যা কিছু অস্পৃশ্য এবং ভূতো
১।
ভূতো বড়ো সাধারণ ছেলে। ভূতোর মতো অসাধারণ বানিয়ে বলতে কেউ পারে না। ভূতো গাঁজা খেয়ে গাঁজাকে ভুলে যায়। ভুলে যাওয়া গান মনে করে ভূতো নিজেকেই গেয়ে যায় চোখ বন্ধ করে। ভূতোর প্রেমিকা থাকে উৎসবের শহরে। যদিও ভূতোর কোনো প্রেমিকাই নেই। কেননা ভূতো সারাক্ষণ মাঠে ঘাস পোকা পাখিদের সাথে ঘুরে বেড়ায়। সন্ধ্যা হলে ধোঁয়ার ভেতর বসে একটা মিথ্যেকেও শুধু শুধুই জীবন্ত করে তোলে। ভূতোকে বিশ্বাস করা যায় না। ভূতোকে অস্বীকার করতে গিয়ে ভূতোর প্রেমে পড়ে যাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি থাকে। অতএব মেনে নেওয়া ভালো ভূতোর সত্যিই প্রেমিকা আছে।
ওই দেখো প্রেমিকার সঙ্গে ভূতো যাচ্ছে জঙ্গলে। একা হতে যাচ্ছে দুজন। জোনাকি যেমন অন্ধকারের সঙ্গে একা। বাঘ যেমন শিকারের সঙ্গে একা। তেমন উৎসবে যাচ্ছে দুজন। দুজনের চোখে কৃষ্ণমেঘের দল। দুজনের চোখে অবিশ্বাসের জল।
২।
আপাদমস্তক অন্ধকার একটা ওভারকোটের নাম ভূতো। পোষাক পুরোনো হলে এবং বহু ব্যবহার সত্ত্বেও তার ভাবমূর্তি ভেঙে না পড়লে দেহের বৃদ্ধি যেভাবে তাকে আলমারির অহংকারে রেখে আসে, ভূতোকেও সেভাবে — বিশেষ কোনো ঋতুর বিরক্তিকর দিনে খুলে দেখা হবে তাই অনেকক্ষণ ওষুধে ভিজিয়ে রাখা হয়েছে। এরপর ঘষে ঘষে যাপনের ময়লা তুলে ফেলা হবে। কোনো কোনো দাগ এতোটাই উপেক্ষিত ছিলো — ঘরোয়া কোনো টোটকাই আজ আর তাকে সম্পূর্ণ মুছে ফেলতে পারছে না। অস্বচ্ছ অথচ স্মৃতিলব্ধ দাগ নিয়ে ভূতো রোদ্দুরে শুয়ে আছে। রোদ্দুর তাকে বোঝাচ্ছে — ওভারকোটের দিন আবার আসবে। আলমারির অন্ধকারে সে যেন তার চরিত্র হারিয়ে না ফেলে।
৩।
তোমার সঙ্গেই রয়েছে ছুরিটা অথচ খুঁজে পাচ্ছ না তুমি। সারাক্ষণ সে তোমার মাথার ভেতর ছুটি কাটাচ্ছে আর তোমাকে সন্দেহজনক করে তুলছে শিকারী কুকুরের মতো। বুনো একটা গন্ধ তোমাকে উত্তেজিত করে তুলছে এই বৃষ্টিহীন মেঘের দিনে। লম্বা শ্বাস পড়ছে আর রোঁয়াগুলো ফুলে উঠছে ঘাড়ের। সন্ধ্যার রেস্তোরাঁয় একের পর এক গ্লাস শূন্য করে ভাবছ জলের প্রতিধ্বনি এসে তোমাকে এলোমেলো করে দিয়ে যাবে খানিক। এতোসব মাথার মধ্যে নিয়ে তুমি তোমার প্রেমিকের সাথে শুতে যাবে ঘরে ফিরে। সারাদিনের সমস্যাগুলো সামলে উঠতে যে তোমার দুটো হাত কম পরে যাচ্ছে এটা খুব নীচু স্বরে বলবে ও আলোটা কমিয়ে দেবে অন্যহাতে। ছেলেটা অল্প আলো পছন্দ করে। এতে তিনজনের বেশ সুবিধাই হয়। ছুরিটা দুজনের মাঝখানে নিশ্চিন্তে ঠ্যাঙের ওপর ঠ্যাং তুলে দিয়ে সংসার ও তার প্রয়োজন অপ্রয়োজনের হিসেব শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে পড়ে।
তখন গিয়ে ভূতোর একবার ডেকে দেখাতে ইচ্ছে করে। ম্যাডাম, এই আপনার ভেতরের ভয়, সন্দেহের বরফ, যত্নের ছুরি। একে দুজনের মাঝখানে রাখবেন না। পারলে অন্যকাউকে দিয়ে দেবেন, যাকে আপনি নিজের থেকেও বেশি সহ্য করছেন এতোদিন। ভূতোকে সহ্য করেছেন।
৪।
ঘরের ভেতর বসে ঘরের কথা ভাবাই হয় না। যেমন ধ্যানের ভেতর নিজেকে বাদ দিয়ে সকল কিছুই স্পর্শ করা যায়।চোখবন্ধ থাকলে তখন সব কিছুই দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। সেভাবেই এই ভিনরাজ্যের লোডশেডিংএ শুয়ে ভূতো দেখছে — মায়ের ঠাকুরের সিংহাসনটা উঁইয়ে ধরেছে। ঠাকুরগুলোও বেশ পুরোনো। কোনো কোনো ফটোগ্রাফের মুখগুলো খুব বেশি ঝাঁপসা হয়ে আছে। চটে যাওয়া রঙের ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে আছে সোনার কলসী কাঁখে একটা হাত। এই হাত একদিন উজ্জ্বল রং দিয়ে বাঁধানো ছিলো। ঠাকুরের ও বয়স বাড়ে তবে। যেভাবে মায়ের বেড়েছে। মা আর ঠাকুর তবে একই। ইদানীং মা আর পূজা দিতে বসে কান্না করে না। জল দিয়ে সবাইকে স্নান করিয়ে ফুল তুলসী রেখে দেয় পায়ে। তারপর প্রদীপ জ্বালিয়ে, ধূপ জ্বালিয়ে একটা প্রনাম করে উঠে যায় খুব ধীরে। এই যে ধীরে শব্দটা লিখলো ভূতো, এর ভেতরে একটা জীবনের অবক্ষয় ও বিশ্বাসের পাথর পড়ে রয়েছে। এই পাথর স্পর্শ দিয়ে অনুভব করা যায় না। যুক্তি দিয়ে ভেঙে দেওয়া যায় ঠিকই। কিন্তু বিশ্বাসের সামনে কোনো যুক্তি কাজ করে না। ভিনরাজ্যের এই গন্ডগ্রামে চিকিৎসা সেবা দিতে গিয়ে ভূতো হাড়ে হাড়ে এই সত্য অনুভব করেছে। পাথরও ভেঙে যেতে পারে যদিও মাকে ভেঙে ফেলা, মায়ের বিশ্বাস ভেঙে ফেলার মতো নাস্তিক ভূতো না।
৫।
অপদার্থের মতো ঘুম পায় । ঘুম পাশ কাটাতে গেলে গতদিনের শ্বাসকষ্ট আবার। মাথার অন্ধকার চোখে নেমে আসে। ভূত ভবিষ্যৎ কিছু মনে থাকে না ভূতোর । হাত কাঁপে, পা কাঁপে। হৃদয়ের পাথর পর্যন্ত কেঁপে রাস্তা অবরোধ করে দাঁড়ায়। অবরোধের ভেতর শুয়ে বসে ঘুমোতে ভালোই লাগে ভূতোর। ঘুম ভাঙার পর না বলতে পারা একপ্রকার তৃপ্তি চারপাশে হাত পা ছড়িয়ে ফুটে থাকে। খচ্চরকে খচ্চর বলতে ইচ্ছে হয় না তখন। ঘাড়ের ওপর আদর রেখে বলে — সুহৃদ তোমার সূর্যাস্ত প্রকাশ হয়েছে। জামার বোতাম আটকাও।

No comments:
Post a Comment