Wednesday, May 20, 2026

প্রবন্ধ : জি কে নাথ

 


শব্দ, রং ও রেখার অন্তর্লীন সংলাপ : পঞ্চাশ থেকে আশির দশকে বাংলা কবিতা ও চিত্রশিল্পের পারস্পরিক প্রভাব


বিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে বাংলা সাহিত্য ও চিত্রশিল্পের ভুবন এমন এক গভীর বিনিময়ের ভিতর দিয়ে গিয়েছে, যেখানে কবিতা আর ছবি আলাদা দুই মাধ্যম হয়েও ক্রমশ একে অপরের ভাষা ধার করেছে। পঞ্চাশ থেকে আশির দশক—এই চার দশক শুধু রাজনৈতিক অস্থিরতা, উদ্বাস্তু অভিজ্ঞতা, নগর মধ্যবিত্তের সংকট কিংবা বিপ্লবী চেতনার সময় নয়, একই সঙ্গে এটি ছিল শব্দ ও দৃশ্যমানতার নতুন সম্পর্ক নির্মাণের যুগ। কবিরা ছবির মতো লিখতে শুরু করলেন, আর শিল্পীরা রঙের ভিতরে কবিতার নীরবতা ধরতে চাইলেন। ফলে বাংলা সংস্কৃতির ভেতরে এমন এক নন্দনচেতনা তৈরি হয়, যেখানে কবিতা কেবল পাঠ্য নয়, দৃশ্যও, আবার চিত্রকর্ম কেবল দৃশ্য নয়, এক ধরনের নীরব উচ্চারণ।

এই সময়ের কবিদের মধ্যে জীবনানন্দ-উত্তর এক প্রবল চিত্রকল্পনির্ভর ভাষা গড়ে ওঠে। যদিও জীবনানন্দ দাশ মূলত চল্লিশের কবি, তাঁর “দৃশ্যকবিতা”-র ঐতিহ্য পঞ্চাশোত্তর কবিদের উপর গভীর প্রভাব ফেলে। সেই সূত্রেই শক্তি চট্টোপাধ্যায়, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, শঙ্খ ঘোষ, অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত, উৎপলকুমার বসু, বিনয় মজুমদার, তারাপদ রায়, নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী, সুবোধ সরকার, জয় গোস্বামী, মণিভূষণ ভট্টাচার্য, কবিতা সিংহ, দেবারতি মিত্র, অমিতাভ দাশগুপ্ত, ভাস্কর চক্রবর্তী, অরুণেশ ঘোষ, রণজিৎ দাশ, তুষার রায়, সমীর রায়চৌধুরী ও শক্তিপদ ব্রহ্মচারীর মতো কবিরা বাংলা কবিতাকে এক নতুন দৃশ্যমান ভাষা দেন।

অন্যদিকে চিত্রশিল্পের জগতে এই সময় সক্রিয় ছিলেন যামিনী রায়, গণেশ পাইন, বিকাশ ভট্টাচার্য, পরিতোষ সেন, সোমনাথ হোর, গণেশ হালুই, যোগেন চৌধুরী, শুভাপ্রসন্ন, প্রকাশ কর্মকার, রবীন মণ্ডল, লালুপ্রসাদ সাউ, ধর্মনারায়ণ দাসগুপ্ত, শ্যামল দত্ত রায়, রামকিঙ্কর বেজ, চিত্তপ্রসাদ, গোবর্ধন আশ, হিরণ মিত্র, অমিয় ভট্টাচার্য ও সুনীল দাস। তাঁদের ছবিতে যেমন রাজনৈতিক সহিংসতা, ক্ষুধা, শরীর, নিঃসঙ্গতা, নগরের ভাঙন এবং স্বপ্নের বিকৃতি ধরা পড়ে, তেমনই কবিতার ভিতরেও এই সমস্ত অভিজ্ঞতা রূপকের ভাষায় প্রবেশ করে।

শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের কবিতা পড়লে প্রথমেই যে জিনিসটি চোখে পড়ে, তা হলো রঙের ব্যবহার। তাঁর কবিতার সবুজ, নীল, কুয়াশামাখা ধূসর প্রকৃতি অনেকাংশে গণেশ হালুইয়ের বিমূর্ত ভূদৃশ্যের সঙ্গে মিলে যায়। গণেশ হালুই যেমন বাস্তবকে সরাসরি আঁকেন না, স্মৃতির ভিতর ভেঙে যাওয়া ভূগোল আঁকেন, শক্তিও তেমন বাস্তবকে নয়, বাস্তবের আবহকে লিখতেন। তাঁর কবিতার নদী বা আকাশ কখনও নিছক প্রকৃতি নয়, তা স্মৃতির অস্পষ্ট জলরং।

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের নগরজীবনের কবিতা বিকাশ ভট্টাচার্যের ছবির সঙ্গে এক আশ্চর্য সংলাপ তৈরি করে। বিকাশের ছবিতে কলকাতার ক্লান্ত, বিভ্রান্ত, যৌন-আবিষ্ট মধ্যবিত্ত যেমন উপস্থিত, তেমনই সুনীলের কবিতায় নগর মানুষের একাকিত্ব, সম্পর্কের অবক্ষয় এবং অস্তিত্বের শূন্যতা ফিরে ফিরে আসে। উভয়ের কাজেই শহর একটি চরিত্র, কখনও প্রেমিকা, কখনও শত্রু।

শঙ্খ ঘোষের কবিতার সংযমী বেদনা ও নৈতিক অস্বস্তির ভিতরে সোমনাথ হোরের ক্ষতচিহ্নের শিল্পকে অনুভব করা যায়। সোমনাথ হোরের “Wounds” সিরিজ যেমন শরীরের ক্ষতকে ইতিহাসের দলিল করে তোলে, তেমনই শঙ্খ ঘোষ ভাষার ভিতরে সময়ের নীরব আঘাত ধারণ করেন। তাঁদের শিল্পে উচ্চকণ্ঠ প্রতিবাদের বদলে গভীর মানবিক কষ্ট কাজ করে।

অলোকরঞ্জন দাশগুপ্তের কবিতায় ইউরোপীয় আধুনিকতার বিমূর্ততা ও প্রতীকি ভাষা দেখা যায়, যা পরিতোষ সেনের চিত্রভাষার সঙ্গে তুলনীয়। পরিতোষ সেন মানুষের মুখকে প্রায় বিকৃত এক আধুনিক যন্ত্রণার প্রতীকে পরিণত করেছিলেন। অলোকরঞ্জনের কবিতাতেও মানুষ প্রায়ই সম্পূর্ণ মানুষ থাকে না, সে ভাঙা চিহ্নে পরিণত হয়।

উৎপলকুমার বসুর কবিতা ভ্রমণ, ভূগোল ও সময়ের মধ্যে চলমান এক অন্তহীন যাত্রা। তাঁর কবিতার সঙ্গে যোগেন চৌধুরীর রেখার সাদৃশ্য লক্ষণীয়। যোগেনের ছবির মানুষেরা যেমন স্থির থেকেও অস্থির, তেমনই উৎপলের কবিতায় স্থান কখনও স্থির থাকে না। সবকিছু চলমান, সরে যাওয়া, বদলে যাওয়া।

বিনয় মজুমদারের কবিতাকে প্রায়ই গাণিতিক বলা হয়, কিন্তু তার ভিতরে এক অদ্ভুত ভিজ্যুয়াল জ্যামিতি আছে। তাঁর শব্দের বিন্যাস ধর্মনারায়ণ দাসগুপ্তের বিমূর্ত শিল্পের কথা মনে করায়। উভয়ের ক্ষেত্রেই কাঠামো এবং শূন্যস্থান সমান গুরুত্বপূর্ণ।

তারাপদ রায়ের ব্যঙ্গাত্মক অথচ বিষণ্ণ কবিতার সঙ্গে রবীন মণ্ডলের বিকৃত মুখাবয়বের সম্পর্ক তৈরি করা যায়। রবীন মণ্ডলের ছবিতে মানুষ কখনও বিদ্রূপাত্মক, কখনও করুণ, তারাপদের কবিতাও ঠিক তেমন।

নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর সহজ অথচ গভীর মানবিকতা যামিনী রায়ের লোকজ সরলতার সঙ্গে যুক্ত। যামিনী রায় যেমন বাংলার পটশিল্পকে আধুনিকতার মধ্যে নতুন মর্যাদা দিয়েছিলেন, নীরেন্দ্রনাথও তেমন সহজ ভাষাকে গভীর কাব্যিকতায় উন্নীত করেন।

মণিভূষণ ভট্টাচার্যের বিপ্লবী চেতনার কবিতা চিত্তপ্রসাদের রাজনৈতিক শিল্পের সঙ্গে যুক্ত। উভয়ের কাজেই ক্ষুধার্ত মানুষ, রাষ্ট্রীয় সহিংসতা এবং শোষণের ইতিহাস উপস্থিত। শিল্প এখানে নান্দনিকতার বাইরে গিয়ে প্রতিরোধের ভাষা হয়ে ওঠে।

কবিতা সিংহের নারীকেন্দ্রিক কাব্যভাষা শ্যামল দত্ত রায়ের জলরঙের নিঃসঙ্গ নারীমুখের সঙ্গে সংলাপে প্রবেশ করে। নারী এখানে কেবল প্রেমের অবজেক্ট নয়, নিজস্ব অভ্যন্তরীণ জগৎসম্পন্ন এক সত্তা।

দেবারতি মিত্রের কবিতার অন্তর্মুখী আবহ সুনীল দাসের ঘোড়ার সিরিজের মতোই এক তীব্র মানসিক অস্থিরতা বহন করে। বাহ্যিক গতি নয়, অন্তর্গত অশান্তিই সেখানে প্রধান।

ভাস্কর চক্রবর্তীর কবিতায় যে অন্ধকার নগরবোধ দেখা যায়, তা শুভাপ্রসন্নর কলকাতা সিরিজের সঙ্গে সম্পর্কিত। উভয়ের কাজেই শহর এক ক্লান্ত, বিষণ্ণ এবং কখনও হিংস্র বাস্তবতা।

জয় গোস্বামীর কবিতার স্বপ্ন, লোকমিথ, শরীর ও অদ্ভুত কল্পনার জগৎ প্রকাশ কর্মকারের রঙবহুল এক্সপ্রেশনিস্ট ছবির কথা মনে করায়। বাস্তব এখানে কখনও সরল নয়, অতিরঞ্জিত, বিকৃত এবং রহস্যময়।

সমীর রায়চৌধুরীর হাংরি আন্দোলনের ভাষাভাঙা কবিতা রামকিঙ্কর বেজের ভাস্কর্যের সঙ্গে তুলনীয়। কারণ উভয়েই প্রচলিত সৌন্দর্যবোধকে ভেঙে দিয়েছিলেন। শিল্প এখানে শৃঙ্খলার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ।

তুষার রায়ের কবিতার উন্মাদনা ও আত্মধ্বংসী আবহ গণেশ পাইনের গাঢ় অন্ধকার চিত্রভাষার সঙ্গে মিলে যায়। গণেশ পাইন যেমন মৃত্যু ও শৈশবকে একই ছবিতে মিশিয়ে দেন, তুষারও জীবনের ভিতরে মৃত্যুর ছায়া অনুভব করেন।

রণজিৎ দাশের সংক্ষিপ্ত অথচ তীক্ষ্ণ কবিতা লালুপ্রসাদ সাউ-এর সূক্ষ্ম রেখার সঙ্গে সম্পর্কিত। কম উপকরণে গভীর অভিঘাত তৈরি—এই জায়গায় তাঁদের মিল।

অমিতাভ দাশগুপ্তের রাজনৈতিক চেতনা ও নগর-অভিজ্ঞতা বিকাশ ভট্টাচার্যের সামাজিক বাস্তবতাবোধের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ। উভয়ের শিল্পেই রাষ্ট্রীয় চাপা হিংসা কাজ করে।

অরুণেশ ঘোষের কবিতায় যে স্মৃতিমেদুরতা আছে, তা অমিয় ভট্টাচার্যের নরম রঙের ল্যান্ডস্কেপে খুঁজে পাওয়া যায়। স্মৃতি এখানে দৃশ্য হয়ে ওঠে।

শক্তিপদ ব্রহ্মচারীর কবিতার মাটির গন্ধ ও গ্রামীণ চেতনা যামিনী রায়ের লোকজ শৈলীর আরেক সমান্তরাল নির্মাণ। শহরমুখী আধুনিকতার বিপরীতে তাঁরা বাংলার নিজস্ব অভিজ্ঞতাকে সামনে আনেন।

হিরণ মিত্রের শিল্পভাষা মূলত সময়ের রাজনৈতিক অস্থিরতা, নগরজীবনের উদ্বেগ এবং মানুষের অস্তিত্বসংকটকে কেন্দ্র করে নির্মিত। তাঁর রেখা ভাঙাচোরা, গতিময় এবং তীব্র, যেন সময়েরই ক্ষতচিহ্ন। পোস্টার, প্রচ্ছদ ও চিত্রকলাকে তিনি এমনভাবে মিলিয়েছিলেন, যেখানে শিল্প শুধু নান্দনিক অভিজ্ঞতা নয়, প্রতিবাদ ও মানবিক অস্বস্তির ভাষাও হয়ে ওঠে। সত্তরোত্তর বাংলা কবিতার অন্ধকার, বিচ্ছিন্নতা ও ক্ষয় তাঁর ছবির ভিতরে দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। তাই হিরণ মিত্রের শিল্পকে শব্দ ও রেখার এক যৌথ আধুনিকতা বলাই যথার্থ।

গোবর্ধন আশের চিত্রভাষার কেন্দ্রে ছিল বাংলার গ্রামীণ জীবন, লোকঐতিহ্য এবং সাধারণ মানুষের নীরব সংগ্রাম। তাঁর ছবিতে মাটির গন্ধ, কৃষিজীবনের ক্লান্ত সৌন্দর্য এবং লোকস্মৃতির গভীর আবহ এক সংযত রঙের ভিতর ফুটে ওঠে। শহুরে আধুনিকতার বিপরীতে তিনি বাংলার প্রাত্যহিক জীবনকে শিল্পের মর্যাদা দিয়েছেন। নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী বা শক্তিপদ ব্রহ্মচারীর কবিতার মতোই তাঁর শিল্পেও সাধারণ মানুষই হয়ে ওঠে মূল নায়ক।

এই চার দশকে কবিতা ও চিত্রশিল্পের সম্পর্ক কেবল বিষয়গত ছিল না, ছিল কাঠামোগতও। কবিরা ছবির মতো “ফ্রেম” তৈরি করতে শিখলেন। একটি কবিতা কখনও হয়ে উঠল ক্লোজ-আপ, কখনও লং শট। আবার শিল্পীরাও কবিতার মতো অসম্পূর্ণতা ও ইঙ্গিতকে গুরুত্ব দিতে শুরু করলেন। ফলে শিল্পে সরাসরি বর্ণনার বদলে আবহ, প্রতীক, নীরবতা ও ফাঁকা জায়গার ব্যবহার বাড়ল।

এই সময়ের রাজনৈতিক বাস্তবতাও দুই মাধ্যমকে কাছাকাছি নিয়ে আসে। দেশভাগ, নকশাল আন্দোলন, জরুরি অবস্থা, নগর দারিদ্র্য, উদ্বাস্তু জীবন—এই সব অভিজ্ঞতা কবি ও শিল্পী উভয়ের চেতনাকে আঘাত করেছিল। তাই সোমনাথ হোরের ক্ষতচিহ্ন আর মণিভূষণের কবিতা, কিংবা শুভাপ্রসন্নর শহর আর ভাস্করের কবিতা—আসলে একই সময়ের দুই ভিন্ন ভাষা।

তবে এই সম্পর্ক অনুকরণের নয়। কবিতা কখনও ছবির ব্যাখ্যা হয়নি, ছবিও কবিতার অলংকরণ নয়। বরং তারা পরস্পরের অভাব পূরণ করেছে। শব্দ যেখানে থেমে যায়, রং সেখানে কথা বলে, আবার দৃশ্য যেখানে স্থির হয়ে পড়ে, কবিতা সেখানে সময়ের প্রবাহ এনে দেয়।

পঞ্চাশ থেকে আশির দশকের বাংলা সংস্কৃতি তাই এক বহুমাত্রিক নন্দনচর্চার সময়। এই সময়ের কবিরা বুঝেছিলেন যে আধুনিক মানুষের অভিজ্ঞতা এত জটিল যে তাকে শুধু শব্দে ধরা যায় না। অন্যদিকে শিল্পীরাও অনুভব করেছিলেন, দৃশ্যমান বাস্তবের ভিতরে আরও এক অদৃশ্য ভাষা কাজ করে। সেই কারণেই এই সময়ের কবিতা পড়লে ছবির অনুভূতি আসে, আর ছবির সামনে দাঁড়ালে মনে হয় যেন কোনো নীরব কবিতা খুলে যাচ্ছে।

কাজেই বলা যায়, বাংলা কবিতা ও চিত্রশিল্পের এই সংলাপ আসলে মানুষের অস্তিত্বসংকট, স্মৃতি, প্রেম, ভয়, রাজনৈতিক ক্ষত এবং স্বপ্নকে নতুনভাবে বোঝার চেষ্টা। শব্দ ও রঙ এখানে আলাদা দুই সত্তা নয়, একই মানবিক অনুসন্ধানের দুই ভিন্ন প্রকাশ। তাই পঞ্চাশ থেকে আশির দশকের এই শিল্প-সম্ভার শুধু সাহিত্য বা চিত্রকলার ইতিহাস নয়, বাংলা আধুনিকতার অন্তর্জীবনেরও এক গভীর দলিল।

No comments:

Post a Comment

প্রবন্ধ : ফজলুল করীম

মার্কিন সাম্রাজ্যের সাহিত্যিক ময়নাতদন্ত সাম্য রাইয়ান-এর উপন্যাস ‘সকল প্রশংসা মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের’ সমকালীন বাংলা সাহিত্যের এক অত্যন্ত সাহ...