চিঠি-বাক্স
শুনশান দুপুর। শুকনো পাতার উড়ে যাওয়ার শব্দ ছাড়া আর কোনো শব্দ নেই। ঠিক সেই সময়ে অন্ধকার সিঁড়ির তলায় রাখা পুরোনো খয়াটে চিঠি-বাক্সের মরচে পরা কুলুপটার খোলার জোরালো শব্দ হয়।শান্ত দুপুরটাকে সশব্দে কেউ যেন ভেঙে খানখান করলো। ধুলো পড়া সিঁড়ির তলায় ত্রস্ত পায়ের আওয়াজ ও স্পষ্ট শোনা গেল।
এই সময়ে একতলায়, কোণের আধভাঙা দরজাটা নিঃশব্দে খুলে যায়। ভীরু এক মেয়ে, মণিমালা, সাবধানে চিঠি-বাক্সের কুলুপ খোলে। নতুন কাগজের খসখস শব্দ স্পষ্ট শুনতে পাওয়া যায়।মণিমালা কাঁপা হাতে চিঠি লুকোয় বুকের ভাঁজে। এর চেয়ে নিরাপদ জায়গা আর কোথায়! শালিক পাখির মতো ঘাড় ঘুরিয়ে এদিক ওদিক দেখে। তারপর দরজায় আওয়াজ না তুলে, ঘরে ঢুকে যায়। ভেতরের ঘরে জেগে থাকা বুড়ি আম্মা গলা তুলে হাঁক দেয, “দরজার আওয়াজ হলো। কে এলো!” মণিমালা সাড়া দেয় না।সে তার আধো অন্ধকার ঘরে, জানালার ধাপে বসে। হাঁফায়। সে কুঁচকে যাওয়া খামটা আঙুল বুলিয়ে সমান করে। তারপর নরম হাতে চিঠি বার করে। ওদিকে, সামনের হলুদ বাড়ির সাদা পর্দা হাওয়ায় দোলে। নড়েচড়ে-অচেনা মানুষের চেনা ছায়া!
মণিমালা গোপন চিঠির সোঁদা গন্ধ নেয় চোখ বন্ধ করে। একলা দুপুরে, আবছায়া মনে, চিঠির এলোমেলো কথায় ডুব দেয়। সাদা কালো শব্দের সঙ্গে কথা বলে। সময় গড়াতে থাকে।
দুপুর গড়িয়ে যায়। পড়ন্ত বিকেল এলোমেলো হয়ে যায়। হলুদ বাড়ির পর্দা আর নড়ে না। মণিমালা বিমনা মনে ঘরের কাজ সারতে থাকে। পাশের ঘরে, বৃদ্ধা আম্মার বকবকানি চলতে থাকে। সাঁঝ-পাট সেরে মণিমালা এবার বাক্স খুলে চিঠির বান্ডিল নামায়। রেশমী ফিতের বাঁধন খুলে, বিছানায় বিছায় সেই চিঠির রাশ। আবার গুছিয়ে রাখে। এ তার বড়ো প্রিয় কাজ। তারপর অন্ধকার রাত নিজের নিয়মে আসে।আম্মা ঘুমের মাঝে কথা বলে। সে উত্তর দেয় না। তার বুকে তখন ঢেউ।
রাত গভীরে, নীলচে আলো জ্বেলে, সে চিঠির উত্তর লিখতে বসে। শব্দের কবিতা তৈরি হয় নিকষ অন্ধকারে।অন্ধকারে চুঁইয়ে পরে নিঃশর্ত রক্ত। মণিমালা জেগে থাকে রাতভর। রাত শেষে সে নিঃশব্দ পায়ে সাবধানে সদর দরজা খুলে, অন্ধকার চিঠি-বাক্সের গোপন গর্ভে উত্তর রেখে আসে। আম্মা শুনতে পায় দরজা খোলার শব্দ। চেঁচিয়ে গাল পাড়ে। সে ঘরে ফিরে আসে। ভোরের বাতাসে তখন নিশ্চিত আশ্বাস। মণিমালা ঘুমিয়ে পরে।
দিন যায়। রাত যায়। মাস যায়। বছর ঘুরে যায়। একদিন শীতের ভোরে হলুদ বাড়ির ভাড়াটিয়া ভাড়া গাড়িতে মালপত্র গুছিয়ে নিয়ে বিদায় নেয়। গলিতে শীতের কনকনে বাতাস বয়ে যায়। মণিমালা জানলার ধাপিতে একা বসে থাকে। হঠাৎ তার খুব শীত করে। পাশের ঘরে আম্মার সাড়া শব্দ নেই। শীতে কুঁকড়ে গেছে আম্মার শরীর। গায়ের চাদরটা সাপটে ধরে, মণিমালা চায়ের জল চাপায়।
ঋতু আসে। ঋতু যায়। সিঁড়ির নিচে চিঠি-বাক্সের এখন কোনো কাজ নেই। বাতাসে দোল খায় ছোট দরজার কুলুপ। এক পায়রা দম্পতি ইতিউতি ঘোরে। বোধহয় চিঠি-বাক্সে বাসা বাঁধবে তারা! মণিমালার হেলদোল নেই।
বসন্তের প্রথমে,হলুদ বাড়ির রং হয়। জানালা-দরজা খোলে। ভাড়া গাড়িতে নতুন ভাড়াটে আসে। সিঁড়ির অন্ধকারে আলো ফোটে। মণিমালা জানালায় দাঁড়িয়ে, তার মেঘের মতো চুল আঁচড়ায়। তার সারা শরীরে বাসন্তিক ইঙ্গিত। হলুদ বাড়ির সাদা পর্দায় অচেনা মানুষের ছায়া। চিঠি-বাক্সের কঠিন কুলুপ নড়েচড়ে। ভাঙা দরজা আবার নিঃশব্দে খুলে যায়। আম্মা নিজের মনে বকবক করে। মণিমালা আবার রাতে জেগে থাকে— নীলচে আলোয় স্বপ্ন দেখে। তার চোখে সুখ উপচে পরে। চিঠি-বাক্সের এখন অনেক কাজ। পায়রা যুগল ডানা ঝাপটায়। তাদের নিশ্চিত আবাস আবার অনিশ্চিত!

Khub sundor hoyeche golpo ta
ReplyDeleteThis comment has been removed by the author.
ReplyDelete