এলিয়েনেশন
আর লিখতে ইচ্ছে করে না। এই পুঁজিনিয়ন্ত্রিত অর্থনৈতিক সমাজে দাঁড়িয়ে, দৈনন্দিন জীবনের ঘূর্ণিতে হঠাৎ আবিষ্কার করি—লেখার ইচ্ছেটাই যেন বৃথা হয়ে উঠেছে। আনন্দ কিংবা বিষাদের বহিঃপ্রকাশ যদি বাক্সবন্দি করা যায়, তাহলে ঠিক আছে। নাহলে নিকট লোকেও তা নিয়ে বিন্দুমাত্র আগ্রহ দেখায় না।
অবশ্য যে কাজে তুমি সফল নও, তাতে তোমায় উৎসাহ দেওয়া মানুষজনের বড় অভাব। সেটা যে চূড়ান্ত আকাম তা বোঝাতে এগিয়ে আসে সমাজ। এই সমাজে কাজের সংজ্ঞাটা এরকম যা থেকে ভোক্তা সরাসরি বেনেফিশিয়ারি হতে পারে। যে সৃষ্টির তাৎক্ষণিক প্রয়োগ নেই, তায় আবার কাজ কয় নাকি! এই উৎসাহহীন বদ্ধ কালচক্রে লেখার ইচ্ছেমৃত্যু ঘটে।
আমি তো লিখে সামাজিক স্বীকৃতি চেয়েছিলাম, জীবনানন্দের মত বাক্সবন্দি লেখক হতে চাইনি। কিছু মানুষ যারা একদা লেখা পড়তে চাইতেন, তারা পথচলতি সাক্ষাতে লেখালেখির ভবিষ্যতের কথা জানতে চান। আমি সবিনয়ে আশ্বস্ত করি, “নতুন লিখছি, পড়াব শীঘ্রই”। বারবার এই মিথ্যা আশ্বাস বানী শুনতে শুনতে বিরক্ত হয়ে এক সময় তারাও বলা ছেড়ে দেন।
কবিতা লেখা বন্ধ হয়ে যায়, কবিতা নিয়ে আলোচনা বিস্মৃতির অতলে যায়, বাক্য গঠনের শৃঙ্খলা ভেঙে পড়ে। মার্ক্স যে এলিয়েনেশন-এর কথা বলেছিলেন, তা যেন নিঃশব্দে আমার উপর আরোপিত হয়।
সৃষ্টির সঙ্গে সম্পর্কের শিকড়ে টান পড়ে—নীরবে, বছরের পর বছর।
কফিন
জীবনের প্রহর আঁকতে বসে
অক্ষমতার অতীত ডুবে যায় বিস্মৃতির আঁধারে।
শৈশবে অক্ষমতাকে ভেবেছি মৃতের কফিন
সেই কফিন আমায় উপহার দিয়েছে অ্যালঝাইমার্স!
কতবার ভেবেছি সাক্ষাৎকার নেব গুণীজনের
কিন্তু কফিন আমার মগজে দিয়েছে ইম্পোস্টার সিন্ড্রোম।
দগ্ধ দেহমন, বিস্মৃতির অতল
কফিন সহমর্মিতা দেয়নি, পৃথিবী চিনিয়েছে
কতবার ভেবেছি পাহাড়ে বাস্তু বানাবো
পাহাড়ে বেশি ঠান্ডা, মাথায় পরবো ইয়ার মাফ বা বিনি
তখন আর কেউ কফিন দেখতে পাবে না।
সিমপ্যাথি পাহাড়ি ছড়া বেয়ে নীচে নেমে আসবে
সমতল থেকে সমুদ্রে...
তখনই আমার জয়।
চতুর সেপিয়েন্স...
কবিতা লেখার জন্য চতুর হতে পারিনি।
হয়ত লিখেছি যা তা মধুমেহ
হয়ত ভেবেছি যা তা নিউট্রিনো
হয়ত যা দেখেছি তা পৌরাণিক...
অন্ধকার মহাবিশ্ব থেকে ইপস্টাইনের গুহ্যদ্বারে,
যে বৃহন্নলা রাষ্ট্রের গ্রহণ কামনা করে।
তার জন্যই কোনোদিন চতুর হতে পারিনি।
একজন এসে বলল, আমি হোমো ইরেক্টাস
একথারও যে সারমর্ম আছে
তারজন্য আমি কখনো বন্ধু হতে পারিনি।
যে কবি আমাকে সংবেদনশীল বানিয়েছিল
তার মৃত্যু হবে বিষবৃক্ষের মতো।
পর্বতের চূড়ায় রেখে এসেছি বৈরাগ্য
আমি সংসারী, বেদনা আমার নিজস্ব
বৈরাগ্য সঙ্গে থাকলে বন্ধু অথবা চতুর হতে পারতাম।
হোমো সেপিয়েন্স বন্ধু ও চতুর একইসঙ্গে হতে পারে না।

No comments:
Post a Comment