Monday, April 14, 2025

বান্ধবনগরে ৯ সুজন






সঞ্জয় মুখার্জি

পিপাসা


মৃগ যদি নাচে পিছিয়ে আসলে ঝড়


যদি রোমাঞ্চে বিশ্বাস রেখে ঠকি
দরজা খুলবে; যে ঘর কখনও আগে
ডাকেনি আমায়- তল্লাশি নেবো শুধু
মুখে বলবো না আমিও লুকিয়ে কাঁদি
আয়নার দোষ... নাচতে নাচতে মৃগ
হাঁপিয়ে পড়বে, জল খেতে যাবে- যাক


পৃথিবীর সব মৃগদের আমি চিনি
সবুজে তাদের অদ্ভুত মাথাগোঁজা
আদিমে তাদের শিঙ-এ চমকাতো চাঁদ
কিন্তু ওই যে পিপাসা চরমে গেলে 
দল বেঁধে ওরা নদীর কাছেই ছোটে
ওটাও আয়না, মৃগ ভুলে যাও কেন?




সায়ন রায়

হৃদয়ের মন


বুঝতে পারিনি আমি, মন ছিল, একখানি জানালাও
আমারই হৃদয় আজ অভিমানে সরে গেছে দূরে
আমি তাকে মধু দিই, ক্ষতটিকে যত্নে বেঁধে রাখি
ফুলের পাপড়ি থেকে নিকষিত হেম
দু-হাতে মাখাই রোজ, রাত থেকে ভোর
আমারই হৃদয় আজ গোপন ছুরিকা হাতে বিরোধী শিবিরে
এলোমেলো পড়ে থাকে স্মৃতিটুকু যৌথ উদ্‌যাপন
কখনো বুঝিনি আমি নিখাদ আশ্বাসটুকু হতে পারে ভ্রম
কখনো ভাবিনি ওই সাতরঙা রামধনু কালো হয়ে যাবে
কখনো শুনিনি এই দেহ থেকে ছিন্ন হয়ে
নিজের সাম্রাজ্যে একা নিষ্ঠুর ও রূঢ়
হৃদয় দেবতা তুমি অতিকায় স্বৈরাচারী
                                                        হয়ে উঠতে পারো।


কস্তুরী সেন

বেত


প্রসন্ন ভোরের স্কুল, প্রসন্ন বারান্দা ধরে 'এই তোমরা এদিকে এসো তো'
গাছে গাছে পাখি চেনা, মধ্যপথে অনিচ্ছুক মেয়েরা ফুড়ুৎ -
অনিচ্ছা সর্বত্রগামী আছ প্রেত আছ আজ উপশমহীন
ত্রিসংসার অস্বীকার করে শুধু ফিরে এলে
রেখে তুমি কার শঙ্খে পাপমুগ্ধ মুখ
প্রসন্নতা লীলাসহচরী, ছিল তোমারও তো স্বপ্নে মধু দুগ্ধনিভ খাতা


হাত পাতছি, বাংলা কবিতা লিখব এই চেষ্টা ঢালাপাড়, 
অমিয়াদি, তীব্র ঘায়ে ছিঁড়েখুঁড়ে দিন!




বেবী সাউ 

নববর্ষ 


বয়েস অনেক হল
অন্যকিছু হল না সেভাবে 


জীবন গড়াল ঢের 
তাও আজ স্বপ্ন সবকিছু 


মনে হয়, জেগে থাকি 
গায়ের ওপর মন, 
জোর করে লাথি মারি 


তারপর...


এমন তারিখ থেকে তুলে নিই 
কাক আর কাকের পালক...



পৌষালী চক্রবর্তী

উলুপী


সে এক জলের দুহিতা
মহাকাব্য লেখেনি তার নদীভাগ্য কথা

 

স্তনবৃন্তে তিতা ঢেলে 
ছেড়ে গেছে সাময়িক শস্যস্রোতে মাতৃধারা জলভারানত
পিতৃবোধি ঘিরে তার নদীগর্ভে বৈধব্যের সকরুণ হাড়


অনঙ্গ তির গাঁথে গঙ্গাদ্বারে
প্রতিস্পর্ধী গান্ডীবে,  গান্ডীবে
সঁপে দেয় কামনার নাগিনী কুসুম


রক্তস্রোতে লোহিত শ্বেত , পাশাপাশি মিশে আছে লবণাক্ত ধারা


সেই নুন ছিটকে লাগে পিতৃনাদী যুদ্ধস্রাবে


নির্ধারিত দু'আধখানি পাতা
উগরোচ্ছে কুর্চীমালা অখণ্ড মণ্ডলে 
এক মাতৃকার শোকে
ইরাবান আত্মঘাতী পুনর্ভবা দেশে


অদিতি

স্তোত্র


স্থির হলেই কি শরীর, মন স্তোত্র হয়ে ওঠে? 
তবে কেন উচ্চারণে শুদ্ধ করে 
নিজেকে পাঠ করা হয়না বারবার?


যে মন অক্ষর শোনে, লিখে চলে মন্ত্র—
গ্রীষ্ম গেলে, আষাঢ় এলে একের পর এক কক্ষপথে
অনিয়মিত হয় যাতায়াত ক্লান্তির মতো।
লুকিয়ে রাখা সূর্য লেখে কথোপকথন;
কথায় কথা বাড়ে...
সহনে, গহনে পুড়তে থাকে আঁচে;
যেটুকু অক্ষয়, সেটুকুই সমগ্র উচ্চারিত হয় 


অনিবার্যতায়।


নাগালে আর আসে কই!
কোনো পয়ারের গভীর সুড়ঙ্গে জেগে থাকে হাঁ-মুখ হয়ে।



রঙ্গন রায়

দেশ


বর্ষাদিনে গজিয়ে ওঠা লকলকে তরুণ কচু পাতার
তরুণী ফার্ণকে প্রেম নিবেদন — ফৌজদারি মামলা ঘোষিত হয়েছে 
আদালত রায় দিয়ে দেবে খুব শীঘ্রই। 
যতদূর সম্ভব, মৃত্যুদণ্ড ছাড়া বিচারক আর কোনও সংবিধান জানেন না


'গাছ ও স্বাধীনতা সংগ্রামী    দেশের প্রয়োজনে জন্মায়'
এমন একটি ভাবনা ইদানিং কেউ কেউ ভাবছে 
ইহা সভ্যতার একান্ত জরুরী অবস্থান হওয়া উচিত ছিল


প্রতিটি যোনীপথের শেষে জঠর থাকে। অন্ধকার ব্রহ্মাণ্ড স্বরূপ। 
হে বিচারপতি, জন্ম অত সস্তা ভেবেছেন?



ধৃতিরূপা দাস 

উৎসব প্রবণতা 


মড়াটা পুড়ছে বলে প্রকৃত অপেক্ষায় লাইন রাখছে শুধু আরেকটা মড়া। আমরা নিমিত্ত মাত্র। আশেপাশে ঘুরি। নদীর কুয়াশা দেখি, কুয়াশার বাঁক, ছল নিয়ে ছলছল করে কূল। ওদিকে জীবন গাছে ঝুলে ঝুলে আছে আরও মড়াদের জামা প্যান্ট। গাছের পায়ের কাছে জীবনেরই নত কলসি, সরা আর ছাই। প্রত্যেকে নিজগুণে কত কথা বলে ওঠে ! আমরা নিমিত্ত মাত্র। ছেঁড়া ছেঁড়া কবিতা শুনতে পাই…

ক্রমশই কুঁজো হতে থাকা রোগা পিঠে রোদ, রোদের চাবুক থেকে আলো কী আলতো হাতে ধরে নিয়ে যায় কলা ঝাড়টির কোলে এসে বসা কচি সবুজের দিকে !

এ বড় অন্যায় ! আলো প্রতারক।



শাম্ব

সাধক


ত্রিভঙ্গ দান করতে পারো
পোড়া মাড়ির হাড়ে 
মাছের মতো টোপ গিলেছি
ছোবলে,মুদ্রাতে
কলের আগুন তোদের দোঁহার 
খোদার যেমন দোয়া
ভ্রমণে ভিখ সরীসৃপের 
উথলে ওঠা খোয়াব—
মাংস থেকে মাংসাশী প্রাণ
ভাঁড়ের মরা মাঠে
তাদের কথাও লিখতে হবে
পরবে, প্রচ্ছদে?
খুব যদি জল, বাদলা ধরো,
মিথ ও পাকস্থলীর
এখানে প্রাণ গোষ্ঠ করো
গাছের মতো দলিত!
গাছেরই গায়ে লিখতে পারি,
জমিনে ডুগডুগি...
যদি এ মন সাধক হতো
পয়ঃপ্রণালীটির?
বরং কিছু বাউল করো,
কিছুটা প্রস্থান… 
পুরুলিয়ার শ্মশান থেকে
মহুয়া এনেছিলাম
পাখি ওড়ার মতোই যদি 
এসব কিছুর প্রথায় 
আনার্কিতে আটকে থাকে
কিশোর এবং সুধা
এই যে সাঁঝে ঝুলছে নালক
মেধার মতো খাশি—
তোমায় দেখে ঘুমিয়েছিলো
গ্রামের ছোঁচা নদী
এতদ দৃশ্য আলতামিরা
পল্বলে, দেশভাগে
ইচ্ছামতীর চড়ায় বসে 
মনে পড়ছে মা’কে—
বৃথা এ মন, গ্রন্থ, সোহাগ , 
কামড় দিয়ে ছেঁড়া
ঝাপান গানে ভাসতে ছিলো  
লুটের বাতাসারা…
ভাসতে ছিলো পুঁজ ও থুতু 
ইচ্ছামতীর তীরে 
কোন কথা ঠিক লিখতে হতো
রবিবারের রাঁড়ে
বুঝিনি, তাই গোষ্ঠ করো
পিঁপড়ে সোনাগাছির
আমায় রেখে ঘুমিয়েছিল 
গাছের মতো দলিত—

4 comments:

  1. অসামান্য কাজ। প্রতিটি কবিতা নির্বাচনে সম্পাদক মন্ডলীর বলিষ্ঠতা ও যত্নের ছাপ নজর কাড়ে। পরবর্তী সংখ্যার জন্য আগ্রহ থাকলো। ধন্যবাদ টিম বান্ধব নগর

    ReplyDelete
  2. পড়লাম কবিতাগুলো। প্রতিটি কবিতাই স্বতন্ত্রে সমুজ্জ্বল। চমৎকার লাগলো।

    ReplyDelete

প্রবন্ধ : ফজলুল করীম

মার্কিন সাম্রাজ্যের সাহিত্যিক ময়নাতদন্ত সাম্য রাইয়ান-এর উপন্যাস ‘সকল প্রশংসা মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের’ সমকালীন বাংলা সাহিত্যের এক অত্যন্ত সাহ...