Tuesday, September 8, 2026

গুচ্ছ কবিতা : তনুশ্রী কার্তিক


 



শান্ত বিরতি


যতবার পথের কথা উঠেছে,

ততবার এসেছে পথিকের কথা,

হেমন্তকালের কথা—

কেউ কেউ গন্তব্যে পৌঁছেছে,

কেউ কালের ভিতরেই রেখে গেছে

তার সমস্ত যাত্রা।

ফিরে আসা অসম্ভব এক পথের নাম।

একবার পথ মুছে গেলে

চরণ অবলুপ্ত হয়ে যাবে—

তবুও আমরা অনুপস্থিতির দিকেই পথ হাঁটি—

যেন জন্ম থেকেই বিদায়ের দিকে সমস্ত পথরেখা টানা ছিল; যাকে গন্তব্য বলে ভুল করি প্রতিদিন,

তা আসলে এক ছায়াবৃত শান্ত বিরতি—

যেখানে পৌঁছে সমস্ত নাম মুছে যায়

শূন্য পথের উপর হেমন্তের বাতাস

চিরকাল কাঁপতে থাকে...





নিঃশব্দ পদাবলী 


কখনো কখনো কোনো ফুলের গন্ধ

আমাকে অকারণ বিষণ্ন করে তোলে।

কোনো কোনো সন্ধ্যার ধীর আলো 

আমার নাম মুছে দেয়।

শরীরে তখন কেবল জ্বর আসে;

যেন বহু জন্মান্তরের ভুলে যাওয়া কোনো বসন্তের দাহ,

যেন-বা কোনো নিভে যাওয়া চাঁদের আলো

আবার নিঃশব্দে জেগে উঠেছে আমার রক্তের ভিতর।


অন্ধকার নিজের উৎসের নাম ধরে

অনন্তের ভেতর মাথা ঠুকে মরে—

নিঃশব্দ পদাবলীতে রাখি অনাহত বাঁশি—

যে সুর কোনোদিন বাজানো হয়নি,

তবু রাতের বাতাস তার আশ্রিত হয়ে ওঠে...


শেষপর্যন্ত সব নাম ঝরে যায়...

কিছু আলো মুছে যায় এই মর্ত্যের ধুলায়—

যদি রক্তে আবার দোলা দেয়

বহুজন্মের সেই অলৌকিক বিষাদ,

যদি কোনো ফুলের সুগন্ধে

কোনো বিস্মৃত কান্না জেগে ওঠে—

তবে এই আমার শেষ চরণ।





শূন্যভরা শ্লেট


​প্রথমবেলায় বাবার মুখে মুখে একেচন্দ্র আওড়েছি

শ্লেট ভরিয়েছি শূন্য লিখে—

​কাল রাতে বাবা জানালার কাছে এসেছিল।

হাওয়ায় চোখ বুজে আসছিল আমার

জানালার ওপারের অন্ধকার নীরবে আমার শৈশব ফিরিয়ে আনছিল

বহুদিন আগে যে হাত আমার কপালে ঘুম এঁকে দিত, সেই হাত এখনও রাতের ভেতর দিয়ে হেঁটে আসে।

​আকাশে তারা ছিল না। কেবল পাতা নড়ছিল অল্প অল্প।

মনে হচ্ছিল, গাছেরা বিদায়ের ভাষা জানে; তাই তারা এত কম শব্দ করে।

দেয়ালের ছায়া দীর্ঘ হয়ে আমার শৈশবের পাশে এসে বসেছিল।

​কোথাও কোনো শব্দ ছিল না—

শুধু নিঃশ্বাসের মতো

একটু একটু করে গভীর হচ্ছিল রাত্রি...

অন্ধকার হাতড়ে শ্লেট খুঁজি—

একটি জানালা সারারাত খোলা থাকে,

অন্ধকারের ভিতর একটি শিশু বাবার কণ্ঠস্বর ধরে

একেচন্দ্র আওড়াতে থাকে।





নীলনকশা


যখনই দূরে কোথাও যাওয়ার কথা ভাবি,

সমস্ত পথ আমার মুখোমুখি এসে দাঁড়ায়—

নতুন শহর, নতুন নদী, নতুন আকাশ

আরও দূরের দিকে ইশারা করে।


প্রতিটি স্বপ্নের পাশে বসে থাকে—

একটি শীতল শ্মশান।

ধোঁয়ার ভিতর হারিয়ে যেতে যেতে

সে যেন আমার শেষ যাত্রা এঁকে রাখে।


জানি না, কোন পথে গেলে ফিরে আসা যায়,

কোন নদী পার হলে মানুষ নিজেকেই হারায়।

একটি অদৃশ্য বিদায় জন্মের পর থেকেই

আমার পাশে পাশে হাঁটে—

কখনও ছায়া হয়ে,কখনও বাতাসে

 ভেসে আসা কোনো পুরোনো গন্ধ হয়ে,

কখনও অকারণে থেমে যাওয়া

একটি বিকেলের মতো।


যত দূরে যাই,

তত গভীরে নিজেরই অনুপস্থিতির দিকে নামি।

প্রতিটি পথ আমাকে আমার কাছ থেকে

একটু একটু করে সরিয়ে দেয়।


তবু আমি আরও একবার দূরের দিকে তাকাব—

পাখি উড়ে যাক,

নদী তার জল নিয়ে যাক বহুদূরে।

সময়ের অনুরণনটুকু থেমে গেলে,

সমস্ত পথ অন্ধকারের দিকে নেমে যাবে।





নীলনকশা


যখনই দূরে কোথাও যাওয়ার কথা ভাবি,

সমস্ত পথ আমার মুখোমুখি এসে দাঁড়ায়—

নতুন শহর, নতুন নদী, নতুন আকাশ

আরও দূরের দিকে ইশারা করে।


প্রতিটি স্বপ্নের পাশে বসে থাকে—

একটি শীতল শ্মশান।

ধোঁয়ার ভিতর হারিয়ে যেতে যেতে

সে যেন আমার শেষ যাত্রা এঁকে রাখে।


জানি না, কোন পথে গেলে ফিরে আসা যায়,

কোন নদী পার হলে মানুষ নিজেকেই হারায়।

একটি অদৃশ্য বিদায় জন্মের পর থেকেই

আমার পাশে পাশে হাঁটে—

কখনও ছায়া হয়ে,কখনও বাতাসে

 ভেসে আসা কোনো পুরোনো গন্ধ হয়ে,

কখনও অকারণে থেমে যাওয়া

একটি বিকেলের মতো।


যত দূরে যাই,

তত গভীরে নিজেরই অনুপস্থিতির দিকে নামি।

প্রতিটি পথ আমাকে আমার কাছ থেকে

একটু একটু করে সরিয়ে দেয়।


তবু আমি আরও একবার দূরের দিকে তাকাব—

পাখি উড়ে যাক,

নদী তার জল নিয়ে যাক বহুদূরে।

সময়ের অনুরণনটুকু থেমে গেলে,

সমস্ত পথ অন্ধকারের দিকে নেমে যাবে।

No comments:

Post a Comment

গুচ্ছ কবিতা : মৃণালেন্দু দাশ

বিশ্বস্ত কিছু কথার পাশে     চড়ুই বাসা বাঁধছিল অনেকটা পূজার ডালার ছোট্ট ঝুড়ির মতো  উঠোন বাগানের টগর গাছের চার ডালের পাতায় ঘেরা মাঝের সুরক্...