়ে দেয়া
দূরে, দূরে যাওয়া যায় না নিজেকে ফেলে
শুধু, এই ভ্রমণ থেকে নেমে যাবার জন্য
আমরা খুঁজি একটি স্টেশন
যখন সব আলো নিভে যায়, কোথাও
জ্বলে ওঠে ছোট্ট জোনাকি
দূর ও কাছের সীমান্তে নক্ষত্র খসে যায়
আমাদের পথ স্বপ্ন ও যন্ত্রণার...
৫.
তুলনামূলক শক্ত লোহায় বর্শা বিঁধে না
এমন সহজ টানে নামালে যেন প্রস্তুত হয়েই
ছিলাম
অথচো খসে পড়া পাতার দুঃখ সান্ত্বনাহীন
নাম ভূমিকা থেকে নামহীনতার পথে
কেউ কেউ বেশিই ভ্রাম্যমাণ
আলো, বাতাস, তাপ, জল, জোছনা, অন্ধকারসহ
পতনসম্পর্কিত সূত্র ও দৃশ্য খেয়েই বেঁচে থাকে
শাসকের বুলেটছোঁয়া রক্তফোঁটা আর
জ্বলে ওঠা প্রতিটি জোনাকিও কবিতা।
গুচ্ছ কবিতা : শাশ্বত ভট্টাচার্য
আকাশ ভেঙে
তোমার কথা মনে করলেই
দেখি
বৃষ্টি হচ্ছে আজকাল...
অবাক লাগছে কতটা মনে করছি
কাল যে মেঘে জমেছিল দুপুর
এখন তাই
বৃষ্টি হয়ে ঝরে পড়ছে...
ঘর
ঠান্ডা হয়ে এলে
যেটুকু থেকে যায়
সবটাই ঘোর
মেঘ যতটুকু দুর
বৃষ্টি ততটাই
তার কাছাকাছি ...
দুপুর
ঝিরি পাতা রোদ গায়ে এসে লাগে
সরাসরি হয়ে যায়
আমাদের যোগাযোগ
গাছতলায় দাঁড়াই ,
দালানে অনেক রং করা হচ্ছে
হাওয়া যেদিকে বইছে ,
আমরা সেদিকে পিঠ দেই ,
আলো নরম হয়ে এলে
শান বাঁধানো পুকুর ঘাটে
পাখিরা জড়ো হয়।
আরোগ্য
নিমগাছের যেটুকু সম্বল
সবটাই ঔষধি
অথচ মানুষ তাকে শুধুই
তেতো করে রেখেছে
ইচ্ছে করলেই কি
পাখিদের মতো আর উড়ে যাওয়া যায় ?
ভাবতে ভাবতে
সবুজ পেতে সে রয়ে গেল একা
শিকড়ের টানে সে
মধ্যবিত্ত
নালিশহীন...
শিল্পী
যতটুকু মেঘ করলে মনটা ভরে যায়
ততটুকু মেঘ দেখা হবে
তোমার আমার কাছাকাছি চলে আসা
এক প্রকার অনুলিখন
কেউ হয়ত লেখে রেখেছে
তোমার আমার এক প্রকার
থাকা।
বাবুই পাখির বাসা ভাড়া নিয়েছি
সংসার পাতাবো
তারপর উড়ে যাবো বাসা ছেড়ে
লোক দেখতে আসবে
আমাদের ছিটমহল....
মেঝে
১.
আমার সবচে ভালো বন্ধু
আমার বারান্দার লাল মেঝে টা।
উঠানের সামনে
মা ,কাপড় মেলে,
বালিশে রোদ দেয়,
আমি দেখি,
মা ধীরে ধীরে
উষ্ণতা হয়ে যায় ।
২.
মেঝের উপর একটা সাদা গোল আছে
সামনে ঠাকুর ঘর, উল্টোপাড়ে রান্নাঘর
প্রত্যেক বৃহস্পতিবার
ঠাকুর ও রান্নাঘর এক হয়ে যায়।
গুচ্ছ কবিতা : মিঠুন চক্রবর্তী
আবার বৃষ্টি নামুক
কৃষ্ণরঙের মায়াডিঙি, তোমরা বললে মেঘ
আষাঢ় মাসের কদম বনে বাজাও বাঁশি কে?
প্রেম-বিরহ কবেই তো শেষ,যক্ষ কাজে ব্যস্ত
এক বিছানার কক্ষপথে দুই পৃথিবী স্পষ্ট
মনের খবর কে পাঠাবে ? জানতেও চাইছে কে?
মাঝখানে এক বরফ পাহাড় দাঁড়িয়ে রয়েছে।
হাঁড়িতে চাল কাটছে পোকায়। ধ্যাৎ! চাল কোথায় পাবে?
রাত্রি জুড়ে বুকের ভেতর মজ্জা মাংস খাবে....
তবু বর্ষা রেইনকোটে কি সত্যি ঢাকা যায়?
নীলচে রঙের কফির মগে উষ্ণতা চমকায়....
জল থই থই অঝোর ধারায় মেঘ ছুঁড়েছে বান,
বিরহ না সইলে কী আর বুঝতে পারো টান ?
হুড়মুড়িয়ে বৃষ্টি নামুক চোখ থেকে গাল বেয়ে,
মরা নদী ভাসুক আবার নতুন ধারা পেয়ে....
মাঝখানে আমরা খুব কাছে এসেছিলাম
যতদিন তোমাকে দূর থেকে দেখেছি
ততদিন এক খণ্ড আষাঢ়ের মেঘ
তীর্থের কাকের মতো
এসে বসে থাকত উঠোনের ন্যাড়া ডালটিতে।
তখন সারাদিন আমার উষ্ণ বুকের ভেতর জুড়ে
টুপ্... টুপ্... টুপ্...
যখন তোমাকে দূর থেকে চেয়েছি,
একটি সোনালি তারা
আমার বুকের বোতামে জরির সুতো দিয়ে আটকানো থাকত
আর সেই বোতাম খুললেই তখন কামিনী রঙের জ্যোৎস্নাপাত....
এখনও আমরা দূরে থাকি।
পৃথিবীতে নিয়মমাফিক বর্ষা আসে, আকাশে চাঁদ ওঠে....
নক্ষত্রগুলো নিজেরই বুকের বীভৎস আগুনে জ্বলে পুড়ে
ব্লাকহোলের দিকে এগিয়ে যায়
আগের মতোই আমরা দূরে আছি, কিংবা আগের মতো নয়
মাঝখানে আমরা খুব কাছে এসেছিলাম.....
যায় না ফেরা
টানা বৃষ্টি অসময়ে, ভালো লাগে ?
কক্ষনো না, বিশ্রী !
তেমন করে সেই যে তোমার ভোর বেলাকার রাঙা আলো
রান্নাঘরের ব্যস্ত বেলায় ফেরে যদি ?
জানলা খোলা, নাছোড় ফেরিওলার মতো ডাকে...
'নেওয়ার কিছু নেই যে আমার...' বলেই তাকে ফেরাবে নাকি ?
কিন্তু ধরো, তবুও যদি ডাকতে থাকে এক নাগাড়ে...
ভাসবে নাকি? সেই কবেকার কাগজ নৌকা ভাসতো যেমন
যায় না ফেরা... যায় না ফেরা... বলেই জানলা বন্ধ হল
ভীষণ চেনা গন্ধ নিয়ে অনেক দূরের একটা মানুষ
দিগ্বলয়ে হায়িয়ে গেল…
যদি চাও
বুকের খাঁজে মেঘ লুকানো। তুমি চাইলেই
বৃষ্টি মুখর দিন হতে পারতো
এই তল্লাটে বর্ষা আসেনি কতকাল।
শেষ বৃষ্টি দেখেছিলাম আমাদের গাঁয়ের ধানের ক্ষেতে
ধান রুইতে থাকা দম্পতির আধ-খোলা নিটোল শরীরে
এখন অগ্নিদগ্ধ দিন শেষে বাড়ি ফিরি
বুকে পালিশ করা শুকনো কাঠের চকচকে চাঁদ
ইলেক্ট্রিক পোলে লটকে থাকা ছেঁড়া ঘুড়ির নিচে ঘুমন্ত শহর
তোমার জন্য কিছুই নেই, বুকের খাঁজে লুকানো একখন্ড মেঘ ছাড়া
তুমি একবার চাও। একবার চেয়ে দেখো...
এই রেললাইনের শহর ভাসিয়ে আজও তুমুল বৃষ্টি হতে পারি
ধুলোধরা ডাকনাম ধরে যে ডেকেছে, তাকে
বাইরে ভীষণ বৃষ্টি এল শ্রাবণ সন্ধ্যায়
অগোছালো যেমন ছিলাম, ডাক শুনলাম আয়...
কে ডেকেছে ! যাবই চলে শুনব না আর মানা
হাতছানি দেয় হারানো সব জলফড়িং-এর ডানা
ওকে ডাকতাম সুবর্ণগাছ,উড়নচণ্ডী হাওয়া
রঙিন ছাতার নিচে প্রথম উষ্ণ আগুন ছোঁয়া।
ওম পেয়ে মোম বুকে তখন বাঁধ ভাঙা উচ্ছ্বাস
ডুবতে পারি, আবার যদি তেমন করে চাস
স্মৃতির পাড়া ভিজল আবার তুমুল বারিধারায়,
মন তো আজও আস্কারা পায় মেঘের ইশারায়।
ধুলো পড়া ডাকনামে কেউ চুমুর রুমাল টেনে
হাত ধরে ফের হাঁটতে হাঁটতে ব্যাগ ভরা মেঘ কেনে
শুধুই কি মেঘ? মেঘের ভেতর জোনাক জ্বলা নদী,
নদীর স্রোতে উজান পানে সাঁতার কাটি যদি
মৎস অবতারের আঁশে পুরানগাথা জীবন
রাধা হয়ে রমণ করো, সময় নিধুবন
Tuesday, September 1, 2026
গুচ্ছ কবিতা : শব্দ সুমিত
রোদে এসো জবাফুল
ক্ষীণ যাপন ইচ্ছে। স্বল্প আয়ুষ্কাল। চল্লিশ অনতিক্রান্ত পুরুষ।
ঝুলে গেছে কাল। এ কোন নিয়তিস্নান! গঙ্গা বহুদূর।
টাঙানো দড়িতে হাঁটে ভূত আর প্রেত।
কর্কশ জ্যোৎস্নায় কাঁদেন ঈশ্বর।
ঘুরে যায় পশুপতির পিনাকের মুখ।
ঘনায় আঁধার। খই ধান ভিজে যায় শোকের জলে।
যাবে না শ্মশান। যক্ষিণী কেড়ে নেয় সোনা।
মাকড়ি ও রুলি। হলুদ হারানো গাল।
পূর্ণচ্ছেদ। যবনিকা নামে।
ধূপকাঠির ধোঁয়া টানে স্বর্গরথ।
স্ত্রীগাল ভিজে যায় হরি গানে-গানে।
এসো জবাফুল। লালটুকু ছুঁয়ে দাও রৌদ্রকিরণে।
তরমুজ বনের রূপকথা
জল থেকে তোলা হল রৌদ্রভেজা পুরুষ
সমস্ত আর্তি দ্রবীভূত হয়ে গেছে স্রোতের লবণে
জলদগ্ধ পাঁজরে লেগে মাছের রৌপ্য নিঃশ্বাস
তরমুজ বনের রূপকথা।
এই সৌন্দর্যবোধ
প্রবল সাঁতারে পেরিয়ে গেছে মৃত্যুসীমা
নশ্বর শরীর ছেড়ে শালগ্রাম শিলা
ওষধির বাগান আর কবরভূমির মাঝ বরাবর
অর্ধশায়িত নারায়ণ যেন জলবিষুব রেখা
দ্বিধাহীন ঝরে পড়ে পুরুষ তালফুল
ঐকান্তিক শরীরের প্রেমে।
জাফরির আলো
এ-সব কিছু ভাল। ভাঙা কাপের ভিতরে বৃষ্টিকে রেখে দেওয়া ভাল। পুরোনো তালার সঙ্গে নতুন চাবির পরিচয় করিয়ে দেওয়া ভাল। রাতে ঘুমোবার আগে নিজের ছায়াকে এক গ্লাস জল খেতে দেওয়া ভাল। তোমার কাছে দু ফোঁটা ঋণ রেখে দেওয়া ভাল। ধানের শিষে সামান্য অন্ধকার বেঁধে রাখা ভাল। ঘুমের ভেতর আর-একটি ঘুম পুঁতে রাখা ভাল। ঝুল বারান্দায় বেতের মোড়ার সঙ্গে মাধবীলতার নিষিদ্ধ প্রেম ভাল। বিধবার আয়নায় গোধূলির শেষ সূর্যের রঙটুকু রেখে আসা ভাল। দুপুররাতে স্নানঘরে আসা ভাল।
তারপর একেবারে একা হওয়া ভাল।
নিকষিত প্রেমজলে সোঁদা পৃথিবী
এই তো প্রগতিবাদ। জীবনপীড়িত প্রেম।
ত্রিশঙ্কুসুলভ মনোভাব,
বিকচ যৌবন-যাপন অন্তর্বাসে
উত্থানসুখ — রতিকাগার থেকে আঁতুড়ঘরে।
প্রস্ফুটিত রগরগে শব্দে গণ-শৌচাগারের দেওয়াল
সয়ে যায় সঙ্গমকামড়।
অন্ধকার পৃথিবীর প্রেতচোখ
আনত,
গর্ভধারণে ব্যাকুল দম্পতির কুঁড়ি ফোটার
কস্তুরীগন্ধে।
ঋতুলালে ভালোবাসায় তন্বী আলতা-পা
গৃহ অভিমুখে
রজকিনীর পদাবলী প্রেমে আত্মসমর্পণ
এ পৌরুষ প্রত্যয়ে
গর্ভজলে সবুজ হয়ে ওঠে ধরিত্রী।
ঈশ্বর ভূমির মাটি
দুপুর গড়িয়ে গেলে একতাল মাটি নিয়ে
মা বসে পড়ে ঠান্ডা উনোন লেপতে,
বাবার কাঁধের ঘামে মায়ের আঙুলের মাটি
তুলতুলে নরম।
এই কমনীয়তায় আমাদের উচ্ছৃঙ্খল খিদে
তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে ঢুকে পড়ে উনোনের পেটে।
আমরা মানুষ হয়ে উঠি।
আদালতের বারান্দায় একতাল মাটি রেখে
তারিখের পর তারিখ,
মাটি অপেক্ষা করতে করতে
মানুষ হয়ে যায়।
মন্দির–মসজিদ– হাসপাতাল–ইস্কুলের ভিত
এই একতাল মাটিতেই।
অস্তিত্ব জটিল।
এই তো বিস্ময়-আধুলি জীবন
দপদপে সন্ধের ফুল ঝরে যায় দ্রুত।
ঈশ্বর দাঁড়িয়ে থাকেন অসহ্য যন্ত্রণায়
পায়ে তাঁর ধর্মতস্করের ছোবলের ক্ষত।
গুচ্ছ কবিতা : মিতা মল্লিক
সবুজ প্রত্যাবর্তন
উত্তরগুলো পাল্টে গেছে
এখন চাকা ঘুরতে ঘুরতে শীত পেরিয়ে কত বসন্ত রং ভেঙেছে প্রজাপতি ডানায় —
জলের সুর গড়িয়ে নেমেছে বর্ষণসিক্ত রাতে
সেদিনের না-গুলোর অহংকার মিশে গেছে বালুচরে
ফিরে আসছে সরিয়ে রাখা ঝুমকো দুল, ছিঁড়ে ফেলা টুকরো চিঠি, হাতের চুরি, পায়ের নূপুর
ট্রেনের জানলার ধারে আজ হু হু বাতাস
উড়ছে ওলোটপালোট কথামালা—
ফিরে ফিরে চোখে পড়ছে আকাশ আর গাছেদের বর্ণময় সবুজ বন্ধন।
প্রণত ডানায়
সে পথে আকাশ ছুটি নেয়
সে পথে বাদুড় ওড়ে না ডানায় সংক্রমণ নিয়ে—
সব জোয়ার ভাটা উপরিতলে ঘর্ষণ ঝলসানো মাংস ছিঁড়ে বনভোজনের উৎসব
সে পথে নদী ঘুমিয়ে আছে বুকের ভিতর
বিচ্ছেদ ধুয়ে মুছে জনহীন ফুল
শুকায় পায়ের তলায়
ভোর হয় সীমানা ছাড়িয়ে
পথ চিনে চলে আসে প্রজাপতি
প্রণত ডানায় মুছে নেয় জল।
প্রসাদ-চিহ্ন
বেঁধে রাখিনি ঝরা ফুল
শুধু পদধূলি প্রসাদ-চিহ্ন এঁকে নিয়েছি কপালে
একটি দিনের সুবাসিত দান
এঁকে রাখা নেই দিকচিহ্ন প্রত্যাবর্তনের সীমিত সীমায় সুরটুকু থেকে গেছে রক্ত কণায়
যে অদৃশ্য বাহুডোরে চিন্ময়ী প্রেম প্রারব্ধ সীমারেখা চৌকাঠ পেরোয়
দিগন্তে বিশ্বাস চিকমিক নক্ষত্রের আকাশ-বিহার সে তো নয়।
চাতক-তৃষ্ণা
বিনা লালনে ডুবে যাচ্ছে বাদামের তেল-চর্বিত কুঁড়ি
পরাগের হৈমচূড়া বেয়ে নেমে আসা ঘ্রাণ ছড়িয়ে যাচ্ছে শোলাঙ্কি বিছানায়
ভিজে যাওয়া উঠোন শুকোয় চাতক-তৃষ্ণা বহুধা শুশ্রুষা নেশা অমিল পংক্তির অন্ত্যমিল
ঘনিষ্ঠ রাত কাঙাল
যদি মিটে যায় শোক
খেয়া পারাপার গান্ধর্বী রীতি নীতি ছিঁড়ে কুটে বেড়ে নেওয়া ভাতে নিখোঁজ আংটি পেটে রাঘব বোয়াল মহাকাল।
নাবালক জল
সিঁড়ি বেয়ে উঠে আসা নাবালক জল
আঁকড়ে রাখে বটচ্ছায়া শিকড়
পৃথিবীর চোখ জয়ের উড়নতুবড়ি
ভিতরের জানালা ভাসায় সখাত
আবছায়া নীল নীল উপত্যকা
ঝাউ বনে টিয়া রঙ উচ্ছন্ন শহর
গিলে খায় রাক্ষুসী জটাজুট কোন্দল
মুনি ঋষি নির্বাক
পুজো পায় সাক্ষীগোপাল
মরণদশা কাদাপথ
ভাঙা ইঁট ভরসা।
গুচ্ছ কবিতা : সঙ্গীতা মাইতি
রাধাবিরহ
আনত স্বপ্নে মোড়া মুহূর্ত রাজকীয় হেঁটে যায়
বসে বসে ছায়াময় পদচিহ্ন আঁকি
তুলে রাখি চরণরেণু দীর্ঘ রাতের পাতায়
আসে যদি দহনের কাল, করুণ রঙের শাড়ি
উড়িয়ে আঁকাবাঁকা বয়ে যাব সম্বিৎ সরোবরে
শ্রীমতি সন্ধ্যা জেগে উঠে খেলা করবে—
এই বিশ্বাসে গেঁথে রাখছি অজস্র হেমকান্তি বিকেল।
চেরিফুলের গন্ধে নিষিদ্ধ বিরহ ভেসে বেড়াচ্ছে
পৃথিবীর সকল রন্ধ্রে ঢুকে পড়ছে সুরার ঘ্রাণ
বপন করেছ যার কঙ্কাল, সে কি রমণীর বিশ্বাসে জাগে?
সে কি গায় চৈত্রের সুগোপন অভিজ্ঞান?
তুলে ধরি মুখ বিস্ময়ে, বিহগিনী ডাকে
ভোরের কোটর থেকে বেরিয়ে আসে বোবা চোখ
তোমাকে যত্নে লিখছি শোক — জন্মখণ্ড ধুয়ে মুছে রাধাবিরহ
যাপন
যে বিশ্বাস কুমড়োফুলের মতো আলো
হয়ে ফুটলো, ছুঁয়ে থাকো তাকে আনম্র
যেমন থাকে প্রাচীন জনপদ
বিন্দু বিন্দু শ্রুতি নিয়ে সহস্রবছর।
সমস্ত যাপন জুড়ে ঝরুক দোলনচাঁপা
সমস্ত কবিতার গায়ে গায়ে জমে যাক রবীন্দ্র-বেলা
যতটুকু ছেঁড়াআলো ততটুকুই কথা
ভারহীন শ্বেত হাসিতে খরকুটো, লতাপাতা।
ছুঁয়ে যাও মৃগভ্রমে
চিহ্নিত শোক নিয়ে, সঙ্গম নিয়ে
গহীন সত্তায় দোল খাক আদিম নিযুত তারা।
দৃশ্য
শব্দের ভ্রমে সেদিন বলেছি কথা রাশিরাশি
শব্দের ভ্রমে এ হৃদয় রীতিহীন জঙ্গল
অচেতনে একটা-দুটো পাখি উড়ে গেছে
তবু তোমার আনত ওষ্ঠের নিচে হাত পেতেছি
গোপনে ভালোবেসেছি, চঞ্চল সন্ন্যাসীর
মালা ছিঁড়ে পুতেছি দোপাটি চারা
আমারই অস্থির নিচে আগুন কঠিন অস্ত্র,
ভিজে পাহাড়ের মতো কড়া শাসন—
একে একে কবিতা করেছো তুমি যত্নে
নিবিড় স্বপ্নে স্মৃতিচিহ্নময় ত্রিসন্ধ্যা ফুটে উঠছে
যত দেখি, তত দেখি না তোমার চোখের পুণ্যবেদী।
অনন্ত বৃষ্টি
গ্রীষ্মের ভিতর যেইভাবে ঢুকে পড়ছে বর্ষা
সেইভাবে তোমার ভিতর ঢুকে পড়ে বালকের ক্ষোভ
সুরেলা বৃক্ষ ডাকনামে ডাকে, বরফবাতাস
চোখে লেগে ভারাক্রান্ত হয়ে ওঠে চৈতন্য
দূর থেকে ভাবি, খুব নিকটে এলে কি মানুষ
হয়ে যায় জল থৈ থৈ বীজধান?
কুয়াশার পৃথিবী ঠেলে কলকল শব্দে
দীর্ঘশ্বাস উড়ে যায়, উড়ে যায় সফেদ পোশাক
রমণীর শরীরের শুকানো দাগগুলো একা একা ভেজে
তোমার ঘৃণার আঁচ তবু চিনে নিতে পারেনা সেই ভুলজন্ম
সন্তর্পনে আগলে রাখা বুক থেকে চুপিচুপি
ঝরে যাই ধুলোপথের গানে..!
অশোকফুল
তুমি রাত্রির শ্বাপদ
চুপিচুপি নিশিডাক দিয়ে যাও নক্ষত্রযোনীতে
অনতিদূরে দাঁড়িয়ে থাকে সহজ হৃদয়
শোক গড়িয়ে পড়ে, শুদ্ধাচার ধূলির অবতলে
জ্যোৎস্না হয়ে গড়াগড়ি খায়
প্রশ্ন করিনি,
শুধু বৃক্ষের মতো রেখেছি আঁকড়ে মোহ
তুমি আজন্ম মরণ—
দেহকে কাঠ ভেবে ধরাও আগুন
রাত্রির অনুশোচনায় আমি বধ্য অশোকফুল!
গুচ্ছ কবিতা : মৃণালেন্দু দাশ
বিশ্বস্ত কিছু কথার পাশে চড়ুই বাসা বাঁধছিল অনেকটা পূজার ডালার ছোট্ট ঝুড়ির মতো উঠোন বাগানের টগর গাছের চার ডালের পাতায় ঘেরা মাঝের সুরক্...
-
দুটি কবিতা অদিতি রায় নিমন্ত্রণ করে গেল যারা কোথাও তো যাওয়া উচিৎ, সাদা ঘর সমুদ্রের ধার অথবা গাছের বাড়ি- বৃষ্টি অরণ্যে নিমন্ত্রণ করে গেল...
-
নির্বিরোধ... যুদ্ধ একটা খিদের নাম। এই নৈরাজ্য, সন্ত্রাস, রাষ্ট্রবিপ্লব, থালা হাতে চৌকাঠে দাঁড়িয়ে আছে। উঠোনে উঠোনে রক্তভোজ, নখ, দাঁত, বাট...
-
আমি হঠাৎ কেন সমূহ মৃত্যুর মধ্যে প্রবেশ করলাম। তারপর অনেকটা সময় কাটানোর পর ভাবছি আদৌ বিষয়টা মৃত্যু কি না। না কি মৃত্যু ...





.jpeg)
