প্রতীক্ষা
তখন বেশ সকাল। ভোরের কুয়াশায় দূরপাল্লার ট্রেন এসে থামলো সশব্দে। ছোট স্টেশন। আড়ম্বর কম।অল্প স্বল্প লোক নামলো। সামান্য সরগরম হলো স্টেশন-চত্বর। চায়ের দোকানে একটু ভিড় বেশি। পুরি ভাজির দোকানের কিছু বিক্রি-বাটা হলো। কালো কোটের টিকিটবাবু প্লাটফর্মের এদিকে ওদিকে ব্যস্ত হয়ে ঘোরাঘুরি করে চলে গেলেন।
ট্রেন চলে গেল। আস্তে আস্তে স্টেশন চত্বর শুনশান। আবার সব স্বাভাবিক। স্টেশন-চত্বরের কুকুরগুলো আবার কুন্ডলী পাকিয়ে ঘুমের তোড়জোড় করছে। কুলি রামশরণ রামধুন গাইছে নিচুস্বরে আপনমনে ।ভিখারি পাসোয়ান নিভে যাওয়া আগুন উসকে দিয়ে নিশ্চিন্তে বসলো।
এদিকে,ট্রেন থেকে নড়বড়ে পায়ে নেমে,সিমেন্টের ঠান্ডা বেঞ্চে এক বৃদ্ধা বসে আছেন। পাশে দুটো তিনটে দমসম মলিন-কাপড়ের ব্যাগ। চোখে মুখে চিন্তার ছাপ। নিভে যাওয়া চোখে উৎকন্ঠা । এদিকে ওদিকে মাথা ঘুরিয়ে কাউকে খুঁজে চলেছেন । কেউ হয়তো আসবে । তাকে দেখে মনে হচ্ছে, তিনি ভুল স্টেশনে নেমে পড়েছেন। তার সারা শরীরে অজানা সন্ত্রাস।
বৃদ্ধা নড়বড়ে ভঙ্গিতে বসে। ভুলো কুকুর যথারীতি পাশ ঘেঁষে বসলো তার। যেন কতকালের পাহারাদার। বৃদ্ধা কালো ভুসো চাদরটা আরো মুড়েসুড়ে বসলেন। এবার ঠান্ডাও পড়েছে। বেলা হয়েছে। কিন্ত রোদের তেজ নেই। চাওয়ালা সুবল এক ভাঁড় চা দিয়ে গেল বৃদ্ধাকে। বৃদ্ধা আঁচলের খুঁটে রাখা খুচরো পয়সা দিতে গেলেন। সুবল মাথা নেড়ে চলে গেল। বৃদ্ধা গরম চায়ের কাপে চুমুক দিলেন।
কুলি রামশরণ একসময়ে গান থামিয়ে বৃদ্ধার সাথে আলাপ জমাতে এলো। বৃদ্ধা নীরব প্রকৃতির। তাই আলাপ জমলো না। তবে তিনি কারুর অপেক্ষায় -তা বোঝা গেল। ভিখারি পাসোয়ান দূর থেকে বৃদ্ধাকে দেখছে।ভাবছে ভিখারি-সংখ্যা বাড়লো বোধহয়! তার কপালে চিন্তার ভাঁজ!
বেলা বেড়েছে। বৃদ্ধা একভাবে বসে। বোধহয় নড়াচড়া করতেও ভুলে গেছেন। তবে একবার উঠে কলের জলে হাত-মুখ ধুয়ে এলেন। পায়ে জড়তা।
ভাতের দোকানের বেঁচে যাওয়া ভাত-তরকারির হকদার পাসোয়ান, বৃদ্ধাকে ভাত দিয়ে গেল নিজের ভাগ থেকে। তিনি অনভ্যস্ত ভাবে, সেই অযাচিত অন্ন গ্রহন করলেন। ভুলো কুকুরও ভাগ পেল।
আবার ট্রেন এলো। আবার চাঞ্চল্য। লোকজনের চলাচল। বৃদ্ধার চোখে স্থবিরতা। ট্রেন চলেও গেল। আবার সব শুনশান। শেষবেলায় গাছের শুকনো পাতা উড়ছে জনহীন প্ল্যাটফর্মে। বৃদ্ধা বেঞ্চের ধুলো ঝেড়ে শুয়ে পড়েছেন। মাথার ধারে ভুলো কুকুর ও বোধহয় দিবাস্বপ্ন দেখছে। আর বৃদ্ধা বোধহয় ফিরে গেছেন তার ফেলে আসা জীবনে। সেই জীবনে, যেখানে তার ঘর ছিল। ভালোবাসার মানুষজন ছিল। অগোছালো স্বপ্ন ছিল।
সন্ধ্যা নামছে। শীত আসছে। স্বপ্ন ভেঙে গেছে। স্বপ্ন ভাঙা চোখে আকাশ দেখেন তিনি। কুলি রামশরণ একটা পুরোনো কম্বল দিয়ে যায় তাকে। ভিখারি পাসোয়ান আগুনটা উসকে দেয়। সামনে লম্বা শীতের রাত আসছে। বৃদ্ধার প্রতীক্ষার শুরু হলো। বুকের আগুন জ্বালিয়ে তিনি এই দীর্ঘ শীতের রাত পার করবেন। রাতের অন্ধকারে চেনা মুখগুলো তার এখন অচেনা মনে হয়।
রামশরণ রামধুন গায় গুনগুন করে। স্টেশন-চত্বরে এখন শান্তি বিরাজমান। যদিও প্রতীক্ষার অবসান নেই। স্বপ্নগুলো যাওয়া আসা করে নিজের মনে। যদিও পাতা পড়ার শব্দে, বৃদ্ধা চমকে ওঠেন। ভাবেন, এই বুঝি কেউ এলো। দিনের পরে দিন যায়। সময় বয়ে যায় নদীর মতো। অবলীলায়!

No comments:
Post a Comment