Sunday, March 8, 2026

গল্প : অর্জুন বন্দ্যোপাধ্যায়

 

সেই নৌকো, পুড়িয়ে দাও

অর্জুন বন্দ্যোপাধ্যায় 


প্রথম দিন যেদিন ঘণ্টাটা বাজল, আমি বুঝতে পারিনি সেটা সকাল না সন্ধে। এখানে ঘণ্টা বাজলে সময় তৈরি হয়—সময় আগে থেকে থাকে না। 

ঘণ্টা বাজলেই জানলা খুলে যায়, দরজা বন্ধ হয়, মানুষ জেগে ওঠে, মানুষ ঘুমোয়, মানুষ অপরাধ করে, মানুষ ক্ষমা পায়। সময় এখানে ঘণ্টা থেকে ঝরে পড়ে, দেয়ালে জমে থাকে, তারপর ধীরে ধীরে মেঝেতে গড়িয়ে যায়। কেউ তা মুছে ফেলে না। 

এই জায়গাটার নাম কেউ বলে না। নাম থাকলে জায়গাটা মানচিত্রে উঠে আসত।

আমরা একে বলি—এখানে।

এখানে আসার আগে আমি জানতাম, আমি একটা দ্বীপে থাকি। মেইনল্যান্ডে যাই, আবার ফিরে আসি। নৌকো ছিল—ছোট, কাঠের, নিজের হাতে বানানো। আমি জানতাম কখন দাঁড় বাইতে হবে, কখন থামতে হবে। ঢেউ চিনতাম। ভয় পেতাম, কিন্তু ভয়টা পরিচিত ছিল।

এখানে এসে দেখলাম—নৌকোটা আর জলে নেই। নৌকোটা রাখা আছে করিডোরের শেষে। একটা করিডোর—দরজা নেই। দুটো দিকেই একই রকম অন্ধকার। প্রথম রাতে আমি ঘুমোতে পারিনি। ঘুম না হওয়াটা এখানে অপরাধ নয়। কিন্তু জেগে থাকাটা নজরে পড়ে।

রুম নম্বর থ্রি-তে আমরা আটজন। কেউ নিজের নাম বলে না। নাম ডাকলে মানুষটা বেরিয়ে আসে—এখানে সেটা বিপজ্জনক। তাই সবাই নম্বর। কেউ ঘণ্টা-ডিউটি, কেউ বাথরুম, কেউ বেডিং। আমি নতুন—আমাকে দেওয়া হয়েছে নৌকা-ডিউটি।

নৌকা-ডিউটি মানে—করিডোরের শেষে রাখা নৌকোটার দিকে তাকিয়ে থাকা। কেউ যেন ওটাতে উঠে না পড়ে। কেউ যেন পালিয়ে যেতে না চায়।

আমি প্রথম দিনই বুঝেছিলাম, এই নৌকো কারও পালানোর জন্য নয়।

এটা স্মৃতির নৌকো। যে এতে উঠবে, সে ফিরে যাবে। কিন্তু ফিরে যাওয়া এখানে নিষিদ্ধ।

রাতে, যখন সবাই শুয়ে পড়ে, আমি করিডোরে বসে থাকি। ঘণ্টা নিভে গেলে শব্দগুলো বেরোয়। দেয়ালের ভেতর থেকে হাঁটার শব্দ, জল চুঁইয়ে পড়ার শব্দ, শ্বাস আটকে রাখার শব্দ। 

এক রাতে, করিডোরের মাঝখানে বসে থাকতে থাকতে দেখি—একজন মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে। চেনা মুখ। রেহানা। কিন্তু আমি জানি, রেহানার এখানে থাকার কথা নয়। এখানে কেউ আসে না। এখানে মানুষ পৌঁছে যায়।

‘আজ কত তারিখ?’ সে জিজ্ঞেস করে।

আমি জানি উত্তর দিলে বিপদ। তবু বলি, ‘২০।’

সে হাসে।

‘আমার কাছে ২১।’

এখানে সময়ের উত্তর ভুল হলে মানুষ অদৃশ্য হয়ে যায়। কিন্তু রেহানা রইল। সে করিডোরের শেষে রাখা নৌকোটার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘ওটা পুড়িয়ে দাও।’

আমি বলি, ‘ওটা তো পালানোর পথ।’

‘না,’ রেহানা বলে, ‘ওটা আটকে থাকার পথ।’

এরপর থেকে রেহানা আসে। সব রাতে না। যখন ঘণ্টা দেরিতে বাজে, তখন। সে বলে—মা’র ঘরের দরজার কথা, দরজার চৌকাঠে বসে থাকা দুটো সময়ের কথা, দিনের ঘুম আর রাতের জাগরণের কথা। আমি তাকে বলি না—এখানে দরজা নেই। সবই করিডোর।

একদিন থেরাপির ক্লাসে বলা হল—‘যার নৌকো আছে, সে এখান থেকে যাবে না।

নৌকো পোড়াতে হবে।’

কেউ হাসে। কেউ কাঁদে। আমি চুপ। রাতে নৌকোর কাছে গিয়ে দেখি—ওটা আমারই লেখা দিয়ে বানানো। ডায়েরির পাতা, অসমাপ্ত গল্প, গুজব, ভুল তারিখ, ইনভেন্টরি শিট—সব জোড়া দিয়ে নৌকো।

আমি বুঝি, আমি এতদিন ধরে নৌকো বানাচ্ছিলাম। পালানোর জন্য নয়। নিজেকে বারবার ফিরে পাওয়ার জন্য। রেহানা শেষ রাতে আসে। সে আর কথা বলে না। শুধু নৌকোর গায়ে হাত রাখে।

‘আগুন দাও,’ বলে।

আমি আগুন ধরাইনি সঙ্গে সঙ্গে। আগুন ধরানো এখানে খুব সহজ—একটা স্মৃতি ভাবলেই যথেষ্ট। কিন্তু আগুন নিভিয়ে ফেলা অসম্ভব।

নৌকোর গায়ে হাত রেখে আমি হঠাৎ টের পেলাম—ওটা গরম। আগুন ছাড়াই গরম।

কাঠের ফাঁক দিয়ে শব্দ বেরোচ্ছে। জল নয়। শব্দ।

কেউ নৌকোর ভেতর বসে আছে।

আমি পেছনে ফিরতে চাইলাম, কিন্তু করিডোর আর আগের মতো নেই। দুই দিকেই দরজা জন্ম নিয়েছে। দরজার ওপর নম্বর নেই—তার বদলে তারিখ। সব ভুল তারিখ। এমন সব দিন যেগুলো কোনও ক্যালেন্ডারে ছিল না, কিন্তু আমার শরীর মনে রেখেছে।

রেহানা আমার পাশে এসে দাঁড়াল। আজ তার মুখ দেখা যাচ্ছে না। শুধু কণ্ঠ।

‘তুমি যদি নৌকো পোড়াও,’ সে বলল, ‘তাহলে যারা ভেতরে আছে তারা কোথায় যাবে জানো?’

আমি কিছু বলিনি।

‘তারা তোমার ভেতর ঢুকবে,’ সে বলল, ‘যা তুমি কখনও হতে চাওনি, কিন্তু হতে পারতে।’

নৌকো নড়ল। আমি তখন বুঝলাম—এটা পালানোর নৌকো নয়। এটা বহনকারী। যারা এখানে আটকে গেছে, যারা করিডোরের ভাষা শিখে ফেলেছে, যারা আর বাইরে ফিরতে পারবে না—তারা এই নৌকোতেই চেপে আছে। অপেক্ষায়। নতুন কারও শরীরের জন্য।

ঘণ্টা বাজল। কিন্তু এবার একবার না—অনবরত।

সব দরজা একসঙ্গে খুলে গেল।

আমি আগুন ধরালাম।

আগুন ছড়াল না।

আগুন ভেতরের দিকে ঢুকে গেল।

নৌকো চিৎকার করল।

মানুষের গলায় নয়—কাগজের গলায়। ছেঁড়া পাতার মতো শব্দ।

করিডোর ভেঙে পড়তে লাগল। দেয়ালের ভেতর থেকে জল বেরোতে লাগল। নদী নয়—ঘাম। ঘণ্টা গলে পড়ছে মেঝেতে। সময় তরল।

আমি দৌড়োলাম। কিন্তু দৌড়োনোর জায়গা নেই। কারণ প্রতিটা দরজার ওপারে আমি নিজেই দাঁড়িয়ে আছি—ভিন্ন বয়সে, ভিন্ন সিদ্ধান্তে, ভিন্ন ব্যর্থতায়।

একজন বলল, ‘থামো।’

আরেকজন বলল, ‘আগুন নেভাও।’

আরেকজন ফিসফিস করে বলল, ‘দেরি হয়ে গেছে।’

শেষ দরজাটা খুলতেই দেখি—বাইরে। কিন্তু বাইরে দাঁড়িয়ে নেই আমি। দাঁড়িয়ে আছে নৌকোটা। পুরো, অক্ষত। তার পাশে একটা মানুষ—যার মুখ আমি চিনি।

সে বলল, ‘তুমি ঢুকবে, না আমি?’

ঘণ্টা থামল।

আমি এখনও উত্তর দিইনি।

হয়তো এই গল্পটা শেষ হবে যখন কেউ সিদ্ধান্ত নেবে।

হয়তো সিদ্ধান্ত নিলেই গল্প শুরু হবে।

নৌকো অপেক্ষা করছে।

আগুন এখনও জ্বলছে।

No comments:

Post a Comment

প্রবন্ধ : ফজলুল করীম

মার্কিন সাম্রাজ্যের সাহিত্যিক ময়নাতদন্ত সাম্য রাইয়ান-এর উপন্যাস ‘সকল প্রশংসা মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের’ সমকালীন বাংলা সাহিত্যের এক অত্যন্ত সাহ...