Tuesday, May 19, 2026

প্রবন্ধ : অমর্ত্য দত্ত



আ‌লোর আল্পনা ও লা‌লিগুরাশ


ক‌বির কাজই হ‌লো ক‌বিতার মা‌ধ‌্যমে পথ রচনা করা। আমরা পাঠ‌করা তো শুধু যাত্রার আনন্দ ও প‌থের সুদৃশ‌্য উপ‌ভোগ ক‌রি মাত্র। সেই আনন্দের ও সুদৃশ্যের স‌ঠিক ব‌্যাখ‌্যা করা আমার ম‌তো পাঠ‌কের কা‌ছে খুবই দুরূহ ‌কিন্তু এই গূঢ় দা‌য়িত্ব‌টি আমার কাঁ‌ধে চে‌পে‌ছে ক‌বি অমৃতা খে‌টো-র প্রণীত 'আয়ুর একতারা' কাব‌্যগ্রন্থটির আ‌লোচক হিসাবে। এর পূ‌র্বে আ‌মি কো‌নো কাব‌্যগ্রন্থের আ‌লোচনা করার সাহস ক‌রিনি। এ ক্ষে‌ত্রে য‌দি কো‌নো ভ্রম ও প্রমাদ ঘ‌টে ত‌বে তা আমার নিতান্তই অপূর্ণ জ্ঞা‌নের কারণ ভে‌বে ক্ষমা ও মার্জনা কর‌বেন।

প্রথ‌মেই কাব‌্যগ্রন্থ‌টির শিরনাম আমার কা‌ছে এক অপূর্ব দ্যোতনার সৃ‌ষ্টি ক‌রে‌ছে। আয়ুর স‌ঙ্গে একতারার সম্বন্ধ কি? আয়ুর পাশে একতারা নামক বাদ‌্যযন্ত্রটি‌কে রাখা হ‌লো কেন? সে কারণ খুঁজ‌তে খুঁজ‌তে দেখলাম - একতারা খুবই সরল বাদ‌্যযন্ত্র যার এক‌টিমাত্র তার অথচ কেমন তীব্র আ‌ছে, কোমল আ‌ছে, শুদ্ধ আ‌ছে। আয়ুরও তো দুঃখ আ‌ছে, সুখ আ‌ছে, অ-সুখ ও অ-দুঃখ আ‌ছে। এক এক সময় এক এক স্ব‌রে বা‌জে। এই বৈ‌চিত্রই তো ভা‌লো ।

অতঃপর ক‌বিতায় আ‌সি—

'মায়াচন্দন' নামক ক‌বিতায় ক‌বি লিখছেন 'থোকা থোকা, অন্ধকার ললা‌টে বিষা‌দের মায়াচন্দন এঁ‌কে দিই'। ‌বিষা‌দের মায়াচন্দন এই উচ্চার‌ণে ক‌বি বিষাদ‌কে নিজ স্বভা‌বের ম‌ধ্যে দিয়ে, উপল‌ব্ধির মধ্যে দি‌য়ে নি‌য়ে গেছেন এক অনন‌্য মর্যাদায় । যা খুবই ব‌্যা‌তিক্রমী।

‌একাদশ পঙ‌ক্তিতে লিখছেন 'জীবন এখন সহজ সু‌রে গান গায়'... এই সহজ সুরই তো একমাত্র স্পৃহা প্রতি‌টি মানবজীব‌নের। সহজ হওয়ার ম‌তো আনন্দ আর কিছু‌তে নেই। ক‌বি লি‌খ‌ছেন মুহু‌র্তেরা অন্তর্ধান কর‌লে প‌ড়ে থা‌কে নৈঃশ‌ব্দের বুদবুদ। এই নৈঃশব্দ‌ কি শব্দময়তার আচ্ছন্নতা নয়? এই বুদুবুদ কি পুনঃরায় নি‌জের ম‌ধ্যে মি‌শে যাওয়ার প্রস্তু‌তি নয়? যা ক‌বি কে বা‌হির থে‌কে অন্তর্মুখীন ক‌রে তুলছে বারংবার।

পদধ্ব‌নি নামক ক‌বিতায়— বকুল মা‌ড়ি‌য়ে ব‌্যাকুল বৈরাগী চ‌লে যা‌চ্ছেন। বৈরাগী চ‌লে যা‌চ্ছেন সংসা‌রের যত ‌মিথ্যে হাতছানি‌কে পদদ‌লিত ক‌রে, ‌বৈরাগী চ‌লে যা‌চ্ছেন তার আত্মসন্ধ‌া‌নে। ক‌বি লিখ‌ছেন 'নদী‌কে কখ‌নো পিছু ডাক‌তে নেই'। এখা‌নে নদীই সেই বৈরাগী। বৈরাগীই সেই সহজিয়া, সেই সদানন্দ । যে জা‌নে সর্বস্ব পরিহা‌রের পরে যেটকু থা‌কে সেটাই প্রকৃত জীবন।

তৃতীয় ক‌বিতা রা‌তের সংলাপ। ক‌বি লি‌খে‌ছেন 'এক একটা রা‌ত্রি অপ্সরার ম‌তো'। তি‌নি রা‌ত্রিকে ঐশ্ব‌র্যের রূ‌পে দেখ‌ছেন, গায়িকার রূ‌পে দে‌খে‌ছেন, ক‌বি রূ‌পে দে‌খ‌ছেন আর তার বিভাব পা‌ল্টে যা‌চ্ছে ছ‌ত্রে ছ‌ত্রে। 

ক‌বি ও মেঘ‌পিতারা সমান ভা‌বে বিচ‌লিত মেঘকন‌্যা‌দের বিবাহ নি‌য়ে।

হলুদ ফু‌লের কাব‌্য নামক ক‌বিতায় ক‌বি লিখ‌ছেন 'শ‌ব্দের অলংকার খু‌লে নি‌য়ে হলুদ ফু‌লেরা হাস‌তে হাস‌তে বাতা‌সে উ‌ড়িয়ে দেয়। এ যেন পরাগ‌মিলন। শ‌ব্দেরা পুষ্প‌রেণু হ‌য়ে ছ‌ড়ি‌য়ে যা‌চ্ছে বাতা‌সে আর তা‌ মাখামা‌খি হ‌য়ে যা‌চ্ছে পাঠকে শরীরে, ম‌নে, অনুভূ‌তি‌তে, র‌ন্ধ্রে র‌ন্ধ্রে।

পাঠক দেখ‌ছে বাহ্মণী হাঁ‌সের দল কৈলাস স‌রোবর থে‌কে উ‌ড়ে আস‌ছে ক‌বিতার ভূস্ব‌র্গে।

'বিশুদ্ধ দর্শন' নামক ক‌বিতায় অমৃতা লিখ‌ছেন 'তুলসী ম‌ঞ্চের চারপা‌শে ধ‌া‌র্মিক জোনাকিরা আ‌লো জ্বে‌লে কৃষ্ণনাম জপতে জপ‌তে একুশবার উড়‌তে লাগ‌লো'। এই ভাবনা, দর্শন ও যথার্থ উপমার ব‌্যবহার‌কে আনত প্রণাম জানাই।

ষষ্ট ক‌বিতা 'ভিক্ষা'। ক‌বি বুঝ‌তে পা‌র‌ছেন না কোন গা‌ছের কা‌ছে প্রকৃত ঔষধ ভিক্ষা কর‌বেন। ক‌বি হ‌া‌রিয়ে ফে‌লে‌ছেন তার ভিক্ষার বা‌টি। হয়‌তো ক‌বি নি‌জে‌কেই ভিক্ষাপাত্র ক‌রে নে‌বেন।

'পরিযায়ী' ক‌বিতাটি‌ এক‌টি পাল‌কের কা‌হিনী। যে পালকটি দৃশ‌্য থে‌কে দৃ‌শ্যে উ‌ড়ে যা‌চ্ছে আর সৃ‌ষ্টি হ‌চ্ছে এ‌কের পর এক মুগ্ধ ব‌্যঞ্জনার।

ক‌বিতার নাম 'উপল‌ব্ধি' ক‌বির স্ব‌প্নের ম‌ধ্যে লু‌কি‌য়ে রে‌খে‌ছেন বাস্ত‌বের ছায়া আবার কোনা স্বপ্নই তার বাস্তব‌কে মান‌্যতা দেয় না। এমন যৌগপদ‌্য ভ্রম তো ক‌বি‌কেই মান‌ায়। অন্তর থে‌কে ব‌া‌হি‌রে, বা‌হির থে‌কে অন্ত‌রে এই বারংবার যাওয়া আসাই তো ক‌বি‌কে ভূ‌য়োদর্শী ক‌রে তোলে। ক‌বি লিখ‌ছেন 'বৈরাগ‌্য এক‌টি দুর্লভ সম্পদ' । সে সম্পদ তো প্রতি‌টি মানু‌ষের অন্তর‌ালস্থিত । সেই সম্পদ‌কে মায়াসিন্দুক খু‌লে বার ক‌রে আনাটাই তো আসল কাজ।

অমৃতা লিখ‌ছেন 'মানু‌ষের তেমন চরম উপল‌ব্ধি আত্মজ্ঞান'। সেই আত্মজ্ঞানই তো ‌মায়া‌সিন্দুক খোলার একমাত্র চা‌বি।

'স্রো‌তের ভিতর সা‌জি‌য়ে দাও' ক‌বিতা‌র এমন অনন‌্য শিরনাম অভাবনীয়। ক‌বি লিখ‌ছেন, পৃ‌থিবী ধংস হ‌বে অথবা লু‌ন্ঠিত', ভিনগ্রহের প্রাণী‌দের দ্বারা। এমন আশঙ্কা তো এই নীলগ্রহের প্রতি‌টি শি‌ক্ষিত মানুষের ম‌নে দানা বেঁ‌ধে আ‌ছে বহুবছর। তবুও এই উ‌দ্বেগ পেরিয়ে শেষ পঙ‌ক্তিতে ক‌বি স্রো‌তের ভেতর সা‌জিয়ে দি‌চ্ছেন শব্দবাহার যার ম‌ধ্যে ছ‌ড়ি‌য়ে আ‌ছে সুন্দর ও সুস্থ জীব‌নের বিশ্বাস, অঙ্গীকার।

এই কাব‌্যগ্রন্থে 'গ‌তিপথ' নামক ক‌বিতা‌টি আমার কা‌ছে ‌শ্রেষ্ঠ কারণ এর প্রথম পঙ‌ক্তিটি— 'জন্ম ও মৃত‌্যুর মাঝখা‌নে আ‌ছে পলক‌ফেলা জীবন'। পল‌কের প্রতিশব্দ ক্ষণ আর জীবন সে তো ক্ষণভঙ্গুর তবু ও সে নিজস্ব, সে একান্ত আপন । আমা‌দের গ‌তিপথ অজানা ভ‌বিয‌্যতের দি‌কে অথচ সে গ‌তি এক চরম স্থি‌তির ল‌ক্ষে এবং সে অজানা ভ‌বিষ‌্যতের চুড়ান্ত আমা‌দের সক‌লের জ্ঞাত।

পাহা‌ড়ের কথকতা নামক ক‌বিতায় ক‌বি যেই প‌াহা‌ড়ি প‌থের বাঁ‌ক ঘুড়‌ছেন পাল্টে পা‌ল্টে যা‌চ্ছে ক‌বিতার দৃশ‌্য, উপ‌মি‌তি, ব‌্যঞ্জনা, রূপক...

চিত্রকল্প ক‌বিতায় ক‌বি প্রশ্ন রাখছেন 'জীবন মা‌নে কি একটা অসম্পা‌দিত গল্প? না কি বহু গ‌ল্পের সমাহার'? ক‌বি আবার নি‌জে‌কে খনন কর‌ছেন আর ভিত‌রের মা‌টির সা‌থে বাই‌রের মা‌টি মি‌লে‌মিশে তৈরী কর‌ছে এক  রাহ‌স্যিক অবয়ব। ক‌বি নি‌জে‌কে শিকলবদ্ধ কর‌ছেন আবার সে বাঁধন খুল‌ছেন, ক্রমাগত...

যার কোনো বন্ধন নেই তার তো মু‌ক্তির আনন্দও নেই।

চু‌ক্তিপত্র ক‌বিতায় ক‌বি রোদ্দু‌রের সা‌থে সু‌রেলা চু‌ক্তিপ‌ত্রে স্বাক্ষর করছেন নিদাঘ দি‌নে এক ছটাক ছায়ার জ‌ন্যে। এই ভাবনা অকল্পনীয়। ক‌বিত‌ায় এমন উপমা অদৃষ্টপূর্ব।

আয়ুর একতারা কাব‌্যগ্রন্থের অন‌্যতম পছ‌ন্দের ক‌বিতা তথা শেষ ক‌বিতা‌টির নাম 'প্রচ্ছদ'। কবি তার অন্তরদৃ‌ষ্টি‌তে দেখ‌ছেন ক‌া‌ব্যের প্রচ্ছদে তথাগত হেঁ‌টে চ‌লে‌ছেন...


No comments:

Post a Comment

প্রবন্ধ : ফজলুল করীম

মার্কিন সাম্রাজ্যের সাহিত্যিক ময়নাতদন্ত সাম্য রাইয়ান-এর উপন্যাস ‘সকল প্রশংসা মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের’ সমকালীন বাংলা সাহিত্যের এক অত্যন্ত সাহ...