১
কলকাতা নর্থের বেণীকরা দীঘল মেয়েটি -
ছোটবোন কেমব্রিজে পড়ে, স্যাঁতসেঁতে কানাগলি
মধ্যবিত্ত রোয়াকের সংকীর্ণ ফাটলের গা'য়;
যেটুকু রোদ্দুর লেগে থাকে,
তাই নিয়ে আজীবন পাতালেই রয়ে গ্যালো এ'টি।
তবু নারীরও তো কথা থাকে।
কপালের ফের আর সিন্দুকে
তুলে রাখা তালাবন্ধ খোয়াবের কথা।
নারীরও তো ঋতু আছে....
সবকটি ঋতুতেই কমবেশি লেগে আছে শীত।
উত্তাপপ্রার্থী এক নিঃসঙ্গ তুষারের ঢিপি আর
চিবুকের সামান্য হরিৎ!
কালাপানি পার করে কাহাতক চার্লস নদী
খানকয়' প্রেমিকের চিঠি, রোগের ফিরিস্তি আর
গুনীনের জলপড়া - এই নিয়ে সামান্যা মেয়েটি।
তবুও যখন, আমাদের দু'জনার ছায়ার দূরত্বটুকু
একেবারে মুছে দিয়ে পৃথিবীর বুকে নেমে আসে
সন্ধ্যের মরে আসা আলো; সাধ হয়-
ওর দু'টি হাত ছুঁয়ে বলি,
"নিষিদ্ধ মহাদেশে শতবর্ষ পর
মুখর পদচারণা তুমি।
তুমি মৃত্যুর চেয়ে কিছু ভালো!"
যা কিছু মৃত্যুর চেয়ে ভালো
২
গতকাল মঞ্জরী এসে
বলে গেছে, আপনি একটা ভীতুর ডিম।
আপনি কেবল পালিয়ে পালিয়ে বেড়ান।
জানলা দিয়ে বকের মতো মুখ বাড়িয়ে
এক ঝলক দেখেছি ওকে, ফিরে যেতে।
জানেন ও আমাকে ছোঁয়নি কোনোদিন, আমিও ওকে...
তবুও কীভাবে যেনো জানি, ওর স্পর্শ খুব নরম!
গেলো শীতে দিল্লি থেকে ফিরতি ট্রেনে
সারাটা পথ ওর নরম দুটি হাত মুঠোয় পুরে রেখেছি...
নিজের মনেই। নিজের মনেই বারকতক বলেছি,
দেরাদুন যাওয়া হয়নি, মঞ্জরী।
বেড়ালটার কি জানি কি অসুখ!
মায়ের শরীরটাও তেমন একটা...
তোমার বাড়িতে একদিন যাবো, বুঝলে।
তোমার হাতের এককাপ চা- ই নাহয়...
ইশ!
সমস্ত দুনিয়াটা যদি মঞ্জরীর হাতের স্পর্শের মতো সুন্দর হতো!
গতকাল মঞ্জরী এসে
বলে গেছে, এ ই শেষ। ও আর আসবেনা।
আমি জানলা দিয়ে বকের মতো মুখ বাড়িয়ে
ওকে মিলিয়ে যেতে দেখেছি ওর চাইতে অনেক বেশি অসুন্দর মানুষের কদর্য একটা ভিড়ে।
যাবার আগে আমি ওর
হেনায় রাঙানো হাতদুটো
দুহাতের মুঠোয় চেপে ধরে বলেছি,
ঝড় উঠবে মঞ্জরী! খানেক বসে যাও।
চায়ের জল ফুটছে...
নিজের মনেই...
অন্তর্মুখী
৩
বিষন্নতার সেই সাতটি নীল মাছি
গত রোববার থেকে আবারো এসে জুটেছে
মাথায়, ওদের দুটি অনর্গল পাখাকে ক্রমশই
ডানা হয়ে উঠতে দেখছি তারপর থেকে।
শুনছি উপকূলে আবারো মাথাচাড়া দিয়ে
উঠছে একটি জান্তব বর্ষা।
এখন পরপর দুটি দিন কেবল অন্ধকারে ভিজে থাকবো।
একটি বিস্ময়কর উচ্চতা থেকে
একটানা জলের শব্দ কানে লেগে আছে
গত রোববার থেকে।
তোমার চিন্তা বিরতিহীন তেষ্টার মতো
সারা দুপুর আমাকে দিয়েছে অভাবনীয় মাদকতা!
তোমাকে আর ভালোবাসিনা - এই কথাটুকু
চাউর করেছি বলে এখন আমার আক্ষেপ হয়।
বন্ধুরা জানিয়েছে এখনো পুরোপুরিভাবে প্রকৃতিস্থ আছি।
খানিকটা বিরক্ত হয়েই উগরে দিয়েছি
মোলায়েম হৃদয়ের কচকচি।
তোমরা যারা আমাকে ভালোবাসো তারা
জেনে রেখো আমাকে ছেড়ে যাবার মতো
সহজ কাজ আর দুটি নেই।
বিষন্নতার সেই সাতটি নীল মাছি
গত রোববার থেকে ভনভনিয়ে উড়েই চলেছে
মাথায়, ভালো না লাগার এই দুরারোগ্য ব্যধি
আর বেশি বাড়লে আমি একদফা ঘুমিয়ে নেবার
সিদ্ধান্ত নিয়েছি।
তোমরা যারা আমাকে ভালোবাসো তারা
আমার মৃত্যুর পর আমাকে দু'একটি চিঠি লিখো!
কি ভীষণ মূর্খতা
৪
ঘুরন্ত চাকার সাথে দৈবাৎ যেমন
বেখেয়ালে জড়িয়ে যায় মেয়েলি ওড়না
অথবা কমবয়েসী শাড়ির আঁচল
মানুষের সাথেও মানুষ তেমন জড়িয়ে গেলে
তারপর ছেড়ে যাওয়া যায়।
তারপর ছেড়ে যাওয়া সাজে।
ছেড়ে যাওয়া কর্তব্য
যাতে অকস্মাৎ নিষ্ক্রমণের এই হ্যাঁচকা টানে
টাল সামলাতে না পেরে একেবারে মুখ থুবড়ে পড়ে
বিপরীতে বসে থাকা একটি আনকোরা সুস্থির হৃদয়।
যেনো সামান্য পিষে যায়।
অনর্থক রক্তপাত হয়।
যেনো তার আগাগোড়া শরীরী কাঠামো
অথবা নিদেনপক্ষে মুখের আদল এমন ভ্রংশ হয় যাতে
তাকে পূর্বপরিচিত বলে কারো একচুল সন্দেহ না হয়।
হে চাকা! হে ক্ষমাহীন চাকা সময়ের -
গড়াতে গড়াতে এসে এই অহেতুক প্রাচুর্যকে
এইভাবে পিষ্ট করো যাতে; তাকে চিরন্তন সারবস্তু বলে
কেউ আর গ্রাহ্য না করে।
চোখের সামনে
তবু, যেনো সে অদৃশ্যবৎ থাকে।
দিবাস্বপ্ন যত আছে একে একে ছত্রাখান করে
মানুষকে টেনে এনে দাঁড় করাও পূতিগন্ধময়
এমন এক পিচ্ছিল ভাগাড়ে যাতে চুমু খেতে বমি ঠেলে আসে।
সুনিশ্চিত করো ছেড়ে যাওয়া।
মানুষকে মানুষের থেকে এতদূরে নিয়ে যাও
যাতে দূর থেকে দেখে মনে হয়,
ভালোবাসা....অন্ধবিশ্বাস বৈ
আর কিছু নয়!
প্রেজুডিস
৫
শুধুমাত্র অর্থাভাবে
সবকটি ভালোবাসা ভেস্তে যাবে।
শুধুমাত্র অর্থাভাবে মানুষেরা
আসবেনা কাছে, কিংবা এসেও ফিরে যাবে।
শুধুমাত্র অর্থাভাবে
চিরকাল হয়ে রইবো
উৎসবপরবর্তী সংকুচিত বিজয়পতাকা।
আমাকে মাড়িয়ে যাবে অলক্ষ্যে বিজিতের শ্লাঘা।
আমাকে মাড়িয়ে যাবে জেনেশুনে ভালোবাসাহীন
অজস্র মুখ ও পায়েরা। তবু ভালোবেসে থৈথৈ জল
অহেতুক হৃদয় অবধি। কে যেনো ছুঁয়েছে সেই কবে!
সেই থেকে যুদ্ধক্ষেত্র, সেই থেকে মুগ্ধচোখ,
শব্দময় হাসি আর সেই থেকে বলে আসছি,
"সন্ধ্যেবেলায় দ্যাখা হবে!"
শুধুমাত্র অর্থাভাবে অবেলায় ঝরে যাবে ফুল
আর নিভে যাবে তেতলার সবকটি হলদেটে আলো
শুধুমাত্র অর্থাভাবে কবিদের সংসার হবেনা।
হলেওবা ছাঁপোষা সংসার-দুঃসময়ে তাও ভেঙে যাবে।
কিছুই হবেনা জানা এ'জীবনে শুধু অর্থাভাবে
নারী কত রহস্যময়ী, তার বাতাসবাহিত শাড়ি
কিংবা শুধু শাড়ির আঁচল, ধূপগন্ধী বক্ষময়
চন্দনের আলেখ্যশ্রেণী- কিছুই হবেনা জানা;
শুধু এক মহীরুহ শব্দহীনতায় জেগে রবে
শান্ত হেঁটে যাওয়া আর শ্য'প্যানের নকটার্ন কুড়ি।
শুধুমাত্র অর্থাভাবে অমেয় সকল মুখ
হৃদয়ের খুব কাছে এসে; ফের সরে যাবে।
তবু সেই এক মুগ্ধচোখে, অবিকল এক হাসিমুখে
দূর থেকে হাতনেড়ে বলে যাবো, "সন্ধ্যেবেলায় দ্যাখা হবে!"
সন্ধ্যেবেলায় দ্যাখা হবে

No comments:
Post a Comment