Wednesday, February 25, 2026

গুচ্ছ কবিতা : রাধাবল্লভ চক্রবর্তী




দেশে 


স্বপ্নের ভিতর অন্য স্বপ্নের মতো দেশ। শস্যশ্যামলা। 

কিন্তু, স্বপ্ন নয়, সত্য শুধু তা-ই: 

যে রোজ জোছনা পোহায় রাতে, আমার 

সাথে গল্প করে; আমিও অনুরূপভাবে বয়ে 

চলা শতদ্রু-বিপাসা-গঙ্গায় ডুব দিয়ে

স্নান সেরে উঠে আসি চরাচরে, ধূলিময় 

পাড়ে। সে বলে: ‘বাঁচো — প্রেরণা নাও —

আবর্তন করো বেঁচে থাকা, কঠিন অনুজ্ঞায়, 

সুললিত প্রেমে — একদিন বাঁচবে না, জানি 

যদিওবা, এখনই যেয়ো না সেই ভবিষ্যের 

নরকে নেমে’ — এরপর থেকে যায় সে। 

চিরকালীন নীরবতা। এবং ভীষণভাবে জীবিত কি 

আমি? দুঃস্বপ্নের মতো মনে হয় এই দেশ 

তবু আজ — না, কোনও কান্নায় নয়, কষ্টে 

নয়, সফলতা বা বিফলতার দ্বন্দ্বেও নয়; 

ভবিষ্যহীন আমি স্নান সেরে উঠে আসতে 

পারি না, ডুবে যাই! আমারই একদা স্বপ্নের 

দেশে বয়ে চলা শতদ্রু-বিপাসা-গঙ্গায়। 




মর্মর 


প্রবাহের মধ্যে শুধু মুখ পাওয়া গেলে, সে

প্রবাহে খণ্ডতা, অস্তিত্ব, যাতনা বা মর্মরও

ধ্বনিত হ'বে। এখন আমি বা তুমি, তুমি বা 

অন্য কেউ ছুটে যাই একে অপরের দিকে

শুধু শিকারের লোভে — সে পতন চোখে 

আমি দেখিনি, শুধু, কানে শুনে কোনওভাবে

স্পৃষ্ট হয়েছি। তোমার এখনও দুর্দিনে কেউ 

নেই; আজ তবে যাপন বলতে বোঝায় 

সমভিব্যাহারে গিয়ে সমব্যথী হওয়া ও ফুলের 

শোকের সাথে মানুষের শোকের তুলনামূলক কোনও

তুলনা করা? পাকেচক্রে বেঁচে আছি আমিও

যেহেতু, সেহেতু সামিল হই নিয়ম ক'রে, 

লঘুতা বা গণতন্ত্রে বা কোনও ভিন্নতর রোমন্থনে —

এক থেকে একাধিক হ'য়ে যেতে হয় স্বভাবত

অথবা স্বরূপ চিনে ফেলবার আগে, শত শত 

সারিবাঁধা মুখ, ধ্বনিত হয় অতি মিলিতভাবে, 

হ'য়ে একটি মুখের অনুগামী — সে প্রবাহে

অবিশ্বাস ছিল? যন্ত্রণা ছিল? মর্মর ছিল জানি। 




কবিতা 


অভিযোজিত হ'তে চেয়ে, যেন-বা শিকার, শিকারীর 

অতন্দ্র ডেরায় ঢুকে গেছে। এখনই দৃশ্য তৈরি 

হ'বে তবে? এখনই কি চিৎকার তবে পৃথিবীর 

আছে যত অন্ধকার, গহ্বর ও শূন্যস্থান, তাদের 

ভরিয়ে দেবে? জানি, তোমার স্পর্শে এখনও 

সকল ধ্বংস সেজে ওঠে। এইসব পুণ্যবেদীতে

মাথা ঠেকাবার আগে, এসো, মন্ত্রস্নান সেরে নিই — 

যদিও জানি আমি, তোমার ভূগোলে কোনও নদী 

নেই আর, মরে গেছে — তবুও কী অবাক উপায়ে

আমার সকল চর জানে, তোমার বন্দর, নৌকাডুবি 

বা উপকূলের কথা — জোয়ার-ভাটার এই

সতর্কতা, যুগপৎ বিস্ময়ে বিস্মিত করে আর 

অশনির সঙ্কেত দিয়ে চলে যায় — আমার 

মুগ্ধতা নেই; আমার মুক্তিও নেই! কেবল 

এক অজানা কারণে ভয় আসে, দু'চোখ ভিজে 

যায় চোখেরই জলে; শরীর কেঁপে ওঠে, চিৎকার 

ক'রে বলে: ‘আমাকে জড়িয়ে নাও আশ্লেষে, নয়তো 

এখনই, আমাকে হত্যা করো — দৃশ্যটি সরার আগেই!’




সরকার 


তোমার অশ্রুসজল এই দুনিয়াদারিতে, কে যেন নিশ্চুপে 

ফলিয়ে দিয়ে গেছে ধান। আজ এই রাত

সব বোঝে: কে চায় শরীর আর 

কে চায় শরীরের আড়ালে শরীরহীনতাকে। আমি 

আজ তবে কাকে পাথেয় করি? শবাসীন

জীবনের হাড়গুলি খুলে খুলে দেখি, কতটুকু 

সামর্থ্য পড়ে আছে তার, বজ্র অথবা আরও

বিবিধ আয়ুধ হ'তে — একই একই যন্ত্রণা, 

নির্দেশ, চিৎকার, সংগ্ৰাম; মিডিয়া দেখায়

আমার ভাষা আমি কেন আজ বলতে

পারি না? কেন যে সকল ক্ষতি রাজনৈতিক 

হ'য়ে পড়ে! অথচ ঘুরিয়ে আমি কাকে 

প্রশ্ন করি, বলো? হয়তো ফিরিয়ে দেবে; 

হয়তো কারওর কাছে তার কোনও উত্তর নেই —




কীর্তন 


একটি নীরবতা আমাকে জন্ম দিয়ে যেন 

প্রবাহে ভাসিয়ে কোনও নরকের পথে চলে 

গেছে। প্রতিবার ভেঙে পড়ি আমি; নিয়মিতভাবে, 

প্রতিবার সরীসৃপের মতো চলাফেরা করি। 

আমার মৃত্যু নেই — কে যেন হরণ ক'রে, 

নিয়ে চলে গেছে তা-ও! কোথায় ঈশ্বর? 

কোথায়-বা কে! তবু দুন্দুভি বাজে, কীর্তন, 

শ্রীখোল শুনি। পরিচিত মাঠ-ঘাট-নদী-নালা-গ্ৰাম,

জানি না, কীভাবে, অচেনা হ'য়ে পড়ে — 

ঠান্ডা রক্তস্রোতে ইতিহাস ভিজে গেল নাকি? 

প্রতিধ্বনি মানে ঈর্ষা-দ্বন্দ্ব-সন্দেহ।  এই 

পাকদণ্ডীতে তোমার ক্লান্তি আসে না? 

তুমিও কি দিন-প্রতিদিন, পান করো আমারই 

মতন গরল? কে যে কবে ঋতুমতী হ'ল

আর স্খলিত হ'ল, জানি না, বুঝি না; 

হয়তো-বা নীরবতা আমাকে হত্যা ক'রে দিয়ে, 

অতল ক্লান্তির পথে কবেই চলে গেছে... 




অদ্ভুত


(উৎসর্গ: জীবনানন্দ-কে)


কিংবদন্তী হ'য়ে যাওয়া, সেইসব শেয়ালেরা আজ 

জেগে ওঠে। কোনও প্রেরণায় নয়, শিকারের

লোভে বা বহুবিধ তাড়নায়ও নয় — তোমার 

মুখ থেকে ছল‌কে পড়ে কথা, যখন 

কোনওদিকে কোনও পথ নেই — পথগুলি নিজেই 

যেন গুটিয়ে ফেলেছে নিজেদের। অদ্ভুত আঁধারের 

মাঝে, আমরাও জেগে থাকি সমাহিত হ'য়ে, 

বাস্তুভূতের মতো ক'রে। তোমাকে ফিরিয়ে দিতে 

কষ্ট হয়, তবু, ফিরিয়ে দিয়েছি, কেননা, 

আমার কাছেও কত ছোবল ও নিরাময় আছে

No comments:

Post a Comment

প্রবন্ধ : ফজলুল করীম

মার্কিন সাম্রাজ্যের সাহিত্যিক ময়নাতদন্ত সাম্য রাইয়ান-এর উপন্যাস ‘সকল প্রশংসা মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের’ সমকালীন বাংলা সাহিত্যের এক অত্যন্ত সাহ...