কাব্যজন্মের সূত্রটি কী? জননপদ্ধতি দেহে, মনে এই চিররহস্যের আরম্ভটি বীজ আকারে পোঁতা হয় কবে, কোনখানে, মানুষ তা কতদূর জানে, টের পায়? ফেলে আসা বাস্তুভিটে সেই বীজ? যে বীজের থেকে এপারেও কলোনির টিনছাদে মানুষ লতিয়ে তোলে ফনফনে কুমড়ো কিংবা নবীন শিমের লতা ফের? সমস্ত রাত্রি জেগে পরস্পর ভেসে যেত যারা, সেই রাত্রিজাগরণ যদি বীজ, অবিশ্বাসে, দোষারোপে একদিন সেই ভাসা বন্ধ হলে, তারও আরও বহুদিন পর মধ্যরাতে আরেকবার জেগে উঠে সহসাই ভাবা, অনর্থক কিছু নয়...সে-ই তবে সে বীজের অত্যাশ্চর্য ফল? একদিন যা ছিল, যে আকারে, প্রকৃতিতে যেইমতো হয়ে ছিল, সময়, বিচিত্র জারণমন্ত্রে তাকে কোন রূপে মুক্তি দেবে পরে? বীজরোপণের সময়ে সে যা ছিল, জন্মসময়ে সে চেহারার সঙ্গে কতটুকু মিল থাকবে তার, অথবা কি থাকবেও না বিন্দুমাত্র! চূড়ান্ত নেতির থেকে ঝরে পড়বে নিরুপায় আকিঞ্চন আলো, গাঢ় মধুরতা কোনও পালটে যাবে বিষরসে উল্টোদিকে নিশ্চিত বরং!
এ রহস্য, সমাধান না মেলা এই মূলসূত্রগুলিই জন্ম দিচ্ছে যদি কবিতার, তবে কবি কে? এ রহস্যের অধিপতি যিনি? যিনি শুরু জানেন, শেষটুকুও জানেন তন্নতন্ন করে, অলংকারশাস্ত্রমতে অনুপুঙ্খ জানেন কোন উদ্দীপন আর কোন আলম্বনে কোন অনুভাবটি এসে জুটবে এরপর, কী গড়ে উঠবে, কী তিনি গড়ে তুলতে চান কাব্যশরীরে। নাকি অর্বাচীন পাঠকজনোচিত দর্পে আমরা নস্যাৎ করব তাঁকেই, উপেক্ষা করব প্রাজ্ঞতার দোষে, তিনি তো হতে পারলেন না সেই চিরঅজ্ঞান, লাগামধারণের অধিকারহীন উন্মাদ সওয়ারিমাত্র, যে জানে না দিগ্বিদিক উদ্ভ্রান্ত করে রহস্যঅশ্বীটি তাকে নিয়ে পৌঁছবে কোথায়। কোন বিপুল বেদনা অথবা বিজন আনন্দের আবর্তে ঝলকমাত্র তার সঙ্গে দ্যাখা হবে পাঠকের, অথবা হবেও না তত। সে আজ্ঞাবহমাত্র, সে ঐ উদ্বাস্তুকলোনির কেউ নয়, তবু ঐ কলোনির নাছোড় ভূমিবাসনা, ফসলবাসনার আজ্ঞা কলমে ধারণ করতে দৈবাদিষ্ট, তার পথ নেই ঐ বিচ্ছিন্ন যুগলের মাথার কাছে রাত্রির পর রাত্রি জেগে একদিন লিখে ফেলা ছাড়া 'শুধু আছে ঘোরটুকু, সেই ঘোরের ভিতরে / ঘুম ভেঙে দেখবে বসে আছো/ তুমি ও সে -- সে ও তুমি -- ভোরে, কাকভোরে...'।
যে কবিতা থেকে এই পঙক্তিগুলি তুলে নেওয়া গেল, সে কবিতার নাম 'ভোর', আর যে বই থেকে নেওয়া এই কবিতা, সে বইয়ের ভূমিকায় ; পাঠকস্বাধীনতার জায়গা থেকে দেখলে যে ভূমিকাও প্রায় একটি কবিতাই স্বয়ং, এ কবিতার কবি কী লিখছেন? লিখছেন কয়েকটি অপমানের কথা, সংবাদ দিচ্ছেন একরকম। তাঁর নিজের সঙ্গে, তাঁর নিকটজনের সঙ্গে ঘটা অপমানের কথা। অপমানগুলি ঘটে যাবার পর নিজের নিরুত্তর থাকার কথাও লিখছেন এবং দিচ্ছেন পরের দুদিনে তাঁর কলমে মোট ষোলোটি কবিতা এসে পড়বার তথ্য, স্বীকার করছেন 'এই ষোলোটি কবিতার মধ্যে একটির ভিতর সেই অপমানের আভাস সূত্রাকারে এসে পড়েছে -- আমি আটকাতে পারিনি। এই না-পারাই আমার লেখক-জীবনের সম্বল। এ-কথা এখন মেনে নিয়েছি।' -- আর আমরা পাঠক অথচ নৈর্ব্যক্তিক পাঠদূরত্বে বসে দেখছি একটি অপমান উদ্দীপন হয়ে জ্বলেনিভে জন্ম দিল যে বিশেষ একটি, অথবা পরোক্ষে একাধিক কবিতার, কবিতা নিজেই তার অপার চারুরহস্যময় জারণের সাম্যে ঝরে পড়ছে সেই অপমানের উপশম হয়ে যেন 'সব অভিযোগ হাত থেকে, জল হয়ে ঝরে.../জল থেকে উঠে কন্যা যায় মালা হাতে তার স্বয়ম্বরে'। কী আশ্চর্য সততায় এই কবিতাটিতে, 'মাল্য' (ঔরস/ পৃ : ৫) কবিতাটিতে আত্মবিরক্তির, স্ববিরোধের, উপায়হীনতার প্রতি শ্লেষও তো লুকোতে পারছেন না কবি। চাইছেন না। কন্যাটি, পাঠক যদি ধরে নিই স্বয়ম্বরা লিখনশক্তিই স্বয়ং কবির, যেন কিছু বিভ্রান্তও, 'এক তুমি তখন অনেক! বিভিন্ন পোশাকে/ অন্য অন্য আসনে বসেছ -- তবে কন্যা মালা দেবে কাকে?' -- এই অন্য অন্য আসনেই বা তখন কারা? কোন আসন থেকে উঠে এসে দাঁড়াচ্ছে উত্থিততর্জনী অপমান, কোন আসনে নীরব হয়ে বসে উপায়ান্তরহীন সামাজিক নীরবতা? কোন আসনে জীবনের অপ্রয়োজনীয় সমঝোতাগুলি কবির, কোনটিতে অতীতে করা বিশ্বাসভঙ্গ? এই বিভিন্নমূর্তিময়ী এক ও একমাত্র 'তুমি'র কাছে মাল্য কবিতার শেষে যে পথহীন সমর্পণ, যে কলুষস্বীকারোক্তিও যেন বা তার কাছে, 'আমি ধরতে থাকি সে-মাল্যের, দোষ ত্রুটি খুঁত/ শেষে দেখি তোমারই গলায়, মাল্য হয় আমার বিদ্যুৎ!' তা কি সহসা আমাদের, বাংলা কবিতার পাঠকদের দাঁড় করিয়ে দেয় না এক আর্ষ 'তুমি'র সামনে, ভিন্নতর বয়ানে হলেও, কবিত্বের যাত্রা আরেক কবিতায়, একাধিক কবিতায় বারে বারে শেষ হয়েছিল যে 'তুমি'র সামনে এসে, 'এখানেও তুমি জীবনদেবতা!'র (সিন্ধুপারে/ চিত্রা) আর্ত বিস্ময়ে...
'ফেরি' (ঔরস/পৃ : ২২) কবিতার কাছে যদি এইবার আসেন পাঠক, তিনি বিভোর হবেন কীসে? বিষয়মাধুর্যে, ছন্দে, এমনকী ভাবে বা নির্মাণকৌশলেও তো আলোচ্য কবি এর আগেও বহু কবিতাগ্রন্থে তাঁকে বিস্মিত করেছেন। একই উপাচারে, তীব্রতায়, ভাষাউত্তেজনায় অস্থির করেছেন এমনই। সেসব পেরিয়ে পাঠক এইবার যদি আসেন এ কবিতার চন্দ্রাহত করে দেওয়া কয়েকটি ছবির কাছে, 'দ্যাখো, দ্যাখো ওখানে দু-জন/ উন্মাদ আদরে!/ একে অপরের মধ্যে ঢুকে/ দাঁড় বাইছে জোরে/ নদী তোলপাড়, দু-জনেরই/ একসঙ্গে আসে, এসে যায়/ নদী-মুহূর্তটি...' তবে সম্ভবত তখনই এই 'নদী-মুহূর্তটি' শব্দের বিস্ফোরণে, কবিত্বের এই অসীম ক্ষমতার সামনে, কবিতার এই দিনানুদৈনিক থেকে, সাধারণত্ব থেকে বিযুক্ত করে লহমায় স্বর্গাসীন করে তুলবার আশ্চর্য শক্তির সামনে শরীরী অর্থেই নতজানু এবং কৃতাঞ্জলিবদ্ধ হবেন তিনি, উতরোলও তো বটেই। অথবা যখন এই কবিতারই শেষে 'রাতপাখি-ই বলে : "ভোর, তুমি দেরি করে এসো, আরও দেরি/ ওরা একটু শান্তিতে ঘুমোক"/ দূরে পাহারায় তপোবন, চাঁদনৌকা বেয়ে চলে ফেরি...' তখন, ফের, মৈথুনক্লান্তিতে নিদ্রিত এক যুগলের মাথার কাছে দাঁড়িয়ে থাকা এই 'তপোবন' শব্দের প্রয়োগে সহসা আমর্ম দুলে তো উঠবেই বাংলাভাষা। পাঠকের কানে জেগে উঠবে চরাচরআলোড়িত হুলুধ্বনি, এ কবির প্রতিভার প্রৌঢ়ত্বের কাছে তাঁর দৃষ্টি তাঁর শ্রুতি কৃতজ্ঞ তো হয়ে পড়বেই তৎক্ষণাৎ ফের!
এ বই, আমাদের আক্ষেপ হয় যার ক্ষুদ্রকায়ত্বে, আক্ষেপ কেননা ভাষার এক প্রবল উতরোল এই পুস্তিকা ধারণ করে আছে এর ছত্রে ছত্রে যা এ আয়তনে পাঠকের ক্ষুধানিবৃত্তিতে কিছুটা অক্ষম -- একইসঙ্গে চমৎকৃত করে যতিপ্রয়োগের ক্ষেত্রেও এমনকী। 'গৃহ'(ঔরস/ পৃঃ ৬) অথবা 'ঘাট' (ঔরস/ পৃঃ ১০) এর মতো কবিতায় যে চমৎকৃত করার চিহ্ন স্পষ্ট। 'সমুদ্রের পর সমুদ্রের/ কারা অধিকারী?/ স্রোত, জলোচ্ছ্বাস, স্তম্ভজল/ কেউ কিনতে পারি?', 'গৃহ' কবিতা থেকেই যেমন এই পঙক্তিগুলি তুলে নিলে পাঠক লক্ষ করবেন 'স্রোত' 'জলোচ্ছ্বাস' 'স্তম্ভজল' শব্দগুলির মাঝে প্রতিটি অর্ধযতির প্রয়োগে কেমন করে স্তরে স্তরে তৈরি হচ্ছে কবির অভিপ্রেত সেই তুঙ্গ মুহূর্ত। যে তূরীয়তার, উচ্চতার আভাস দৃশ্যগতভাবে তিনি পাঠককে দিতে চান, তা শিল্পিত হয়ে উঠছে কী আশ্চর্য সফলতার সঙ্গে।
'ঔরস' বইটি শেষ হবার পর মলাট উল্টোলে আমরা পাই এ বইয়ের শেষ কবিতা, 'উৎসর্গ'। এ কবিতাই এ পুস্তিকার উৎসর্গপত্রও এক অর্থে। 'ঔরস' কবিতাপুস্তিকার এই নামকরণের সামনে যে পাঠক সন্ধিৎসু হয়ে দাঁড়াবেন, যে পাঠক এ বইয়ের একাধিক কবিতা, যেমন 'বশ' (পৃ : ১১), 'বীজ' (পৃ : ১৯), কিংবা 'গতি' (পৃ : ২৩) পড়তে গিয়ে খুঁজে পাবেন দেহমিলনের এক এমন ভাষ্য যা ক্রমশ নরনারীসম্পর্কের মৈথুনরহস্য পার হয়ে গিয়ে দাঁড়াচ্ছে ঔরসের, গর্ভের শস্যকামনায়, সেই পাঠক যখন অন্তিমের, শুরুরও কবিতাটির কাছে এসে পৌঁছবেন, আমরা একমুহূর্ত ফিরে যাব এ লেখার শুরুতে খুঁজতে চাওয়া কাব্যজন্মের রহস্যের কাছে। দেখব এই শস্যকামনা, বহিরঙ্গের যে উত্তেজনা, যে নেতিবাচকতা, যে অপমানই একে জ্বালিয়ে তুলুক না কেন, এ যেন সেজন্যই আরও বেশি করে এক উত্তরাধিকারসন্ধানই প্রায়। এ কবির প্রথম বই, 'ক্রিসমাস ও শীতের সনেটগুচ্ছ'(১৯৭৬) প্রকাশ পেয়েছিল আজ থেকে প্রায় সাঁইত্রিশ বছর আগে। ব্যক্তিপাঠকের পর্যবেক্ষণে, নিজের অবিশ্বাস্য প্রতিভাশালিনী কবিজীবনের যাত্রাপথের দীর্ঘদূরত্ব পার হয়ে এসে সেই কবি, শ্রীজয় গোস্বামী আজ যখন লিখছেন ' তোমারই নামকরণে ধৃত হোক, ধৃত/ ভবিষ্যৎ তার!/ ধন্য হোক কাব্যযোনিপথ/ অমৃতে উৎসর্গ-ধন্য ঘৃত...' তখন হে পাঠক, আমি এবং আপনি কি জানছি না এই উৎসর্গ, এই ঘৃতাহুতি আর যাই হোক, অন্তত এ কবিতায় বলা 'শেষপৃষ্ঠা' নয়! জ্বলে যা উঠেছে তা নিভে গেলে পড়ে থাকে কবিতার ন হন্যতে হন্যমানে শরীর। অগ্নিতে যা নিক্ষিপ্ত হল দাহ শেষ হলে গোচরে আসে ফের সেই কবিত্বের তীব্রতর পুঞ্জতেজ, লয়হীন। এ কবিতাপুস্তিকা তাই আমাদের হাতে কবির নিজস্ব উপসংহারধারণাকে অস্বীকার করে বা স্বীকার করেও তাঁর চার দশকের দীর্ঘযাত্রার নতুন বাঁকই এক। এ পুস্তিকার শেষে আমাদের পাঠকদের তাই সেই বাঁকবদলের পরবর্তী যাত্রা, পরবর্তী দাহ, পরবর্তী যন্ত্রণা-আনন্দ-অবমান-প্রশংসার মিলিত অনশ্বর কবিতাশস্যের অপেক্ষায় থাকাই শুরু শুধু। ফের! আরেকবার।

No comments:
Post a Comment