Monday, August 24, 2026

গুচ্ছ কবিতা : সিদ্ধার্থ মিত্র

 





লীলা


মধ্যরাতে রাইকে ঘুম থেকে জাগিয়ে দেখি

তখনও তার চোখে নক্ষত্রবাস কৃষ্ণপ্রেমী।

ক্লান্ত তাম্রযুগ পেরিয়ে আলুথালু পৃথিবী,

বৃষ্টির গোপন স্নানে ধুয়ে দিয়েছে যৌনপ্রবৃত্তি

বক্ষে তার জেগে অচেনা সমুদ্রপথ, বৃন্দাবন

চন্দ্র যেন নাভিতে রেখেছে তরল অগ্নিফোঁটা,

আজানুলম্বিত চুলে বসুন্ধরার বিস্মৃত সন্ধ্যা।


আমি ডাকতেই, ফিরে তাকাল রাই—

চোখে চন্দনবাস, যেন মহাপ্রলয়ের আলো।

তীব্র তেজে জাগ্রত কৃষ্ণ লীলাক্ষেত্রে প্রলয়;

তুলেছে স্তব্ধ সুর বাঁশির মৌনব্রত ছন্দোময়

জানালার ওপারে সেজে মায়াধাম ব্রজবুলি

কদমফুলের কন্দে জাগ্রত মোহন পদাবলি।


রাইয়ের নূপুরে চিত্রিত জোড়া নীল পালক—

কেকাধ্বনি, স্পর্শ করতেই কেঁপে ওঠে পূর্বজন্ম

কে জানে কোথায় তার প্রেমময় ভোগ্যরূপ

আসলে পণ্য নির্বাসন, শরীরের বিপরীত গমন

কোনো কি অদৃশ্য নদীর নাম, বিস্তীর্ণ পথ

যেখানে রাধা ছাড়া নেই কোনও নারী,

কৃষ্ণও তো নয় কৌলিন পুরুষ সম্বল

দুজনের আলিঙ্গনে অসমাপ্ত মহাকাশ


সেই রাতে উঠেছিল ঘনচাঁদ শরীরে পবিত্রভোগ

যেন পৃথিবীর কানেকানে নিষিদ্ধ বলয়ে মন্ত্রযোগ

রাই ঠোঁট ছুঁয়ে বলে —

“যে আমায় পায়, সে চোখ কৃষ্ণ হারায় ;

যে চোখে কৃষ্ণপ্রেম, সে আমায় রাখবে কোথায় ?”

দূরে তখনও বাজছিল বর্ষামঙ্গল—

আমাদের ভালোবাসা জুড়ে সমস্ত সকাল





নিকোটিন


বাবা ছিলেন চেইন স্মোকার 

অক্ষরজ্ঞানের আগেই হলুদ রঙের সিগারেটের প্যাকেট দেখে চিনেছিলাম— চারমিনার

ধীরে ধীরে বাবাকে গ্রাস করল হাঁপানির টান আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ধরল ইতিহাস

তবু কাশতে কাশতে বাবা বলতেন চারমিনারের গল্প


বড় হয়ে বুঝলাম চারমিনার মানে

দেশের আবেগ

যাতে ইতিহাস ঢুকে পড়ে তামাকের কটুগন্ধে

গম্বুজের সুখ টান কিছুটা হলেও আগুন ধরিয়ে ছাই ঝরায়


ইতিহাস ও ধুম্রপান রাষ্ট্রের স্বাস্থ্যের পক্ষে ক্ষতিকর





তালপাতার সেপাই


পাথরের'পর পাথর সাজিয়ে অনর্গল ডাকে

আয় আয় স্বাধীনতার বিন্যাস কৌশল সময়

বুকের মানচিত্রে গাঁথা তালপাতার সেপাই

পরশ বুলিয়ে হাওয়ার দক্ষিণ দুয়ার ছুঁয়ে

একাকী গম্বুজ দাঁড়িয়ে আকাশের মাথায়

চারিপাশে আবর্ত প্রেম জড়িয়ে জাঁঝিসুতো

এলোমেলো পাক ঋতুর আশ্রয়ে বসন্তোৎসব

আবির মাখায় চাঁদের গায়ে হলুদের ছোপ

এঁকে বেসুরো সানাই বাজে মেহবুবের ঘরে

দৈন্য ক্ষুধার ধান নড়ে চৈত্রের ফসল পুড়ে

আগুনসম পূবের পাহাড় অযত্নে বিছিয়ে

শঙ্কার ডমরু চেয়েছ বিদায়, কাব্যিকরূপে

হে আবির্ভাব সকল পুরুষ এক হও নির্বিঘ্নে

সচেতন ঈশ্বরসম্ভবা ঝঞ্ঝার অপেক্ষায়

ভেঙে দিক প্রাচীন জড়তা, গম্বুজ, স্তোত্রপথ

বিদায় স্তব্ধ হোক শঙ্কার ডমরু, লাগুক আগুন

ভিজুক বাদলস্নাত বাজু, দেহ, একাকী জীবন  

মেঘে অচিন্ত্য শোভা, শোকবিলাপ বক্ষলোভ

দক্ষিণ দুয়ার পেরিয়ে কাঙ্ক্ষিত আদল ভরা

সকাল পুরুষ মানচিত্র জুড়ে জাগুক মানুষ

ফিরে আসুক নারী, ফিরে আসুক অনন্ত হুঁশ





বুনো চাঁদ


ঘুমজড়ানো চোখে ডেকে তুলেছে

জ্যোৎস্না, অপরূপ দৃশ্যে দাঁতাল হাতি

নাচে শরীরের গোপন অরণ্যে;

পাশে তখন বইছে এক আদিম নদী

তোমার শরীর বেয়ে হরিণীর দল

ছুটে যায় আসন্ন উচ্ছ্বাসের দিকে।


উন্মত্ত বুক খুলে মুঠো করে ধরি

জ্বলন্ত পাহাড়, আগ্নেয়গিরি

অনভিজ্ঞতার দুর্গম ভূখণ্ডে

এক এক করে খসে পড়ে

সঙ্গমের কয়েকটি পাথর—

নামহীন দুই প্রাণী পাশাপাশি

নিজেদের আবিষ্কার করি

জ্যোৎস্নারও আগে জন্মানো

উপবাসী এক একাদশীর চাঁদ





অন্ধ বালক


ওহে অন্ধ বালক, পাঞ্চজন্য তার হাতে কি

একদা যে হতে চেয়েছিল বংশীবাদক কানাই

নীরব ঘাতক খুবলে নিয়েছে বাহু তার, তাই

মৃদু আন্দোলনে কেঁপে ওঠা বাতাসে দেখি

কণ্ঠ রোধ করা সুরে মাউথ অর্গান খসে

তবু  বাজাবে বলে চেয়ে নিয়েছিল স্বরগম

সাদা কালো বাহান্ন রিডের হারমোনিয়াম

পাঁজরে বিদ্রোহী কবিতার আসর বসিয়ে

ওহে ঘাতক, ওহে অন্ধ বালক, অম্লান হাসি

গল্পের খাতায় তুমিই কি সত্যিই দিব্যসুন্দর?

আজো কি চলেছ বাজিয়ে, চলেছ দূর

বাজিয়ে নিজের ভেতর, অনন্ত এক বাঁশি?

No comments:

Post a Comment

গুচ্ছ কবিতা : অরিজিৎ ভট্টাচার্য

নদীর কাছে নদীর প্রেমিক তুমি— শামুকের খোলসে ঘুমিয়ে থাকা একটি প্রাচীন বিকেল, স্রোতের নিচে কাঁপে অদৃশ্য কোনো ঘণ্টাধ্বনি। তুমি জলের ভাষা জানো, ত...