Thursday, August 13, 2026

গল্প : শিখা রায়




 ইঁদুর-কল


নবীন চাকলাদার বয়সে প্রবীণ। একাকী জীবন-চর্যায় অভ্যস্ত হয়ে গেছেন বহুদিন।সম্পন্ন পিতৃপুরুষদের অবশিষ্ট সম্পত্তিতে তার জীবনযাপন। যদিও কালের নিয়মে তার বাসগৃহ বিধ্বস্ত প্রায়। প্রাচীন গরিমা,চাকচিক্য বিলীয়মান বহুদিন। বাড়ির লোকজন বলতে, পরিচালক বিধু আর রাঁধুনি জবাকে নিয়ে তার এলোমেলো সংসার।

তবে এখনো কয়েক ঘর প্রজা নজরানা আনে। বিশেষ দিনে, পুরোনো বেশে সাজসজ্জা  করে, দরদালানে বসে, সালিশিও করতে হয়। তার অবশিষ্ট জমিজমা দেখাশোনা করে নায়েব রমেশ। রমেশ তার বিশেষ বন্ধু ও বটে। নবীন  বাবুর সান্ধ্যকালীন দাবা খেলায় সেই একমাত্র সঙ্গী।

পত্নী কামিনীবালা বহু দিন হলো পরলোকগতা। অক্ষয় সিঁদুর নিয়েই তার স্বর্গে গমন। একমাত্র পুত্র বিনায়ক ও বহু বছর প্রবাসী। শিকড়ের টানেও তার ফেরার সম্ভাবনা নেই।তাই তিনি একাই পূর্ব পুরুষের বাতি জ্বালিয়ে সাবেক বাড়িতে বিদ্যমান।তার জীবনযাত্রা নিস্তরঙ্গ।গতে বাঁধা। তবুও সময় বয়ে চলেছে। আজকাল তার নিজেকে ফাঁদে পড়া বকের মতো মনে হয়।

তবে বর্তমানে তার স্থির জীবন অস্থির।বলা যায় এক উপদ্রবে তার জীবন অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে! উপদ্রবটি হলো- ইঁদুরের। পুরোনো বাড়িতে সাপখোপ-কীটপতঙ্গের অভাব নেই। তাদের সঙ্গে সহাবস্থানের অভ্যাস তার আছে। কিন্ত এই ডাকাতে ইঁদুরের প্রকোপ  কোনো দিন তিনি দেখেননি। এদের আক্রমণে  দৈনন্দিন জীবন বিপর্যস্ত । নবীন বাবুর কপালে চিন্তার ভাঁজ। বাড়ির অন্য সদস্যরাও বিপদাপন্ন।তাছাড়া, আরেকটি গোপন কথা হলো ,তিনি  শিশু কাল থেকেই এই গণেশবাহনকে ভয় পেতেন যমের মতো।ইঁদুরের ধূসর, লোমশ দেহ আর জ্বলজ্বলে, ঝিলিক  দেওয়া চক্ষু তার জীবনের ত্রাস।বইপত্র, হিসেবের খাতা, পোশাক পরিচ্ছদ – সবেতেই  ইঁদুরের অনায়াস দন্ত্– দঙশন। শয়ন গৃহ, বৈঠকখানা, খাজাঞ্চিখানা , রসুই ঘর – সবজায়গায়  তাদের অবাধ আসা যাওয়া । রাতে তাদের আসুরিক দাপটে তিনি ইদানিং নিদ্রাহীন।ফলে, সকালে তার শরীর ম্যাজ ম্যাজ করে এবং তার মেজাজ ও তুঙ্গে থাকে। সমস্যা সামলাতে রুদ্ধ দ্বার বৈঠক চলছে ঘনঘন। বৈঠকের শেষ আছে কিন্ত উপদ্রবের নয়।শেষে বৈঠকের নিদান হল- বিষপ্রয়োগে হত্যার।

নায়েব রমেশ চটজলদি  শহরে গেলেন সেই  অমৃত সমান ইঁদুরের বিষ কিনতে। বিষ এলো। জবা আর বিধু কাজে লেগে গেল। জবা তরিতৎ করে মোহনভোগ বানিয়ে তাতে বিষ মিশিয়ে ছড়িয়ে দিলো বাড়ির আনাচে কানাচে।

নবীন বাবুর কড়া নজর ছিল এই কর্ম-কান্ডে। তিনি সে রাতে একটু নিশ্চিন্তে  নিদ্রা গেলেন।

সকাল হলে সবাই উৎসাহ ভরে ইঁদুরকুলের শব-সন্ধান করতে ব্যস্ত হল। কিন্ত কাকস্য পরিবেদনা! একটি মৃত ইঁদুরের লেজ ও পাওয়া গেল না। বিষময় মোহনভোগ যথাস্থানে পড়ে রয়েছে। বুদ্ধিমান ইঁদুরের দল তা স্পর্শও করেনি। হতাশায় নবীন বাবু শয্যা নিলেন।

ইঁদুরের অত্যাচারের মাত্রা আরো বেড়ে গেল। এই হাত-পা-বাঁধা অবস্থায় নবীন বাবুর জীবন হয়ে উঠলো অসহনীয়। দুঃস্বপ্ন হয়ে উঠলো তার নিত্য সঙ্গী।     

তিনি স্পষ্ট বুঝতে পারলেন – ইঁদুরের  দল তাকে নিয়ে ঠাট্টা তামাশা করছে। ওদের চিকচিকে লাল চোখে খুনির হাসি! আর দলপতির চোখে ধারালো ছুরির শান। বিনিদ্র রাতে , তার সতর্ক নজরে-ইদুর দলপতিকে তিনি চিহ্নিত করতে  সমর্থ হয়েছেন। ইঁদুরটি খলনায়ক বিশেষ।

এই বিপন্ন সময়ে, সান্ধ্যকালীন দাবা খেলায় তার মনঃসংযোগ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। বারবার চালে ভুল হতে, খেলা স্থগিত রেখে, পরামর্শ সভায় বসলেন।  তিনজনের দীর্ঘ পরামর্শ শেষে, তিনি আশার আলো দেখতে পেলেন।

কাজ শুরু হয়ে গেল। বিধু পুরোনো বাজার থেকে নিয়ে এলো ইঁদুর-কল। কালো কাঠের মজবুত কল। তাতে লোহার জাল ঝিকিয়ে উঠলো। এই কল ইঁদুর ধরার জন্য বিশেষ  ভাবে তৈরি ! আশার ঢেউ জাগছে নবীন বাবুর মনে। জ্বলজ্বলে চোখে তাকিয়ে রইলেন ইঁদুর-কলের দিকে। তার মুখে পৈশাচিক হাসি খেলা করে গেল। চোখে জয়ের উল্লাস।

জবা আর বিধু খাঁটি ঘিয়ের ময়ান দিয়ে ময়দার মন্ড সুরভিত করলো যত্নে।কলের ভেতর রাখা হলো সেই টোপ। কলের লৌহ দরজা উন্মুক্ত। নবীন বাবুর নিশ্চিত বিশ্বাস দলপতি এবার জালে ধরা পড়বেই। আর,দলের মাথা নিকেশ হলে, দল ও নিকেশ।

ইঁদুর কল পাতা হলো নবীন বাবুর পালঙ্কের নীচে, তার নজরদারিতে। বিধু চলে যেতে, নবীন বাবু,আরামে বালিশ বুকে চেপে, শয্যায় শরীর এলিয়ে দিলেন। অন্ধকার ঘরে তিনিই নিধনপর্বের একমাত্র সাক্ষী আজ।   

রাত ক্রমশঃ বাড়ছে।ঘরে ঘড়ির আওয়াজের সাথে বাড়ছে নখ আর দাঁতের শব্দ। কিন্ত সশরীরে কেউ আসছে না। নবীন বাবুর কপালের ভাঁজ বেড়ে চলেছে। বারেবারে উঁকি মারছেন পালঙ্কের নীচে- সেখানে আবছায়া অন্ধকারে কৃষ্ণকায় ইঁদুর-কল অপেক্ষায় রয়েছে। বাতাসে টোপের সুন্দর সুঘ্রাণ। সব ঠিকঠাক।  

রাত অনেক।নিদালি তন্দ্রায় নবীন বাবুর চোখ বুজে এসেছে। হঠাৎই খুটখাট শব্দে জেগে উঠলেন। সতর্ক  হয়ে,স্পষ্ট দেখতে পেলেন-দলপতির আগ্রাসন।সে ধীরে এগিয়ে আসছে পালঙ্কের দিকে। নবীন বাবুর উত্তেজনা তুঙ্গে। হৃদপিন্ড স্তব্ধ।

তবুও শঙ্কা ! দলপতির চালচলনে রহস্যময় ইঙ্গিত! তবে কি সে আঁচ করতে পেরেছে! মরণফাঁদ কি তার বোধগম্য! তিনি বুকভরা শ্বাস নিলেন। সারা শরীর জুড়ে শীতল উত্তেজনা। ঘড়ির পেন্ডুলামের আওয়াজ রাতের অন্ধকারকে খান খান করছে।

সাবধানে শয্যা ছেড়ে নীচে নামলেন তিনি।কোমর ভেঙে নীচু হলেন। স্পষ্ট করে দেখা যাচ্ছে না। তিনি পালঙ্কের অন্ধকারে সেঁধিয়ে গেলেন। 

সামনেই ইঁদুর কল। রোমশ দলপতি তার পাশে। লাল পুঁতিদানা চোখে ধিকিধিকি আক্রোশ! তার চোখের সম্মোহনে নবীন বাবু স্থানুবৎ। তিনি আরো অন্ধকারে ডুবে গেলেন। বুঝতে পারলেন তাঁর শরীর  ক্রমশঃ ছোট হচ্ছে। ধূসর লোমশ শরীর তার এখন। তীক্ষ্ণ দাঁত আর জান্তব চোখে তিনিই পুরোদস্তুর ইঁদুর। অনায়াসে  ইঁদুর-কলে ঢুকে গেলেন তিনি।কুলুপ আটকে  গেল সশব্দে। তিনি অন্দরে। ইঁদুর দলপতি বাইরে।  ইঁদুর-কলের ভয়াল অন্ধকারে তিনি নিমেষের মধ্যে কয়েদ হলেন। কলের কুলুপ নড়েচড়ে না।তার চারপাশে লোহার জালের নিষ্ঠুর আস্ফালন। ইঁদুর দলপতির অবস্থান কলের বাইরে। তার চোখে চিরকালীন অট্টহাসি। নবীন বাবু ইঁদুর হয়ে গেলেন।তিনি চিৎকার করলেন। কিন্ত মানুষের  স্বর বের হলো না। বের হলো জান্তব ইঁদুরের কিচকিচ। ইঁদুর দলের হিংস্র-বৃত্ত ক্রমশঃ ঘনিয়ে আসছে! নবীন বাবু অজ্ঞান হলেন। তার জ্ঞান আর ফেরেনি। তাকে আর খুঁজেও পাওয়া যায়নি। সকাল হতে অবশ্য পরিচালক বিধু ইঁদুর-কলের মৃত ইঁদুরকে নর্দমায় নিক্ষেপ করে এসেছিল। নায়েব রমেশ এখন একলাই দাবা খেলেন আর ভাবেন, জলজ্যান্ত মানুষটি কোথায় গেল!

No comments:

Post a Comment

গল্প : শিখা রায়

  ইঁদুর-কল নবীন চাকলাদার বয়সে প্রবীণ। একাকী জীবন-চর্যায় অভ্যস্ত হয়ে গেছেন বহুদিন।সম্পন্ন পিতৃপুরুষদের অবশিষ্ট সম্পত্তিতে তার জীবনযাপন। যদ...