সবুজ প্রত্যাবর্তন
উত্তরগুলো পাল্টে গেছে
এখন চাকা ঘুরতে ঘুরতে শীত পেরিয়ে কত বসন্ত রং ভেঙেছে প্রজাপতি ডানায় —
জলের সুর গড়িয়ে নেমেছে বর্ষণসিক্ত রাতে
সেদিনের না-গুলোর অহংকার মিশে গেছে বালুচরে
ফিরে আসছে সরিয়ে রাখা ঝুমকো দুল, ছিঁড়ে ফেলা টুকরো চিঠি, হাতের চুরি, পায়ের নূপুর
ট্রেনের জানলার ধারে আজ হু হু বাতাস
উড়ছে ওলোটপালোট কথামালা—
ফিরে ফিরে চোখে পড়ছে আকাশ আর গাছেদের বর্ণময় সবুজ বন্ধন।
প্রণত ডানায়
সে পথে আকাশ ছুটি নেয়
সে পথে বাদুড় ওড়ে না ডানায় সংক্রমণ নিয়ে—
সব জোয়ার ভাটা উপরিতলে ঘর্ষণ ঝলসানো মাংস ছিঁড়ে বনভোজনের উৎসব
সে পথে নদী ঘুমিয়ে আছে বুকের ভিতর
বিচ্ছেদ ধুয়ে মুছে জনহীন ফুল
শুকায় পায়ের তলায়
ভোর হয় সীমানা ছাড়িয়ে
পথ চিনে চলে আসে প্রজাপতি
প্রণত ডানায় মুছে নেয় জল।
প্রসাদ-চিহ্ন
বেঁধে রাখিনি ঝরা ফুল
শুধু পদধূলি প্রসাদ-চিহ্ন এঁকে নিয়েছি কপালে
একটি দিনের সুবাসিত দান
এঁকে রাখা নেই দিকচিহ্ন প্রত্যাবর্তনের সীমিত সীমায় সুরটুকু থেকে গেছে রক্ত কণায়
যে অদৃশ্য বাহুডোরে চিন্ময়ী প্রেম প্রারব্ধ সীমারেখা চৌকাঠ পেরোয়
দিগন্তে বিশ্বাস চিকমিক নক্ষত্রের আকাশ-বিহার সে তো নয়।
চাতক-তৃষ্ণা
বিনা লালনে ডুবে যাচ্ছে বাদামের তেল-চর্বিত কুঁড়ি
পরাগের হৈমচূড়া বেয়ে নেমে আসা ঘ্রাণ ছড়িয়ে যাচ্ছে শোলাঙ্কি বিছানায়
ভিজে যাওয়া উঠোন শুকোয় চাতক-তৃষ্ণা বহুধা শুশ্রুষা নেশা অমিল পংক্তির অন্ত্যমিল
ঘনিষ্ঠ রাত কাঙাল
যদি মিটে যায় শোক
খেয়া পারাপার গান্ধর্বী রীতি নীতি ছিঁড়ে কুটে বেড়ে নেওয়া ভাতে নিখোঁজ আংটি পেটে রাঘব বোয়াল মহাকাল।
নাবালক জল
সিঁড়ি বেয়ে উঠে আসা নাবালক জল
আঁকড়ে রাখে বটচ্ছায়া শিকড়
পৃথিবীর চোখ জয়ের উড়নতুবড়ি
ভিতরের জানালা ভাসায় সখাত
আবছায়া নীল নীল উপত্যকা
ঝাউ বনে টিয়া রঙ উচ্ছন্ন শহর
গিলে খায় রাক্ষুসী জটাজুট কোন্দল
মুনি ঋষি নির্বাক
পুজো পায় সাক্ষীগোপাল
মরণদশা কাদাপথ
ভাঙা ইঁট ভরসা।
.jpeg)
স্মৃতি, তৃষ্ণা ও অস্তিত্বের আলোছায়াই মিতা মল্লিকের কবিতার অন্তর্জগৎ
ReplyDelete✍️
মিতা মল্লিকের এই গুচ্ছ কবিতার মূল সুর গড়ে উঠেছে আত্মউপলব্ধি, স্মৃতির পুনর্নির্মাণ এবং পার্থিব ক্ষয়িষ্ণুতার বিপরীতে আধ্যাত্মিক আশ্রয়ের সন্ধানে। তাঁর কবিচেতনায় প্রকৃতি কেবল পটভূমি নয়, বরং মানুষের অন্তর্গত ভাঙাগড়ার এক জীবন্ত সাক্ষী।
প্রথম কবিতা ‘সবুজ প্রত্যাবর্তন’-এ কবির চেতনা এক দীর্ঘ পরিক্রমার পর শান্ত আশ্রয়ে ফিরে আসে। সময়ের গতি (‘চাকা ঘুরতে ঘুরতে’) অহংকার আর প্রত্যাখ্যানের অতীতকে বালুচরে মিশিয়ে দিয়েছে। ফেলে আসা অনুষঙ্গ—ঝুমকো দুল, চিঠির টুকরো, নূপুর—পুনর্বার ফিরে এসে জীবনকে এক বৃত্তাকার পূর্ণতা দেয়। ট্রেনের জানলা দিয়ে দেখা ‘গাছেদের বর্ণময় সবুজ বন্ধন’ আসলে আত্মিক পুনর্জন্মেরই দৃশ্যরূপ।
‘প্রণত ডানায়’ কবিতায় কবির দৃষ্টি সমকালীন সামাজিক হিংসা ও ক্লেদাক্ততার বিপরীতে এক শুদ্ধ অনুভবের পথ খোঁজে। ‘সংক্রমণ’ বা ‘মাংস ছিঁড়ে বনভোজনের উৎসব’-এর মতো রূঢ় বাস্তবতাকে পেছনে ফেলে তিনি এমন এক দিগন্ত কল্পনা করেন, যেখানে নদী বুকের গভীরে ঘুমিয়ে থাকে। সবশেষে প্রজাপতির ‘প্রণত ডানায় মুছে নেয় জল’ চিত্রকল্পটি ক্ষমার স্নিগ্ধতা ও বেদনার রূপান্তরকে নির্দেশ করে।
‘প্রসাদ-চিহ্ন’ কবিতায় ধরা পড়েছে প্রেমের এক অতীন্দ্রিয় ও নির্লিপ্ত রূপ। কবি এখানে প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির হিসাব চুকিয়ে ফেলেছেন। নশ্বর ‘ঝরা ফুল’ আঁকড়ে না ধরে তিনি ভালোবাসাকে গ্রহণ করেছেন ‘প্রসাদ-চিহ্ন’ হিসেবে। ‘চিন্ময়ী প্রেম’ কোনো বাহ্যিক বন্ধন বা নক্ষত্রের বিলাসে নয়, রক্তের গভীরে নীরব সুর হয়ে স্থায়ী আশ্রয় পায়।
‘চাতক-তৃষ্ণা’ কবিতায় কবিচেতনা প্রবেশ করেছে ইন্দ্রিয়ঘন আকুলতা ও তার অনিবার্য ট্র্যাজেডিতে। পরাগের ঘ্রাণ, ঘনিষ্ঠ রাতের হাহাকার এবং ‘গান্ধর্বী রীতি’ পেরিয়ে মিলনের যে তৃষ্ণা, তা মহাকালের পেটে বিলীন হয়ে যায়। শকুন্তলা-স্মারক ‘নিখোঁজ আংটি পেটে রাঘব বোয়াল’ উপমার মধ্য দিয়ে প্রেমের ক্ষণভঙ্গুরতা এবং সময়ের অমোঘ বিধিলিপিকে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
শেষ কবিতা ‘নাবালক জল’-এ এসে কবির সুর তীব্র নাগরিক ও সামাজিক সংকটে বিদ্ধ হয়। উচ্ছন্ন শহর, রাক্ষুসী কোন্দল এবং নির্বাক মুনি-ঋষির বিপরীতে ‘সাক্ষীগোপাল’-এর পুজো পাওয়ার রূপকটি আধুনিক মূল্যবোধের পতনকেই চিহ্নিত করে। এখানে ‘নাবালক জল’ হয়তো নতুন প্রাণের অসহায় প্রকাশ, যা ভাঙা ইঁট আর কর্দমাক্ত পথকে আঁকড়ে ধরে কোনোমতে নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখে।
মিতা মল্লিকের ভাষা চিত্রকল্পময় ও সংকেতমূলক। নিবিড় ব্যক্তিগত স্মৃতি থেকে শুরু করে মহাকালের নির্মম সত্য এবং সামাজিক অবক্ষয়—এই পাঁচ কবিতায় তাঁর লেখনী এক গভীর, সংবেদনশীল ও পর্যবেক্ষণমূলক কবিমানসের স্বাক্ষর বহন করে।